সমুদ্রে জোয়ার-ভাটা কেন এবং কীভাবে হয়

সমুদ্রে জোয়ার-ভাটাছবি: নাসা

সৈকতের তীরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালে অনেকেরই মনে হয়, বিশাল নীল আকাশ যেন সমুদ্রের জল ছুঁয়ে গেছে। ভ্রমণপিপাসুদের চোখে আরেকটি বিষয়ও সহজেই ধরা পড়ে—সমুদ্রের পানির নিয়মিত ওঠানামা। কখনো পানি এগিয়ে আসে তীরের দিকে, আবার কিছু সময় পর ধীরে ধীরে সরে যায় গভীর সমুদ্রের দিকে। এই নিয়মিত ওঠানামাই জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের উপকূলসহ বিশ্বের অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত দিনে দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা দেখা যায়। তবে জোয়ার-ভাটার নির্দিষ্ট সময় প্রতিদিন একই থাকে না। চাঁদের পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ এবং পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের কারণে দুটি উচ্চ জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। ফলে প্রতিদিন জোয়ারের সময় প্রায় ৫০ মিনিট করে পিছিয়ে যায়। স্থানীয় উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, দ্বীপ, নদীমোহনা ও অন্যান্য ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাও স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়।

পর্যটক কিংবা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—সমুদ্রের জল কেন একবার তীরে উঠে আসে এবং আরেকবার সরে যায় গভীর সমুদ্রের দিকে? এই ওঠানামার পেছনে কী কাজ করে? সমুদ্রের বিশাল জলরাশিকে আসলে কোন শক্তি নিয়মিতভাবে প্রভাবিত করে?

অনেকেরই হয়তো জানা আছে, পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার প্রধান কারণ হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ। তবে শুধু চাঁদই নয়, সূর্যের মহাকর্ষও জোয়ার-ভাটায় ভূমিকা রাখে। চাঁদ পৃথিবীর তুলনামূলকভাবে অনেক কাছে থাকায় জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব সূর্যের চেয়ে বেশি।

চাঁদ এবং সমুদ্রের জলের মধ্যে কিসের সম্পর্ক
চাঁদ পৃথিবীর সমুদ্রের জলকে কোনো যান্ত্রিক শক্তি দিয়ে টেনে নেয় না; বরং চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ভিন্ন মাত্রায় কাজ করে। চাঁদের সবচেয়ে কাছের পৃথিবীর অংশে এই আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি এবং দূরের অংশে তুলনামূলক কম। এই পার্থক্যই সমুদ্রের পানির বণ্টনে পরিবর্তন ঘটায় এবং জোয়ারের সৃষ্টি করে।

পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার। অন্যদিকে সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত হলেও এত দূরে অবস্থান করার কারণে জোয়ার সৃষ্টিতে তার প্রভাব চাঁদের চেয়ে কম। তবে সূর্যের মহাকর্ষও গুরুত্বপূর্ণ এবং চাঁদের সঙ্গে মিলিতভাবে এটি জোয়ারের উচ্চতা পরিবর্তন করে।

চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর সমুদ্রের পানির বণ্টনে এমন পরিবর্তন ঘটায় যে পৃথিবীর চাঁদের দিকে থাকা পাশে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। একই সময়ে পৃথিবীর বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত পাশে জোয়ারের অঞ্চল সৃষ্টি হয়।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, চাঁদের আলো সমুদ্রের পানিকে আকর্ষণ করে না। চাঁদের আলো আসলে সূর্যের আলো, যা চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে আসে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে সম্পর্কিত শক্তিটি হলো চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ।

জোয়ার-ভাটা কীভাবে সৃষ্টি হয়
চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে সমানভাবে কাজ করে না। পৃথিবীর যে অংশটি চাঁদের দিকে মুখ করে থাকে, সেখানে চাঁদের আকর্ষণ তুলনামূলক বেশি। ফলে ওই পাশের সমুদ্রের পানিতে একটি জলস্ফীতি তৈরি হয়।

অন্যদিকে পৃথিবীর বিপরীত পাশে চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ তুলনামূলক কম। পৃথিবী ও চাঁদের পারস্পরিক গতির কারণে সৃষ্ট জড়তার প্রভাবের সঙ্গে মহাকর্ষীয় পার্থক্যের ফলে বিপরীত পাশেও আরেকটি জলস্ফীতি তৈরি হয়। ফলে পৃথিবীর দুই বিপরীত পাশে দুটি জোয়ারি স্ফীতি তৈরি হয়।

পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘুরতে থাকায় বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল এই জলস্ফীতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করে। কোনো অঞ্চল যখন জোয়ারি স্ফীতির অংশে আসে, তখন সেখানে পানির উচ্চতা বাড়তে থাকে এবং জোয়ার দেখা যায়। আবার সেই অঞ্চল যখন দুই জোয়ারি স্ফীতির মাঝামাঝি অপেক্ষাকৃত নিচু পানির অংশে চলে যায়, তখন ভাটা দেখা যায়।

তবে বাস্তব পৃথিবীতে বিষয়টি এতটা সরল নয়। পৃথিবী পুরোপুরি মসৃণ গোলক নয়। মহাদেশের অবস্থান, উপকূলের আকৃতি, সমুদ্রের গভীরতা, উপসাগর, দ্বীপ, নদীর মোহনা, বাতাস ও ঝড়সহ নানা বিষয় জোয়ার-ভাটার সময় ও উচ্চতাকে প্রভাবিত করে। এ কারণেই একই সময়ে পৃথিবীর সব জায়গায় জোয়ার হয় না।

দৈনিক দুইবার জোয়ার-ভাটা কেন হয়
পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে আবার ফিরে আসতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা ৫০ মিনিট সময় লাগে। এই সময়কে বলা হয় চন্দ্রদিন বা লুনার ডে। কারণ, পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরার পাশাপাশি চাঁদও একই দিকে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। ফলে পৃথিবীকে চাঁদের তুলনায় একই অবস্থানে ফিরে আসতে অতিরিক্ত প্রায় ৫০ মিনিট ঘুরতে হয়।

পৃথিবীতে দুটি জোয়ারি স্ফীতি থাকায় একটি উপকূলীয় অঞ্চল সাধারণত একটি চন্দ্রদিনে দুইবার এই স্ফীতির মধ্য দিয়ে যায়। ফলে অধিকাংশ উপকূলীয় এলাকায় দিনে প্রায় দুইবার উচ্চ জোয়ার এবং দুইবার নিম্ন জোয়ার দেখা যায়। দুটি উচ্চ জোয়ারের ব্যবধান প্রায় ১২ ঘণ্টা ২৫ মিনিট। একটি উচ্চ জোয়ার থেকে পরবর্তী নিম্ন জোয়ারে যেতে গড়ে প্রায় ৬ ঘণ্টা ১২ মিনিট সময় লাগে।

তবে সব উপকূলে দিনে ঠিক দুইবার জোয়ার ও দুইবার ভাটা দেখা যাবে, এমন নয়। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও সমুদ্রের গঠন অনুযায়ী কোথাও জোয়ার-ভাটার ধরন ভিন্ন হতে পারে। তাই কোনো নির্দিষ্ট সৈকতে জোয়ার বা ভাটার সময় জানতে স্থানীয় জোয়ারের পূর্বাভাস দেখা প্রয়োজন।

সূর্যেরও কি ভূমিকা আছে?
জোয়ার-ভাটার ক্ষেত্রে চাঁদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হলেও সূর্যের মহাকর্ষও গুরুত্বপূর্ণ। সূর্য চাঁদের তুলনায় অনেক বেশি ভরযুক্ত, কিন্তু পৃথিবী থেকে অনেক দূরে। ফলে জোয়ার সৃষ্টিতে সূর্যের প্রভাব চাঁদের তুলনায় কম। নাসার তথ্য অনুযায়ী, সূর্যের জোয়ার-ভাটা সৃষ্টিকারী বল চাঁদের তুলনায় অর্ধেকের কম।

যখন সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ প্রায় একই সরলরেখায় অবস্থান করে, অর্থাৎ অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময়—চাঁদ ও সূর্যের জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব একে অপরকে শক্তিশালী করে। তখন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চ জোয়ার ও বেশি নিম্ন ভাটা দেখা যায়। একে বলা হয় ভরা জোয়ার।

অন্যদিকে প্রথম ও শেষ চতুর্থাংশের চাঁদের সময় সূর্য ও চাঁদ পৃথিবীর তুলনায় প্রায় সমকোণে অবস্থান করে। তখন তাদের জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব আংশিকভাবে একে অপরের বিপরীতে কাজ করে। ফলে জোয়ারের উচ্চতা তুলনামূলক কম হয়। একে বলা হয় মরা জোয়ার।

আরও পড়ুন

চাঁদ কীভাবে পৃথিবীর ঘূর্ণনেও প্রভাব ফেলে
জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে চাঁদ শুধু সমুদ্রের পানির ওঠানামাতেই প্রভাব ফেলে না; দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর ঘূর্ণনগতিতেও প্রভাব ফেলে। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ারি স্ফীতি চাঁদের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে জোয়ার-ভাটাজনিত ঘর্ষণ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়া পৃথিবীর ঘূর্ণনকে খুব ধীরে ধীরে মন্থর করে এবং একই সঙ্গে চাঁদকে পৃথিবী থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে চাঁদ না থাকলে বর্তমান পৃথিবীর দিন হঠাৎ ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার হয়ে যেত। পৃথিবীর ঘূর্ণন, চাঁদের অবস্থান এবং পৃথিবী-চাঁদের পারস্পরিক সম্পর্ক দীর্ঘ কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের ফল। তাই চাঁদের অনুপস্থিতিতে পৃথিবীর বর্তমান ঘূর্ণন ও দিনের দৈর্ঘ্য ঠিক কত হতো, তা একটি সরল হিসাব দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।

চাঁদ না থাকলে পৃথিবীতে কি পরিবর্তন হতে পারত?
চাঁদ পৃথিবীর জোয়ার-ভাটার প্রধান চালিকা শক্তি হওয়ায় চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার ধরন অবশ্যই বদলে যেত। সূর্য একাই জোয়ার সৃষ্টি করতে পারত, তবে তা চাঁদ ও সূর্যের সম্মিলিত বর্তমান প্রভাবের তুলনায় অনেক দুর্বল হতো। ফলে পৃথিবীর উপকূলীয় পরিবেশ ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটতে পারত।

চাঁদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষের স্থিতিশীলতায় সহায়তা করা। চাঁদের মহাকর্ষ পৃথিবীর অক্ষের দিকের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। চাঁদ না থাকলে পৃথিবীর অক্ষ তুলনামূলকভাবে বেশি দুলতে পারত এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর ঋতু ও জলবায়ুতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতো।

অর্থাৎ চাঁদ শুধু রাতের আকাশকে আলোকিত করা একটি সুন্দর মহাজাগতিক বস্তু নয়। পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা থেকে শুরু করে পৃথিবীর ঘূর্ণন ও অক্ষের স্থিতিশীলতা—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে চাঁদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে যখন দেখা যায়, পানি কখনো ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে, আবার কখনো সরে যাচ্ছে, তখন সেটি শুধু সমুদ্রের স্বাভাবিক নড়াচড়া নয়। এর পেছনে কাজ করছে পৃথিবী, চাঁদ ও সূর্যের পারস্পরিক মহাকর্ষীয় সম্পর্ক এবং পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন। প্রকৃতির এই নিয়মিত ছন্দই আমাদের কাছে জোয়ার-ভাটা নামে পরিচিত।

তথ্যসূত্র: নাসা সায়েন্স, ন্যাশনাল ওকেন অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা এবং এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাব