একসময় রাত জেগে যাত্রা দেখত মানুষ, এখন কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই শিল্প
শীতের গভীর রাত। কুয়াশা নেমে এসেছে মাঠজুড়ে। বাঁশ আর টিনের প্যান্ডেলের ভেতরে জ্বলছে লাল-নীল আলো। হঠাৎ কাঁসার ঘণ্টা—তারপরই অভিনেতার মঞ্চে প্রবেশ, উচ্চকণ্ঠে সংলাপ ছুড়ে দেন চারদিকে। মুহূর্তেই নীরবতা ভেঙে হাততালিতে ভরে ওঠে চারপাশ। এটি কেবল একটি নাট্যপ্রদর্শনী নয়, বরং বাঙালির লোকজ জীবনের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যাত্রাপালা।
যাত্রা, বাংলার লোকনাট্যের এক প্রাচীন ও জনপ্রিয় শাখা। ঐতিহ্যমণ্ডিত কোনো কাহিনিকে নাট্যরূপ দিয়ে খোলা আসরে সংগীত, নৃত্য, সংলাপ ও অতিরঞ্জিত অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে যে অভিনয় পরিবেশিত হয়, তাকেই বলা হয় যাত্রা। ‘যাত্রা’ শব্দটির মূল অর্থ গমন বা যাত্রা করা। অতীতে ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে শোভাযাত্রা, নৃত্যগীত আর ধর্মীয় কাহিনি পরিবেশনের মধ্য দিয়ে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে এই নাট্যধারার জন্ম।
উৎপত্তি: ধর্মীয় আচার থেকে নাট্যমঞ্চে
প্রাচীন ভারতে দেব–দেবীর পূজা উপলক্ষে নৃত্যগীতময় শোভাযাত্রা বের হতো, যাকে বলা হতো ‘যাত্রা’। রথযাত্রা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই শোভাযাত্রাগুলো কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা পরিণত হয়েছে লোকজ কাহিনি, পুরাণ ও সামাজিক গল্পভিত্তিক নাট্যপ্রদর্শনীতে।
বাংলা অঞ্চলে যাত্রার বিকাশ ঘটে ধাপে ধাপে। প্রথম দিকে শিবোৎসব, পরে কৃষ্ণোৎসব এবং ক্রমান্বয়ে রোমান্টিক ও লোককাহিনিভিত্তিক পালা যুক্ত হয়। চৈতন্যদেবের আগেও যে যাত্রার প্রচলন ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় প্রাচীন গ্রন্থে। তবে বৈষ্ণব ধর্মের বিস্তারের পর কৃষ্ণযাত্রা বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা, কৃষ্ণের বাল্যক্রীড়া কিংবা কংসবধের মতো কাহিনি অভিনয় ও গানের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হতো।
শোনা যায়, একসময় চৈতন্যদেব নিজেই যাত্রায় অভিনয় করেছিলেন—রুক্মিণীর চরিত্রে। এ তথ্যই প্রমাণ করে, যাত্রা কেবল সাধারণ মানুষের বিনোদন নয়, বরং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও অংশ ছিল।
যাত্রার প্রসার ও স্বর্ণযুগ
অষ্টাদশ শতক থেকে যাত্রার ব্যাপক প্রসার ঘটে বাংলাজুড়ে। এ সময় শিশুরাম, পরমানন্দ অধিকারী, সুবল দাস প্রমুখ শিল্পীরা যাত্রাজগতে খ্যাতি অর্জন করেন। ঊনবিংশ শতকে পৌরাণিক যাত্রার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। মতিলাল রায় ও নীলকণ্ঠ মুখোপাধ্যায়ের যাত্রাদল সেই সময়ের দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এ সময় যাত্রার বিষয়বস্তু শুধু ধর্মীয় কাহিনিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘বিদ্যাসুন্দর’, ‘লাইলি-মজনু’, ‘ইউসুফ-জোলেখা’, ‘বেহুলা-লখিন্দর’, ‘মনসামঙ্গল’—এসব প্রেম ও লোককাহিনিও যাত্রায় স্থান পায়। ফলে যাত্রা হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক এক শিল্পমাধ্যম।
বিশ শতকের শুরুতে যাত্রা নতুন মোড় নেয়। মুকুন্দ দাস নামের এক প্রতিভাবান যাত্রারচয়িতা এই শিল্পকে ব্যবহার করেন দেশপ্রেম জাগ্রত করার হাতিয়ার হিসেবে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, সামাজিক সংস্কার, পণপ্রথা ও জাতিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর যাত্রাপালা সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করে। ‘স্বদেশী যাত্রা’ নামে একটি ধারা চালু করে তিনি যাত্রাকে রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশে পরিণত করেন। এর জন্য তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
সমাজ, মানুষ আর যাত্রার বন্ধন
যাত্রাপালা শুধু বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল গ্রামীণ সমাজের মিলনমেলা। কৃষক, তাঁতি, কামার, কুমোর, জেলে—সব শ্রেণির মানুষ রাতের পর রাত জেগে যাত্রা দেখতেন। কখনো ভক্তিরসে ভিজে যেত, কখনো প্রেমে আবার কখনো দেশপ্রেমে উদ্বেল হতো।
অন্যদিকে জমিদার ও অভিজাত শ্রেণির জন্য ছিল আলাদা আয়োজন। তাদের প্রাসাদের নাটমণ্ডপে বসত যাত্রার আসর। নারী সদস্যরা চিকের আড়াল থেকে যাত্রা উপভোগ করতেন। ফলে যাত্রা ছিল এমন এক শিল্প, যা সমাজের সব স্তরকে এক সুতোয় বেঁধে রাখত।
যাত্রাদল: এক চলমান পরিবার
একটি যাত্রাদল গড়ে ওঠে অনেক মানুষের সমন্বয়ে। একজন উদ্যোক্তা বা ‘মালিক’ পুরো দলের দেখভাল করেন। বড় একটি দলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন সদস্য থাকেন— অভিনেতা, অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী, যন্ত্রী, ড্রেসম্যান, প্রম্পটার, ম্যানেজার এমনকি বাবুর্চিও।
এই দলগুলো ছিল ভ্রাম্যমাণ। এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে তারা অভিনয় করত। শ্রাবণ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত ছিল যাত্রার মৌসুম। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন এলাকায় যাত্রার জমজমাট আয়োজন হতো।
মঞ্চ নির্মাণও ছিল আলাদা এবং বর্ণাঢ্য সাজ। খোলা মাঠে বাঁশ ও টিন দিয়ে তৈরি প্যান্ডেলের মাঝখানে উঁচু মঞ্চ। চারদিক খোলা, যেন যেকোনো দিক থেকেই দর্শক দেখতে পারে। মঞ্চের পাশে বসতেন বাদ্যযন্ত্রীরা—মন্দিরা, ঢোল, বাঁশি, করতাল থেকে শুরু করে আধুনিক কালে হারমোনিয়াম, ড্রাম, বেহালা পর্যন্ত।
পরিবর্তনের ঢেউ, অবক্ষয় ও সংকট
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রার রূপও বদলেছে। একসময় যেখানে পদ্যসংলাপ ও গানের প্রাধান্য ছিল, সেখানে আধুনিক যাত্রায় সংলাপ ও অভিনয়ের গুরুত্ব বেড়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহার, আলোকসজ্জা, পোশাক—সবকিছুতেই এসেছে পরিবর্তন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ—এসব সামাজিক বিপর্যয় যাত্রার বিষয়বস্তুকেও প্রভাবিত করেছে। স্বাধীনতার পর নতুন করে যাত্রার উত্থান ঘটে। মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, সামাজিক পরিবর্তন—এসব বিষয় যাত্রায় উঠে আসে।
তবে আশির দশকে যাত্রাশিল্পে একধরনের অবক্ষয় শুরু হয়। অশ্লীল নৃত্য, জুয়ার প্রভাব—এসব কারণে যাত্রার ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক জায়গায় যাত্রার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যায়। এ ছাড়া টেলিভিশন, সিনেমা এবং বর্তমানে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট—এই আধুনিক বিনোদনমাধ্যমগুলো যাত্রার দর্শক কেড়ে নিয়েছে। এ কারণে অনেক যাত্রাদল বন্ধ হয়ে গেছে, অনেক শিল্পী পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।
যাত্রার পুনর্জাগরণ—ভবিষ্যৎ কোন পথে
সময়ের সংকট মোকাবিলায় সরকার যাত্রা নীতিমালা প্রণয়ন করে। ২০১২ সালে এটি গেজেটভুক্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে বেশ কিছু যাত্রাদল নিবন্ধন পায়। বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো কিছু নামকরা যাত্রাদল কাজ করে যাচ্ছে, যারা আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটানোর চেষ্টা করে চলেছে।
বর্তমানে যাত্রায় শুধু পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কাহিনি নয়, সামাজিক ও সমকালীন বিষয়ও উঠে আসছে। এতে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার একটি চেষ্টা লক্ষ করা যায়।
সময়ের বিবর্তন কিংবা সরকারি নীতিমালা সবকিছুর পরও যাত্রাপালা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে হাজার বছরের ঐতিহ্য, অন্যদিকে আধুনিকতার চাপ। প্রশ্ন হলো—এই শিল্প কি হারিয়ে যাবে, নাকি নতুনরূপে ফিরে আসবে?
গ্রামবাংলার কোনো কোনো মাঠে এখনো গভীর রাতে যাত্রার আসর বসে। শত শত মানুষ আগ্রহ নিয়ে তা উপভোগ করেন। এটি প্রমাণ করে, যাত্রার আবেদন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
যাত্রা কেবল একটি নাট্যধারা নয়; এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আবেগের অংশ। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন পৃষ্ঠপোষকতা, সৃজনশীলতা এবং নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা।
হয়তো কোনো এক রাতে, আবারও আলো জ্বলে উঠবে সেই প্যান্ডেলে, আবারও সংলাপ ছুড়ে মঞ্চে উঠবেন কোনো শিল্পী। আর সেই আলোয় যাত্রাপালা ফিরে পাবে তার হারানো জৌলুশ।
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা