বেকার সংকটের অবসান জরুরি
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
দেশের বেকার সমস্যা প্রকট সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন মহল থেকে নানা সতর্কবাণী দেওয়া হচ্ছে। সংকট নিরসনে বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপের কথাও বলা হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু বাস্তবে সংকট সমাধানের কোনো আভাস পাওয়া যচ্ছে না। উল্টো কিছু পরিসংখ্যান উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় দেড় কোটি নিষ্ক্রিয়। এখানে ‘নিষ্ক্রিয়’ শব্দটির অর্থ, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে দেড় কোটি মানুষ কোনো আয়মূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত নেই। পড়াশোনা করে না, এমনকি দক্ষতা অর্জনের কোনো প্রশিক্ষণেও অংশ নিচ্ছে না। ২০২৪ সালের মধ্যভাগে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১ কোটি ২৯ লাখ তরুণ জনগোষ্ঠী নিষ্ক্রিয়। বর্তমানে নিষ্ক্রিয়তার এ সংখ্যাটি দেড় কোটির কাছাকাছি। একটি দেশের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কতটা সমৃদ্ধ হবে, তা নির্ভর করে তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মকাণ্ডের ওপর।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে এত বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় রাখার মানে হলো দেশের আর্থসামাজিক অবস্থায় বড় ধরনের সংকট আসন্ন। এটি জাতীয় অর্থনীতি ও সমাজের জন্যও এক বড় অশনিসংকেত। দীর্ঘ মেয়াদে এই অচলাবস্থা বেকারত্বের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি ছাড়া এ সমস্যার সমাধান নেই। তরুণদের সক্রিয় করতে হলে প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা তৈরি ও সৃজনশীল পেশার সুযোগ বাড়াতে হবে। আর এই অচলায়তনের অবসান করতে পারলেই তারুণ্য হয়ে উঠবে উন্নয়নের চালিকা শক্তি।
নাগরিকদের বয়স বিবেচনায় বর্তমান বাংলাদেশ জনমিতির সুফল ভোগ করছে। মোট জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশ মানুষ ১৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সী। এর অর্থ, জনশক্তির বিবেচনায় বেশির ভাগ মানুষ কর্মক্ষম। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে তরুণদের বৃহত্তর অংশ নিষ্ক্রিয়। এত বড় জনগোষ্ঠীকে নিষ্ক্রিয় রেখে দেশ ও দশের মঙ্গল চিন্তা করার কোনো হেতু নেই। যখন কোনো দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর ৪১ শতাংশ নিষ্ক্রিয় থাকে, তখন তা দেশের উন্নয়নযাত্রার জন্য গুরুতর প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই নিষ্ক্রিয়তা অর্থনীতিতে কর্মশক্তির অপচয় ঘটাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে, একই সঙ্গে বেকারত্ব বৃদ্ধি করছে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ কম থাকায় এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক হারে তরুণদের কাজে সম্পৃক্ত করানো না গেলে তাদের মধ্যে হতাশা, অপরাধপ্রবণতা ও অভিবাসনের চাপও বৃদ্ধি পাবে। তা ছাড়া দেশের জনমিতিক সুফলের সদ্ব্যবহার ব্যর্থ হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও টেকসই কর্মসংস্থান ছাড়া এই সংকট উত্তরণের পথ নেই।
২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখের মতো, যেখানে ১৯ লাখ তরুণ। শ্রমশক্তির জরিপেও একই তথ্য উঠে এসেছে। পরিসংখ্যান বলছে, মোট বেকার তরুণদের মধ্যে গ্রামীণ অঞ্চলে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে রয়েছে ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে মোট বেকার জনগোষ্ঠীর ৭৮ দশমিক ৯ শতাংশ হলো ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ। এই চিত্র নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। জরিপে দেখা গেছে, বেকার তরুণদের মধ্যে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন, ২১ দশমিক ৩ শতাংশ মাধ্যমিক এবং ১৪ দশমিক ৯ শতাংশ তরুণ পড়েছেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত। আবার সর্বমোট হিসাবে বেকার তরুণদের ১ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন বা ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ গ্রামীণ অঞ্চলের এবং শূন্য দশমিক ৬০ মিলিয়ন বা ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ শহরাঞ্চলের। তরুণদের প্রাক্কলিত বেকারত্বের হার ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, পুরুষদের ৯ দশমিক ৬ শতাংশ ও নারীদের মধ্যে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। জরিপে আরও দেখা গেছে, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণে নেই এমন তরুণদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ নারী এবং ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ। শিক্ষা, কর্ম ও প্রশিক্ষণে না থাকা নারীর সংখ্যা বেশি হওয়ার পেছনে নারীদের গৃহস্থালি কাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো মূল কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীকে আয়মূলক কাজে সম্পৃক্ত করার জন্য স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। তবে দেখা যাচ্ছে, গ্রামের বা শহরের একজন তরুণ কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে আত্মকর্মসংস্থান গড়ে তুলতে চাইলে দেশের বর্তমান বাস্তবতায় কাজটি করা মোটেও সহজ নয়। কেননা বিদ্যমান দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ-পরবর্তী আয়মূলক কাজ শুরু করার মধ্যে অনেক ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তাই প্রতিটি স্তরের প্রতিবন্ধতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষ্ক্রিয় তরুণসমাজকে আয়মুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করা, যা হতে হবে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং উদ্ভাবনমূলক। শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেও কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। যুব উন্নয়নের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে উদ্ভাবনী পৃষ্ঠপোষকতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বিকাশের প্রশিক্ষণ চালু করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে তরুণদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ ও স্টার্টআপ সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার, যেন তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি ও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালু করলে তরুণেরা দ্রুত শ্রমবাজারে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে বিদেশগামী কর্মশক্তির জন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষা কার্যক্রম চালু করলে বৈদেশিক আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি আসবে। নিষ্ক্রিয় তরুণ নারীদের আয়মুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে প্রথমেই নিরাপদ ও অনুকূল কর্মপরিবেশ তৈরির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ নারীদের জন্য ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ যেমন হস্তশিল্প, অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিভিত্তিক উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি সহায়তায় সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। স্বল্প সুদে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইটি প্রশিক্ষণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা খাতে কর্মসংস্থান বাড়ালে তারা সহজে যুক্ত হতে পারবে। শিশু যত্ন কেন্দ্র ও যাতায়াত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে শহুরে নারীরাও কর্মক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যে অংশ নিতে পারবে। নারীর দক্ষতা ও শ্রমকে উৎপাদনশীল কাজে রূপান্তর করা গেলে শুধু তাদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাও ত্বরান্বিত হবে। আর এভাবে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিষ্ক্রিয় তরুণসমাজকে সক্রিয় সম্পদে পরিণত করাই হতে পারে টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
সহসভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ