আনন্দের যাত্রা কেন হয়ে ওঠে শেষযাত্রা
আমরা বলি ‘দুর্ঘটনা’! কিন্তু সত্যি কি এগুলো দুর্ঘটনা? নাকি এগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলা, বিশৃঙ্খলা, দুর্বল তদারকি এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত ফল?
ঈদ মানেই বাড়ি ফেরা। ঈদ মানেই অপেক্ষা মায়ের রান্নাঘরের গন্ধ, বাবার হাসিমুখ, শৈশবের উঠান, প্রিয় মানুষগুলোর কাছে ফিরে যাওয়ার অদ্ভুত টান।
সারা বছর ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা যাঁদের জন্য বাঁচি, ঈদের ছুটিই যেন সেই মানুষগুলোর কাছে ফিরে পাওয়ার সবচেয়ে বড় উপলক্ষ। দীর্ঘ ছুটি মানেই আনন্দের পরিকল্পনা, ট্রেনের টিকিট, বাসের সিট, লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে নদী দেখার স্বপ্ন। কর্মজীবনের ক্লান্ত মানুষ মনে মনে বিশ্বাস করে, এই কয়েকটা দিনই তাঁকে আবার নতুন করে বাঁচার শক্তি দেবে।
কিন্তু কতশত পরিবার জানে না, যে যাত্রা আনন্দের হওয়ার কথা ছিল, সেটিই কখনো কখনো হয়ে ওঠে জীবনের শেষযাত্রা। একটি ফোনকল বদলে দেয় সবকিছু। অপেক্ষা রয়ে যায় দরজায়। ঈদের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয় আজীবনের শোকে। এরপর আমরা আবার খবরের কাগজে পড়ি—দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা নয়, এগুলো আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতার গল্প।
বাংলাদেশে বড় দুর্ঘটনার খবর যেন এখন আর আমাদের বিস্মিত করে না। দৌলতদিয়ায় বাস ডুবে যাওয়া, ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়া, লঞ্চে উঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে মৃত্যু, প্রতিটি ঘটনা কয়েক দিন আলোচনায় থাকে, তারপর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় নতুন কোনো দুর্ঘটনার ভিড়ে।
আমরা বলি ‘দুর্ঘটনা’! কিন্তু সত্যি কি এগুলো দুর্ঘটনা? নাকি এগুলো দীর্ঘদিনের অবহেলা, বিশৃঙ্খলা, দুর্বল তদারকি এবং নাগরিক অসচেতনতার সম্মিলিত ফল?
দুর্ঘটনা নয়, একটি কাঠামোগত সংকট
যখন একটি বাস ফেরিতে উঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে যায়, যখন ট্রেন লাইনচ্যুত হয়, কিংবা অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ছাড়ে, তখন প্রশ্ন ওঠে—নিরাপত্তা যাচাই কোথায় ছিল? দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান কী করছিল? ঝুঁকি কি আগে থেকে দৃশ্যমান ছিল না?
প্রায় প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। প্রতিবেদন জমা পড়ে। সুপারিশ করা হয়। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কমই দৃশ্যমান হয়। ফলে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটে। এ যেন আমরা মৃত্যু থেকে শিক্ষা নিই না, বরং মৃত্যুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনেক নিয়মই আছে। তাহলে আসল সমস্যাটার মূল কোথায়?
নিয়ম আছে, প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশে পরিবহন ও নৌযান নিরাপত্তা–সংক্রান্ত আইন ও নীতিমালা কম নয়। কিন্তু নিয়ম বাস্তবায়নের জায়গাটিই সবচেয়ে দুর্বল। দায়বদ্ধতার অভাব। বড় দুর্ঘটনার পর প্রকৃত দায়ীদের শাস্তি খুব কমই দৃশ্যমান হয়। ফলে অবহেলা একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। ঝুঁকিকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া। অতিরিক্ত যাত্রী, অনিরাপদ ওঠানামা, জরাজীর্ণ যানবাহন—এসব আমরা ‘চলেই তো’ মানসিকতায় মেনে নিয়েছি।
মানবিক জীবনের মূল্য কমে যাওয়া। যখন নিরাপত্তার চেয়ে সময়, লাভ বা সুবিধা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন দুর্ঘটনা অনিবার্য হয়ে পড়ে।
সরকারি পর্যায়ে নিয়মগুলো এমন কঠিন এবং কঠোর যদি করা হয়; যেমন—
• জিরো টলারেন্স নিরাপত্তা নীতি: ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অতিরিক্ত যাত্রী, অননুমোদিত চালনা। এসব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
• ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম: ফেরিঘাট, রেললাইন, লঞ্চ টার্মিনালে সিসিটিভি ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
• নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট: স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট টিম গঠন করে বছরে একাধিকবার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি।
• নদীপথ, রেলপথ ও সড়কে দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত রেসপন্স টিম গড়ে তুলতে হবে।
ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে আমাদের দায়িত্ব
আমরা প্রায়ই ভাবি, নিরাপত্তা শুধুই সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে নাগরিক আচরণও দুর্ঘটনার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাঝেমধ্যে আমাদের মাঝে এমন তাড়া কাজ করে যে এক্ষুনি যেতে হবে, এক্ষুনি করতে হবে। এই তাড়াটা অনেক সময় দুর্ঘটনা বাড়িয়ে দেয়। অথচ একটু সচেতন হলে, দায়িত্ব নিলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশই কমে যায়। তা না করে আমরা মনে করতে থাকি—হয়তো পরিবহনটির ধারণ ক্ষমতা নেই, হয়তো বেপরোয়াভাবে গাড়িটি চালাচ্ছে কোনো ড্রাইভার…।
এখন আমাদের যা করতে হবে—
• অতিরিক্ত ভিড় দেখে লঞ্চ বা বাসে না ওঠা
• চলন্ত যানবাহনে ওঠানামা না করা
• লাইনের বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ শর্টকাট ব্যবহার না করা
• চালকের বেপরোয়া আচরণে প্রতিবাদ করা
• নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলা
একজন সচেতন যাত্রী কখনো কখনো নিজের জীবনের পাশাপাশি অন্য আরেকটি জীবনও বাঁচাতে পারে।
দৌলতদিয়ার নদীতে যাত্রীসহ বাস ডুবে যাওয়া, লাইনচ্যুত ট্রেন কিংবা ডুবে যাওয়া লঞ্চ আমাদের শুধু শোক দেয় না, এগুলো আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে। কারণ, প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে একটি অদৃশ্য বাক্য থাকে— ‘এটি এড়ানো সম্ভব ছিল। আমরা দায়িত্ব নিইনি।’
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ