কনকনে শীতের রাত। এই প্রথম বন্ধু সমাবেশে যাব ভেবে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম বন্ধু সমাবেশে যেতে না পারার আক্ষেপ এবার ঘুচবে। ছোট্ট একটা ব্যাগে কিছু কাপড় গুছিয়ে রেখেছি। ভোরের ট্রেনে রওনা হব।
নাটকীয় ট্রেন-ভ্রমণ শেষে মৌচাক স্কাউট মাঠে পৌঁছাতে দুপুর হয়ে গেল। সেখানে গিয়েই বন্ধুসভা থেকে ছোট্ট গিফট পেলাম। ভাবছিলাম নিশ্চয়ই আরও কত কী অপেক্ষা করছে! তাঁবুর সামনে যেতেই সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল। মাটিতে খড় ছিটিয়ে তার ওপর কার্পেট বিছানো হলো। দুর্দান্ত আয়োজন!
ধীরে ধীরে অন্যান্য বন্ধুসভার বন্ধুদের আনাগোনায় পরিবেশ মুখর হতে থাকল। কারও কারও সঙ্গে আলাপচারিতা জমল। মনে হচ্ছিল তাঁদের সঙ্গে বুঝি অনেক আগে থেকেই পরিচয়! বুঝলাম, বন্ধুসভার বন্ধু মানে সবাই এক, সে যেকোনো বন্ধুসভার সদস্যই হোক।
লেখক বন্ধু উৎসবে পরিচিত হওয়া অনেকের সঙ্গেই দেখা হলো। প্রত্যেকের চোখেমুখে যে উৎসাহ দেখলাম তা অনেক বেশি মুগ্ধ করেছে। সন্ধ্যায় মঞ্চে গিয়ে সবাই জড়ো হলাম। একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হলাম। দ্রুত সখ্য বাড়তে থাকল। বেশ কয়েকজন মিলে একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে গানের সঙ্গে সুর মেলালাম। সেই আনন্দের রেশ এখনো কাটেনি।
খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর কথা বেশ মনে পড়ে। প্রথম রাতে যখন লাইনে দাঁড়াই তখন শরীর বেশ ক্লান্ত। দীর্ঘ সারি দেখে আরও বেশি ক্লান্ত লাগছিল। এ সময় ভৈরব বন্ধুসভার কয়েকজন বন্ধু এমপি-থ্রি প্লেয়ারে গান ছেড়ে গাইতে শুরু করল। অন্যরাও ব্যাপক উৎসাহে কণ্ঠ মিলায়। নিমেষেই ক্লান্তি দূর হয়ে গেল আমাদের। কেউ খাবারের জন্য হুড়োহুড়ি, বিশৃঙ্খলা করেনি। বন্ধুসভার বন্ধু ছাড়া এই শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারটা এর আগে খুব একটা চোখে পড়েনি।
তাঁবুতে গিয়ে দেখি বন্ধুরা এখানে-ওখানে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে আর মনের সুখে গান গাইছে। তখন আর বিশ্রামের জন্য মন সায় দিল না। কুয়াশার ভেতর ছোট্ট বন। সেখানে এত চমৎকার রাতের আয়োজন কে কখন দেখেছে? রাত তিনটা পর্যন্ত নির্ঘুম থেকে অবশেষে তাঁবুতে প্রবেশ করলাম। তখনো এদিক-ওদিক থেকে বন্ধুদের সুরেলা কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল।
দ্বিতীয় দিনও একইভাবে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে কাটালাম। দেয়ালিকা টানানো হলো, সেরা বন্ধুসভা ঘোষিত হলো, নতুন কমিটি অনুমোদন পেল, কনসার্ট হলো, বন্ধুসভার পরিবেশনা ছিল; সব মিলিয়ে এক মহা উৎসব!
সুন্দর সময় বোধ হয় দ্রুতই ফুরিয়ে যায়। তবে সেই সুন্দর আমাদের মনে রেখে দেয় গভীর অনুভূতি। যা মন খারাপের সময় অফুরন্ত রোমাঞ্চ জাগায়। আমরা সেই অনুভূতি আর উচ্ছ্বাস নিয়ে তৃতীয় দিন নিজ বাসভূমে ফিরে এলাম। এমন সময় আরও ফিরবে, এমনটাই প্রত্যাশা।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা