উপমহাদেশের অস্ত্রোপচার বিস্ময়: সার্জারির জনক সুশ্রুত

মহর্ষি সুশ্রুত।

আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম বলতেই আমরা বুঝি পশ্চিমা বিশ্বকে। যেকোনো আবিষ্কার হোক বা বৈজ্ঞানিক সূত্র, বইয়ের পাতায় খুঁজে বেড়াই পশ্চিমা কোনো নাম। তবে অসংখ্য আবিষ্কার ও বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের শুরু হয়েছিল আমাদের এই উপমহাদেশ থেকেও।

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু এই উপমহাদেশেরই সন্তান। গাছের জীবন আছে যে তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করেন তিনি। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত ও বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন এই মহান বিজ্ঞানী। তিনি সবার আগে বেতার তরঙ্গ সফলভাবে প্রদর্শন করলেও বাণিজ্যিক পেটেন্ট না করায় তাঁর আবিষ্কারের স্বীকৃতি হাতিয়ে নেন বিজ্ঞানী মার্কোনি।  
এমন অনেক আবিষ্কারের সঙ্গেই জড়িত এই উপমহাদেশের অসংখ্য বিজ্ঞানীর নাম।

আজ এমনই এক মহান শল্যচিকিৎসকের গল্প বলি, যাঁর প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থিত ‘রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব সার্জনস’-এর প্রাঙ্গণে। যাঁর হাত ধরে আধুনিক শল্যচিকিৎসার সূচনা হয়েছিল।

আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের কথা, যখন ছিল না কোনো আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট কিংবা উন্নত অ্যানেসথেসিয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু প্রাচীন ভারতের এক শহর কাশীতে বসে এক দূরদর্শী মনীষী মানুষের শরীর কেটে রোগ নিরাময় থেকে শুরু করে অস্ত্রোপচারকে বিজ্ঞানের পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন। তাঁকে বলা হয় শল্যচিকিৎসা ও প্লাস্টিক সার্জারির জনক।
তিনি মূলত অস্ত্রোপচারকে হাতুড়ে চিকিৎসা বা অন্ধবিশ্বাসের জগৎ থেকে বের করে একটি সুশৃঙ্খল ও বিজ্ঞানসম্মত শল্যবিদ্যায় রূপ দিয়েছিলেন। যাঁর অমর কীর্তি ‘সুশ্রুত সংহিতা’ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়ে থাকে।

এই প্রাচীন গ্রন্থে প্রায় ১ হাজার ১২০টি রোগের নিখুঁত বিবরণ, ৭০০টির বেশি ঔষধি উদ্ভিদের ব্যবহার এবং অস্ত্রোপচারের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন তিনি, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণাঙ্গ শল্যচিকিৎসার দলিল এবং পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।

শুধু তা–ই নয়, অস্ত্রোপচারকে নিখুঁত ও সফল করার জন্য সুশ্রুত প্রায় ১২১ ধরনের বিশেষ শল্যযন্ত্র ডিজাইন করেছিলেন সেই সময়ে, যার মধ্যে প্রায় ২০টি ছিল ধারালো অস্ত্র বা ‘শস্ত্র’ এবং ১০১টি সহায়ক যন্ত্র। তিনি অস্ত্রোপচারকে সুনির্দিষ্ট করতে শল্যকর্মকে মোট ৮টি প্রধান ভাগে ভাগ করেছিলেন।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো সেই প্রাচীন যুগেও তিনি অস্ত্রোপচারের আগে যন্ত্রগুলো আগুনে পুড়িয়ে জীবাণুমুক্ত করার বিধান দিয়ে গিয়েছিলেন।

মহর্ষি সুশ্রুতকে ‘প্লাস্টিক সার্জারির জনক’-ও বলা হয়। সেই সময়ে বসেই তিনি ‘রাইনোপ্লাস্টি’ বা কাটা নাক পুনর্গঠন করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন ও তার ব্যবহার করেন। আরও মজার বিষয় হলো সেই সময়ে বসে তিনি রোগীর কপাল বা গাল থেকে ত্বকের অংশ কেটে এনে নিখুঁতভাবে নতুন নাক তৈরি করার এই কৌশলও ব্যবহার করেছিলেন, যা আজও চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি বিশাল মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়। এ বাদেও তিনি বিশেষ একধরনের সুচ দিয়ে চোখের ছানি অপসারণ এবং হাড় ভাঙা জোড়া লাগানোর মতো জটিল অপারেশনও করতেন বলে জানা যায়।

বর্তমান যুগে রোগীর কষ্ট দূর করতে অস্ত্রোপচারের সময় অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহারের প্রচলন থাকলেও তৎকালীন সময়ে তা মানুষের অজানা ছিল। সেই সময়ে বসেও এই মহান চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর ব্যথা ও কষ্ট কমাতে পরিমিত পরিমাণে শক্তিশালী মদ্য বা ওয়াইন এবং নির্দিষ্ট কিছু ভেষজ উপাদানের ব্যবহার চালু করেছিলেন, যা রোগীর স্নায়ু অবশ করতে সাহায্য করত।

মহর্ষি সুশ্রুত।

তাঁর আবিষ্কৃত ক্ষার সূত্র নামক এক বিশেষ সুতা, যা তিনি ফিস্টুলা অপারেশনে ব্যবহার করতেন, তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফিস্টুলা চিকিৎসায় ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া ও রক্তপাত ছাড়াই রোগ নিরাময় করা হতো। ভেঙে যাওয়া হাড় অস্ত্রোপচারের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধে গরম শলাকার ছ্যাঁকা দিয়ে রক্তনালি সিল করার মতো যুগান্তকারী পদ্ধতিগুলোর প্রবর্তনও করেন তিনি।
তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান দিতে মৃতদেহের ব্যবহারও করতেন তিনি। ফল, সবজি কিংবা মোমের মডেলে নিপুণভাবে অপারেশন করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিনব পদ্ধতি প্রবর্তন করেছিলেন তিনি, যা আজকের যুগের আধুনিক সিমুলেটেড মেডিকেল ট্রেনিংয়ের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

মূলত মহর্ষি সুশ্রুতই প্রথম এই সুদূরপ্রসারী চিন্তা করেছিলেন এবং তাঁর এসব যুগান্তকারী উদ্ভাবন শল্যবিদ্যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর এই আবিষ্কারগুলোই মানবসভ্যতাকে যুগ যুগ ধরে অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখিয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্ব যখন এই পদ্ধতির কথা ভাবতেও পারত না, সেই সময়ে মহান এই শল্যচিকিৎসক পথ দেখিয়েছিলেন। যাঁর হাত ধরেই এক নতুন বিপ্লব শুরু হয়েছিল শল্যচিকিৎসায়।