সভ্যতা কি সত্যিই এগিয়েছে, নাকি শুধু মুখোশ বদলেছে

গ্রাফিক: এআই/বন্ধুসভা

আমরা প্রায়ই মানবজাতি সম্পর্কে এমনভাবে কথা বলি, যেন সভ্যতাই নৈতিক বিবর্তনের সর্বোচ্চ শিখর। আমরা শিক্ষা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, উদ্ভাবন এবং অগ্রগতিকে উদ্‌যাপন করি। কিন্তু এই বিশ্বাসের আড়ালে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়ে যায়। সভ্যতা কি সত্যিই মানবতার বিকাশের প্রতীক, নাকি এটি এমন এক সুসজ্জিত কাঠামো, যার ভেতরে ক্ষমতা, বৈষম্য ও স্বার্থের পুরোনো রূপগুলো নতুন ভাষা ও নতুন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে টিকে আছে?

ইতিহাসের রাজা-রানি আজ প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। রাজদরবার রূপ নিয়েছে করপোরেশনে। সাম্রাজ্য পরিণত হয়েছে জোটে। প্রচারণা হয়ে গেছে জনসংযোগ। মুকুটের জায়গা নিয়েছে বোর্ডরুম, অলিগার্ক, প্রতিরক্ষা লবি, ওষুধশিল্পের সাম্রাজ্য, বিমাশিল্প এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের বিশাল যন্ত্র। তবু সাধারণ মানুষ এখনো ভাড়া, খাদ্য, চিকিৎসা, মর্যাদা এবং টিকে থাকার সংগ্রামে লড়ে যাচ্ছে।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো দারিদ্র্য, যুদ্ধ কিংবা দুর্নীতি নয়; বরং ঘোষিত মূল্যবোধ ও বাস্তবতার মধ্যে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব। আমরা সমতার কথা বলি, অথচ বৈষম্য বাড়তে থাকে। মানবাধিকারের কথা বলি, অথচ কোটি মানুষ এখনো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। স্বাধীনতার কথা বলি, অথচ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা বহু মানুষের জন্য সেই স্বাধীনতাকে কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ করে রাখে।

বিশ্বের এক প্রান্তে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে, অন্য প্রান্তে মানুষ খাদ্য, চিকিৎসা ও বাসস্থানের জন্য সংগ্রাম করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি অভূতপূর্ব হলেও সেই অগ্রগতির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না। ফলে সভ্যতার বাহ্যিক জৌলুশ যত বাড়ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে তার অন্তর্গত বৈপরীত্য।

মানুষের সত্য রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকেও ক্রমে মালিকানা, মতাদর্শ কিংবা রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাবে বন্দী বলে মনে হচ্ছে। আধুনিক গণমাধ্যমের বড় অংশ আর বাস্তবতাকে কেবল তুলে ধরে না; বরং যারা এর অর্থায়ন করে, তাদের স্বার্থের আলোকে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে। ফলাফল হলো এমন এক সভ্যতা, যা তথ্যের সাগরে ডুবে আছে, কিন্তু সততার জন্য অনাহারে ভুগছে।

একদিকে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত, অপুষ্টি, বাস্তুচ্যুতি, চিকিৎসাজনিত ঋণ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মানসিক ক্লান্তির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে, প্রায়ই অদৃশ্যভাবে। মুদ্রাস্ফীতি কিংবা মন্দা এখন শুধু সংবাদ শিরোনাম হয়ে আসে না; এগুলো নীরবে হাজির হয় ছোট হয়ে যাওয়া খাবারের প্লেটে, পিছিয়ে যাওয়া চিকিৎসায়, ভেঙে পড়া মানসিক স্বাস্থ্যে এবং বেঁচে থাকার নিঃশব্দ অপমানে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আধুনিক মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।

ডিজিটাল যুগ মানবিক সংবেদনশীলতারও এক নতুন দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে। প্রতিদিন আমরা পর্দার মাধ্যমে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি এবং অসংখ্য মানবিক বিপর্যয়ের সাক্ষী হই। সেই সঙ্গে বেড়ে যায় অসহায়ত্বের অনুভূতি। আমরা জানি কী ঘটছে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেই বাস্তবতা বদলানোর ক্ষমতা আমাদের হাতে নেই। ফলে সহমর্মিতা ধীরে ধীরে ক্লান্তিতে রূপ নেয়, আর সচেতনতা রূপ নেয় মানসিক অবসাদে। যেন এগুলো সাময়িকভাবে মনে করিয়ে দেয় যে ক্ষমতার বিশাল যন্ত্রের নিচেও মানবতা এখনো কোথাও বেঁচে আছে।

তবে এই সমালোচনা সভ্যতার অর্জনকে অস্বীকার করার জন্য নয়। চিকিৎসা, বিজ্ঞান, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং মানবাধিকারের ক্ষেত্রে মানবজাতি নিঃসন্দেহে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। প্রশ্ন হলো, এই অগ্রগতি কি মানবিক ন্যায়বিচার ও মর্যাদার সমান্তরালে এগিয়েছে?

সম্ভবত ভবিষ্যতের ইতিহাসবিদেরা আমাদের সময়কে শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের যুগ হিসেবে নয়, বরং গভীর নৈতিক বৈপরীত্যের যুগ হিসেবেও স্মরণ করবেন। তাঁরা হয়তো লিখবেন, মানবজাতির কাছে জ্ঞান, সম্পদ ও সক্ষমতার অভাব ছিল না; অভাব ছিল সেই সম্পদ ও সক্ষমতাকে ন্যায়সংগতভাবে ব্যবহারের রাজনৈতিক ও নৈতিক সদিচ্ছার।

সভ্যতা শেষ পর্যন্ত কেবল স্থাপনা, প্রযুক্তি বা অর্থনীতির নাম নয়। সভ্যতা হলো মানুষের জন্য নির্মিত একটি ব্যবস্থা। ইতিহাস হয়তো একদিন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে আধুনিক সভ্যতা ব্যর্থ হয়েছে বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তি বা সম্পদের অভাবে নয়; শিল্পায়িত মাত্রায় নৈতিক দ্বিচারিতাকে স্বাভাবিক করে তোলার কারণে।

সভাপতি, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভা