আমরা কি সেই ভালোবাসাটুকু পেতে পারি না বন্ধু?
এক সপ্তাহ ধরে ট্রমায় আছি নিজভূমের বন্যার কথা ভেবে। পানিতে ভাসছে প্রাণের শহর। বন্যাদুর্গত এলাকার ছবিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। আধো ঘুম আধো জাগরণে দেখছি, ভেসে যাচ্ছে প্রাচ্যের সৌন্দর্যরানি চট্টগ্রাম। যে শহরে বেড়ে ওঠা, শৈশবে উঠানে বানের পানিতে কাগজের নৌকা ভাসাতাম; পানির ঢেউয়ের তালে তালে আমার ছোট নৌকা চলত হেলেদুলে, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, মাঝির কে কোড়ত কে কোড়ত দাঁড় টানার শব্দ কানে ভেসে আসত।
ডুবে যাচ্ছে আমাদের মাটির কুঁড়েঘর। দেয়ালগুলো ভেঙে আছড়ে পড়ছে পানিতে। মা চিৎকার করে কাঁদছেন—‘আল্লাহ রে আঁর এনাম-মামুনরে হন্ডে রাইখুম। ও মা, ও বাপরে আঁর ঘরবাড়ি তো কিছুই নেই। আঁই কেন গড়ি বাঁচি থাইকুম রে মা। আঁর ফোয়া-মাইয়ু ফোয়ারে কী খাবাইয়ুম।’
মা দুই নয়ন জলে ভাসিয়ে দিচ্ছেন। মায়ের চোখের জল আর বন্যার পানি মিলে একাকার। পানিতে তলিয়ে যাচ্ছি আমি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। বুক ফেটে যাচ্ছে মা, মাটি, মাতৃভূমির জন্য। মা তো অতীত হয়েছেন দুই বছর আগে।
টিক টিক কড়ে ঘড়ির কাঁটা তিনটার ঘরে মিলিত হতে চলেছে। চোখে ভাসছে দিনেরবেলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যেমে দেখা বানভাসির ক্রন্দনধ্বনি, নিষ্পেষিত মানুষের আহাজারি। দুই বছরের শিশুটা বসে আছে প্লাস্টিকের গামলায়, ঝোরো হাওয়ায় ভেঙে পড়া পাখির বাসায় ছানাসহ মা পাখিটার তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য, কবরের লাশ ভেসে উঠেছে; লোহাগাড়ায় শিশু-বৃদ্ধ ভেসে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে খামাড়ের পশু, হাস-মুরগি, পুকুরের মাছ, বাশখালীতে বানের পানির গ্রাসে মাটি ঘর একটাও নেই। চারদিকে জলরাশি থই থই, পানির স্রোত, পানি আর পানি, পান করার মতো এক ফোঁটা সুপেয় পানি কোথাও নেই। হে মহান সৃষ্টিকর্তা! আপনি অন্তর্যামী, আপনি সব দেখেন, সব জানেন। চট্টগ্রামকে আপনি রহমতের চাদর দিয়ে বন্যার ছোবল থেকে রক্ষা করুন। জানি না সৃষ্টিকর্তার দরবারে পৌঁছেছে কি না বন্যার্তদের বিষাদের অশ্রু।
এক সপ্তাহ টানা বৃষ্টি থামার নামগন্ধ নেই। ভারী বর্ষণ মানে তুমুল বৃষ্টি অঝোরে বৃষ্টি, ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আকাশ ভেঙে চৌচির হওয়া বৃষ্টি, উথালপাতাল পাগলা বৃষ্টির কারণে প্রকৃতি ফুসে উঠেছে। যত অভিমান বৃহত্তর চট্টগ্রামে। কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হলে শহর পানিতে তলিয়ে যায়। সোনাব্যাঙ, কুনোব্যাঙ, সাপ–বিচ্ছু সব খাটের ওপরে চলে আসে।
জলাব্ধতা নিয়ে কত লেখালেখি, নিউজ, টক শো; কত মন্ত্রী এল গেল—কেউ কথা রাখেনি। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে একেবারে সোনার ওপরে। আর কত ওপরে উঠলে জানি না জলাবদ্ধতা নিরসন হবে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দুর্নীতি নিয়ে রচনা লিখলে হাজার হাজার কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন হবে না। খায়ধায় জব্বার, মোটা হয় নাকি আকবর। দেশের সিংহভাগ আয় আসে চট্টগ্রামের উন্নয়ন থেকে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানে সমগ্র দেশের উন্নয়ন।
অতীতে চট্টগ্রামের জনপ্রতিনিধিদের এত বেশি দেশপ্রেম ছিল, একেবারে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছেন। আজও জোয়ারের পানিতে আমরা ভাসছি। প্লেটো সক্রেটিসকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘দেশপ্রেম কী?’ সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে সুন্দরভাবে নিজের কাজটুকু করা।’
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘দেশকে ভালো না বাসলে তাকে ভালো করে জানার ধৈর্য থাকে না; তাকে না জানলে তার ভালো করতে চাইলেও ভালো করা যায় না।’
আমরা ভুলে যাই সবার আগে মা, মাটি, মাতৃভূমি।
বাবার কাছে শুনেছিলাম, ১৯৬৮ সালের বন্যার কথা, বাড়ির কাছে নৌকা ভিড়েছিল। শহরে চলে এসেছিল প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ। খুব মনে পড়ে, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াবহ ঘূণিঝড়, প্রাণঘাতী জলোচ্ছ্বাস। সাগরের নিম্নচাপ, মৌসুমি বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যা গ্রাস করেছে এমন একসময়, যখন পুরো দেশ বিশ্বকাপের ঝড়ে উন্মাদনায় মাতাল। ভিনদেশের অন্ধ সমর্থক আমরা। এত আবেগ জানি না বিশ্বের আর কোনো দেশের তরুণদের আছে কি না? বিশ্বকাপ চলাকালীন দেশের মানুষ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেছেন পতাকা, জার্সি, আতশবাজি, ভুভুজেলা, মিছিল, গানবাজনা, ভোজন রসদের পেছনে।
একবার চোখ বন্ধ করে ভাবুন চট্টগ্রামের মানুষের কথা। যে শহরে আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমিয়ে পড়ে। বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি। দেশের প্রবেশদ্বার কিন্তু চট্টগ্রাম। বাণিজ্য রাজধানী, দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা চট্টগ্রাম থেকে। ভাষা আন্দোলনে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার কর্তৃক অস্ত্রাগার নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামের মানুষের ভূমিকা ব্যাপক। বাংলা মাতৃভাষার ৪০ শতাংশ অনুজ্ঞাসূচক ক্রিয়া, যা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা থেকে উৎপত্তি। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারও কিন্তু বৃহত্তর চট্টগ্রামের।
বাংলাদেশের যেকোনো বড় দুর্যোগে চট্টগ্রামের মানুষ ছুটে গিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পাশে। সিডর, আইলা, ফেনীর বন্যা, উত্তরবঙ্গ—সবখানে ত্রাণভর্তি ট্রাক, নৌকাভর্তি খাবার, অসুস্থ রোগীকে বাঁচাতে রক্তদান, পরিবারের ছোট শিশুটিও এক টাকা–দুই টাকা করে মাঠির ব্যাংকে জমানো শেষ সঞ্চয় দিয়ে সহমর্মী হয়েছে মানুষের জন্য।
করোনাকালে প্রতিটি বিভাগে হাইফ্লো অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন, ওষুধ নিয়ে ছুটে গেছেন সবার আগে চট্টগ্রামের মানুষ। শুধু তা–ই নয়, সমগ্র দেশে চট্টগ্রামের গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ সংগঠনের সদস্যরা করোনা রোগী দাফন–কাফনে, হিন্দু–বৌদ্ধদের সৎকারের কাজে জীবন মুঠোয় নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
দেশের যেকোনো বড় বিপদে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা, কাছে থাকা চাটগাঁইয়ারা এখন মহাবিপদে। এবার দেখার বিষয়, চাটগাঁবাসীর পাশে কে? আমার প্রাণের শহর চট্টগ্রামের মানুষের পাশে অন্য জেলার প্রিয় মানুষ, প্রিয় বন্ধুরা নেই কেন? এত বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেন আমরা আজ একা?
আসুন চট্টগ্রাম বন্ধুসভা, চকরিয়া বন্ধুসভা, পটিয়া বন্ধুসভার মতো আপনিও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ব্যাংকে, ঘরের সিন্দুকে জমানো টাকা থেকে কিছু ডিপোজিট করি বন্যার্তদের জন্য। এটাই হবে এই মুহূর্তে শ্রেষ্ঠ মানবিক কাজ। শেষ বিচারের দিন আপনার মানবিক কাজগুলো আপনার পক্ষে কথা বলবে। চট্টগ্রামের ৭টি জেলার মানুষ পানিবন্দী, ৫৯টি উপজেলা প্লাবিত। মৃতের সংখ্যা ৫২ ছাড়িয়ে গেছে। শিশুও মারা গেছে প্রায় ২০টি। ক্লাব, সংগঠন, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে যেখানে আছি, দেশ-বিদেশ থেকে সবাই একত্র হয়ে ভালোবাসার হাত প্রসারিত করি বানভাসিদের জন্য।
এ দেশের ১৮ কোটি মানুষের ৩৬ কোটি হাত। এই হাত যদি বানভাসি মানুষের পাশে এগিয়ে দেয়, দেশের সব বন্ধুসভার বন্ধুরা যদি পাশে থাকেন, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা জলোচ্ছ্বাস—যত বড়ই হোক না কেন, তা মোকাবিলা করা খুব একটা কঠিন হবে না।
বন্ধু, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা