প্লাস্টিক-‎পলিথিনের ভয়াবহতা জেনেও কেন থামছে না ব্যবহার

পলিথিন ব্যাগের পাশাপাশি চিপসের মোড়ক, বিভিন্ন প্লাস্টিক বোতল, ই-বর্জ্য—সব মিলিয়ে এখন দেশের পরিবেশ গভীর সংকটেফাইল ছবি

প্লাস্টিক-‎পলিথিনকে বলা হয় পরিবেশের নিঃশব্দ ঘাতক। এগুলো নীরবে পরিবেশের ক্ষতি করে যাচ্ছে নিত্যদিন। পলিথিন সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয় নেই; বরং ভেঙে গিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক নামের ক্ষুদ্রাংশে পরিণত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসের সঙ্গে মিশে গিয়ে শ্বাসের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করে, যা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। গবেষকেরা বলছেন, প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যাগের অবাধ ব্যবহারের কারণে চর্মরোগ, ক্যানসার, স্নায়ুজনিত রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি ড্যামেজসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হতে পারে মানুষ।

অন্যদিকে প্লাস্টিক-‎পলিথিন মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর মিশে যেতে প্রায় দুই শ থেকে চার শ বছরের মতো সময় লাগে। এ ছাড়া প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহারের পর ফেলা হয় রাস্তা, ম্যানহোল, নালা, খাল ও নদীতে। এরপর বৃষ্টি হলে পানি চলাচলে বিপত্তি ঘটে। প্লাস্টিক-পলিথিনের পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দেয়। এতে জনদুর্ভোগ তৈরি হয়।

প্লাস্টিক-‎পলিথিনের বর্জ্য
ফাইল ছবি

আমাদের দেশের গ্রাম থেকে শহরের ফুটপাত ও চায়ের দোকানগুলোতে বেশ জনপ্রিয় প্লাস্টিক-পলিথিনের তৈরি ছোট ছোট চায়ের ব্যাগ। এই টি-ব্যাগগুলো নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখা গেছে, একটি প্লাস্টিকভিত্তিক টি-ব্যাগ গরম পানির কাপে ডুবালে বিপুল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানো প্লাস্টিক মিশে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে একটিমাত্র প্লাস্টিকের টি-ব্যাগ ভেজালে প্রায় ১১ দশমিক ৬ বিলিয়ন মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা এবং ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ন্যানো প্লাস্টিক কণা পানিতে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষকদের মতে, নাইলন ও পলিইথিলিন টেরেফথালেট দিয়ে তৈরি এসব আধুনিক টি-ব্যাগ উচ্চতাপে ভেঙে গিয়ে ক্ষুদ্র কণা ছড়িয়ে দেয়, যা পানীয়ের সঙ্গে সঙ্গে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। যদিও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে পরীক্ষাগারে ছোট জলজ প্রাণীর ওপর এসব কণার প্রভাবে আচরণ ও শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে।

পলিথিন বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগের পরিবর্তে টেকসই কিছু বেছে নেওয়া যায়
ছবি: প্রথম আলো

অন্যদিকে সাধারণ একটি চুইংগাম মুখে দিলেই এক থেকে তিন হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক পেটে প্রবেশ করে। সাধারণত চুইংগাম দুই রকমের হয়। প্রাকৃতিক ও সিনথেটিক। আমরা শিশুদের যে চুইংগাম কিনে দিই, সেগুলো সিনথেটিক। তবে প্রাকৃতিক হোক বা সিনথেটিক—সব ধরনের চুইংগামেই রয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। এক টাকার একটি চুইংগামে প্রায় এক-তিন হাজার প্লাস্টিক কণা থাকতে পারে।

আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটির একটি সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা গবেষণাটি তুলে ধরে বলেন, চুইংগামে মূলত পলিইথিলিন ও পলিস্টাইরিনের মতো প্লাস্টিকের কণিকা থাকে। এগুলো কী, তা বোঝার সুবিধার্থে বলা যায়— পলিইথিলিন পলিথিন ব্যাগ, পানির বোতল এবং পলিস্টাইরিন ওয়ান-টাইম কাপ, সিডি-ডিভিডি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। এই প্লাস্টিক কণাগুলো দেহ হজম করতে পারে না, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে দেহে।

আরও পড়ুন
প্লাস্টিক ও পয়োবর্জ্যে দূষিত বুড়িগঙ্গার পানি। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকা
ফাইল ছবি

প্লাস্টিক-‎পলিথিন পরিবেশ ও মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হওয়ায় ১ মার্চ ২০০২ সালে পলিথিন নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ। উক্ত আইনে পলিথিন উৎপাদন, বিপনন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এমন কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও দিন দিন প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহারকারী বেড়েই চলেছে। ২০০২ সালের আইনের পর ১ অক্টোবর ২০২৪ সালে সুপারশপগুলোতে এবং ১ নভেম্বর ২০২৪ সাল থেকে দেশের সব কাঁচাবাজারে প্লাস্টিক-পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। তবু বাজারের অসাধু ব্যবসায়ীরা নিয়মিত প্লাস্টিক-পলিথিন ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তদারকি দেখা যায় না।

আইনের কঠোর প্রয়োগ, জবাবদিহি ও সচেতনতা ছাড়া প্লাস্টিক-পলিথিন নিষিদ্ধ হবে না। পলিথিন নিষিদ্ধের জন্য প্রয়োজনে হাট-বাজারে সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা নজরদারি বাড়াতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিয়মিত বাজার তদারক করতে হবে। তবেই প্লাস্টিক-পলিথিন নিষিদ্ধে কিছুটা ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় পলিথিন রোধ করা সম্ভব।

‎অন্যদিকে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যাবে ২০১৬ সালে বিজ্ঞানী মোবারক আহমেদ খানের আবিষ্কৃত পাটের সূক্ষ সেলুলোজ দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব ও উচ্চপচনশীল পাতলা ও টেকসই ব্যাগ। বাজারে এটি সোনালি ব্যাগ নামে পরিচিত। ২০২৫ সালের শুরুতে পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ব্যাগটি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা হয়।

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিচার্স হাব