‘মানুষের মৃত্যু হলে মানুষের জন্যে তার শোক
পড়ে থাকে কিছুদিন ব্যবহৃত জিনিশেরা থাকে
জামা ও কাপড় থাকে, ছেঁড়া জুতো তাও থেকে যায়,
হয়তো বা পা দুখানি রাঙা হলে পদচ্ছাপ থাকে অনুপস্থিতি’
—কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়
খুব কাছের বন্ধু পিপলু। আমাদের বন্ধুত্বের বয়স ছাব্বিশ পেরিয়ে। পিপলু ছোটবেলা থেকে ছিল প্রাণবন্ত সদা হাস্যোজ্জ্বল কৌতুকপ্রিয় মিশুক প্রকৃতির। পটিয়ায় নানাবাড়িতে এলে দুজনে লেখক হানিফ সিদ্দীকির সংগৃহীত গল্পের বইগুলো রাত জেগে পড়তাম। দুজনে ছন্দা সিনেমায় গিয়ে সিনেমা উপভোগ করতাম। গল্পের বইয়ে ডুব দিলে রাত কেটে যেত, টেরও পেতাম না। মজার বিষয় পেলে হাসাহাসি, রাত জেগে টুয়েন্টি নাইন, কলব্রিজ, শীত মৌসুমে ধানি জমিতে পিচ করে ক্রিকেট খেলা।
চাঁদনিপসর রাতে ছিদ্দিকিয়া মঞ্জিলের আম্রকাননের বৈঠকখানায় আড্ডা দিতাম। দুজনের বিষয় থাকত বই, খেলাধুলা, সিনেমা, নাটক, প্রেমকাহিনি। জোছনারাতে নীল জোছনার আলো-আধাঁরিতে জোনাকির ছোটাছুটি, ব্যাঙের ডাক, ঝিঁঝি পোকার গান, অন্ধকারে শুকনা কাঠের টুকরাকে দেখে সাপ মনে করা, তেঁতুলগাছে কিছু একটা নড়ে উঠলে ভয়ে গা ছমছম করত, বাতাসে টুপটাপ পাকা আম ঝরে পড়ত মাঠে। দূর থেকে ভেসে আসত শিয়ালের হুক্কাহুয়া। বড় আম্মা (পিপলুর নানি) ডাক দিত, ‘অ পিপলু, অ এনাম, তোঁয়ারা এত রাইত পর্যন্ত বাইরে কা ঘরত চলি আইয়ো?’ আহা স্মৃতি, সর্বজনশ্রদ্ধেয় বড় আম্মা আজ জান্নাতের ফুল।
দুজনের প্রিয় বিষয় ছিল হিসাববিজ্ঞান। চূড়ান্ত হিসাব করতে বসলে দুজনে একই সময়ে অঙ্কের সমাধান করে ফেলতাম।
২০০৭ সালের কথা। দুজনে টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানিতে গ্রাহকসেবা কর্মকর্তা পদে চাকরিতে যোগ দিলাম—পিপলু সিটিসেলে, আমি বাংলালিংকে। পরবর্তী সময়ে সে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের (জিই হেলথ কেয়ার টেকনোলজিস) গুলশান শাখার ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করে, আর আমি একটি বেসরকারি ব্যাংকে; দুজনের পোস্টিং ঢাকায়।
সে উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরে থাকত। কাস্টমার কেয়ারে সেবা নিতে আসা স্কুলশিক্ষক আফসানার সঙ্গে মুঠোফোনে পরিচয়। বন্ধুত্ব, অতঃপর চুটিয়ে প্রেম। ২০১০ সালে পিপলু আফসানাকে বিয়ে করে। আজিবা চৌধুরী নামে তাদের একটা কন্যাসন্তানও আছে। পিপলুর সঙ্গে মাঝেমধ্যে মুঠোফোনে কথা হতো। সে শখের বশে গ্রামের বাড়িতে মাছ চাষও করেছে। কতবার বলেছিল বরুমচড়া গ্রামে বেড়াতে যেতে। শঙ্খ নদ, চাঁনপুর চা–বাগান, গন্ডামারা সমুদ্রসৈকতে দুজনে মিলে বেড়াব, বড়শি দিয়ে মাছ ধরব—কত পরিকল্পনা; যাওয়া হয়নি। তার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল বড় ভাবির (সিফাতের আম্মা) জানাজায়। আগামী ঈদে পরিবার নিয়ে নানাবাড়িতে আসার কথা ছিল।
গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর গুলশানে একটি নির্মাণাধীন ভবনের সামনে লাঞ্চ করে সহকর্মীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল পিপলু। বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে হঠাৎ নির্মাণধীন ভবন থেকে লোহার রড পড়ে মুহূর্তেই মাঠিতে লুটিয়ে পড়ে আমার বন্ধু। পরে ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, পিপলু না–ফেরার দেশে। ওই দিন রাতে গ্রামে যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট করেছিল সে। ২৩ তারিখ জাগরণী ক্লাবের ফুটবল ম্যাচ ও পিকনিক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। সৃষ্টিকর্তা পিপলুকে শেষের ঠিকানার টিকিট দিয়ে দিলেন।
কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার বলেছিলেন, ‘মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়।’ পিপলুর মৃত্যুর খবরটা ২২ তারিখ বিকেল চারটায় চট্টগ্রামে ফেরার পথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি।
গভীর রাতে বালিশে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে অঝোরে কাঁদলাম। খুব কাছের মানুষকে হারালাম। প্রকৃতির কি নির্মম আচরণ, সৃষ্টিকর্তার প্রতি খুব অভিমান হলো। এত তাড়াতাড়ি কেন পিপলুকে নিয়ে গেলেন? কী অপরাধ ছিল তার। মৃত্যুদূত কেনইবা তাকে সতর্কবার্তা দিলেন না। পিপলুর মা–বাবা, একমাত্র মেয়ে আজিবা ও স্ত্রী আফসানাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব। আজিবা সকালে বাবার হাত ধরে স্কুলে যেত, পিপলু নিজ হাতে মেয়েকে খাইয়ে দিত। আজিবা বাবাকে খুঁজে ফিরছে। সে তার বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো হেসে-গেয়ে জন্মদিন উদ্যাপন করেছিল। ছোট্ট এই শিশু বাবা হারানোর শোক কীভাবে মেনে নেবে, যে বাবার বুকে সে ঘুমিয়েছে দিনের পর দিন!
মানুষের মৃত্যু হয়, কিন্তু স্মৃতির মৃত্যু হয় না। ফিরে আসে, বারবার মনকে নাড়া দিয়ে যায়, তেমনই একজন সত্যিকারের ভালো বন্ধুর আদর্শ ছিল পিপলু। সহজ, সরল, বিনয়ী ও পরোপকারী প্রগতিশীল বন্ধুকে হারিয়ে সমগ্র দেশের মানুষ কেঁদেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওর জন্য ‘জাস্টিস ফর আশফাক পিপলু’ নামে পেজ খোলা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পিপলু হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছে।
আহা, মানুষের জীবন বড়ই বিচিত্র। ফরাসি কবি শার্ল বোদলেয়র একটি কবিতার চরণ আছে, ‘সকলই চোখে পড়িতেছে, কানে কিছুই পশিতেছে না।’ চিরবিদায়ের দিন যে চলে যায়, সে দেখে না। তাকে সম্মান জানাতে আসা মানুষেরা বুঝতে পারে কত ভালো মানুষ ছিল পিপলু। বন্ধু ক্ষমা করো। কতবার তোমার গ্রামের বাড়িতে দাওয়াত করেছিলে, যেতে পারিনি। আমি জানি না, তোমার অন্তর্চক্ষু দেখছে কি না, তোমাকে চিরবিদায় জানাতে তোমার ছবির মতো গ্রামে এসেছি পরিবার নিয়ে। সবাই আছে বন্ধু, শুধু তুমি নেই। তোমার সাড়ে তিন হাত মাটির কুঁড়েঘরটা এত সুন্দর হয়েছে। দেখে দুই নয়ন জলে ভাসিয়েছি। বন্ধু, তোমার বাড়ির পাশে শঙ্খ নদের পাড়ে যখন দাঁড়িয়েছিলাম, মনে হলো তোমার আবছায়া অদৃশ্য আত্মা কাঁধে হাত দিয়ে বলছিল, ‘সাজিয়ে–গুজিয়ে দে মোরে সজনি তোরা, সাজিয়ে–গুজিয়ে দে মোরে।’
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা