১ থেকে ২০০তম—সব পাঠচক্রে যাঁর সপ্রতিভ উপস্থিতি

প্রথম আলো ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং ভৈরব বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন মোল্লাছবি: বন্ধুসভা

ভৈরব বন্ধুসভা ২০০তম পাঠচক্রের বিশাল মাইলফলক অতিক্রম করেছে। এই ২০০ শুধু সংখ্যা নয়, এটি আমাদের মুদ্রিত বইপড়ার গল্প। ২০০টি মুদ্রিত বই নিয়ে দলগত আসর, আবার কখনো পাঠের আসরকে ফেরি করে নিয়ে যাওয়া হয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ২০০তম পাঠচক্র ছোঁয়ার স্বপ্ন আমরা বন্ধুরা দেখছি দুই বছর ধরেই। কখন এই মাইলফলক স্পর্শ করব! গ্রন্থপ্রেমীদের নিয়ে পাঠক উৎসব নিয়েই কত শত ভাবনা।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভৈরব পৌর শহরের অ্যামবিশন পাবলিক স্কুল প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় ২০০তম পাঠচক্রের আসর। একঝাঁক প্রাণবন্ত শিক্ষার্থীর সঙ্গে পড়ন্ত বিকেলে জমে ওঠে আলোচনা। বিষয় ছিল প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সম্পাদিত বই সফলদের স্বপ্ন গাথা ‘বাংলাদেশের নায়কেরা’। বাংলাদেশের ১৯ কীর্তিমান মানুষকে নিয়ে এ বই। তাঁদের মধ্যে একজন পলান সরকার, যাঁর জীবনের ছয়টি দশক কেটেছে বইয়ের নেশায়। পাঠচক্রে মুক্ত আলোচনার আসরে আমিও অংশ নিই। আমি কথা বলি পলান সরকারকে নিয়ে। বাড়ি বাড়ি বিনা মূল্যে বই পৌঁছে দিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রন্থপাঠে আগ্রহী করে তুলেছিলেন তিনি। তাঁর এই নীরব কর্ম প্রথমবার ২০০৭ সালে প্রথম আলো পুরো দেশে আলোচনায় আনে। এমন আরও অনেক কীর্তিমান ব্যক্তির অসাধারণ কর্মগুলোকে পাঠকের সামনে তুলে ধরেছে প্রথম আলো।

পাঠচক্রে সুমন মোল্লা শুধু উপস্থিত থাকেন, তা নয়; পাঠের আসরের পূর্বে প্রতিটি বই তিনি নিজে পড়েন, আলোচনায় অংশ নেন এবং সবার আলোচনা শেষে মূল্যায়ন করেন।
ছবি: বন্ধুসভা

বই পড়তে পড়তে, বইপ্রেমী মানুষগুলোকে দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগে। পলান সরকারকে দেখা হলো না। তবে একদিন ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যাব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে দেখার জন্য।

বইয়ের লেখা মানুষের বাইরে একজন আলোকিত মানুষ দেখেছি, তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি, যিনি বইপড়াকে উৎসবে পরিণত করেছেন। বর্তমানে তাঁর স্বপ্নে ভৈরবের একদল স্বপ্নবাজ তরুণ কাজ করছি। বই পড়ছি, মানবিক, সামাজিক নানা কাজে যুক্ত আছি। তিনি সুমন মোল্লা। প্রথম আলো ভৈরবের নিজস্ব প্রতিবেদক এবং ভৈরব বন্ধুসভার উপদেষ্টা। বন্ধুসভা প্রথম আলোর পাঠক সংগঠন। আমরা যারা ভৈরব বন্ধুসভায় কাজ করি, প্রত্যেকেই একটা স্বপ্ন নিয়ে বন্ধুসভার নৌকায় পা রাখি, চলার পথে নৌকার বৈঠা ধরে দিকনির্দেশনা দেন সুমন মোল্লা।

২০১৬ সাল। মৈমনসিংহ গীতিকার ‘চন্দ্রাবতী’ নিয়ে পাঠের আসরের মাধ্যমে ভৈরব বন্ধুসভায় আমার যাত্রা শুরু। গিয়ে দেখি কয়েকজন মিলে আলোচনা করছে। পাঠচক্র বিষয়টি ছিল আমার কাছে একদমই নতুন। চন্দ্রাবতী সম্পর্কে পাঠ্যবইয়ে পড়েছি। সেদিন চন্দ্রাবতী সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য জানলাম। সুপ্ত মনে ভালো লাগা কাজ করে বন্ধুসভার প্রতি। এরপর টানা অনেকগুলো পাঠচক্রে উপস্থিত থাকলাম। একদিন আমিও পাঠচক্রে আলোচনায় অংশ নিলাম। বিষয়—সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আঠারো বছর বয়স’ কবিতা । মনে আছে, ওপরের দিকে তাকিয়ে ঝটপট কী যেন বলে ফেললাম। এই প্রথম সবার সামনে কথা বললাম। হাত-পা কাঁপছিল, গলা শুকিয়ে গেল। শেষ করার পর সবাই হাত তালি দিল। আমার মনে অজানা এক ভালো লাগা কাজ করল বইয়ের প্রতি।

‘মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প নেই, পাঠচক্রের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। বন্ধুসভার সদস্য হতে হলে অন্তত তিনটি পাঠচক্রে উপস্থিত থাকতে হবে।’
ভৈরব বন্ধুসভার উপদেষ্টা সুমন মোল্লা

আমার আলোচনা শুনে সুমন মোল্লা ভাই বলেন, ‘প্রিয়াংকা, প্রথমবার ভালো চেষ্টা করেছ। ধীরে ধীরে নিশ্চয়ই আরও ভালো আলোচনা করবে। বই পড়বে, যত পড়বে ততই নিজের উন্নতি করবে।’ সেদিন ওনার মন্তব্য আমাকে বিস্ময় এবং উৎসাহিত করে। তাই তো আজ আমি নিজেকে মেলে ধরতে পারছি, এই জন্য পাঠচক্রের অবদান অনেক।

১ থেকে ২০০তম পাঠচক্রের সব কটিতে সুমন মোল্লা ভাইয়ের ছিল সপ্রতিভ উপস্থিতি। সেদিন ২০০তম পাঠচক্র ছিল তাঁর জন্যও বিশেষ দিন। এই দিনটির অপেক্ষায় তিনি নিজেও ছিলেন।

সুমন মোল্লা বলেন, ‘মুদ্রিত বইয়ের বিকল্প নেই, পাঠচক্রের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই। বন্ধুসভার সদস্য হতে হলে অন্তত তিনটি পাঠচক্রে উপস্থিত থাকতে হবে।’

২০০তম পাঠের আসরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সুমন মোল্লা বলেন, ‘এই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিলাম। সালটি ২০১৬। নিউমার্কেটের তৃতীয় তলাম প্রথম আলো অফিসে পাঠচক্র শুরু। শুরুতে চার-পাঁচজন। তারপর ১০-১৫ হতো। পাঠচক্রের ব্যাপকতা বাড়তে থাকে। ভৈরবের বইপড়ুয়া তরুণেরা বন্ধুসভায় যুক্ত হতে থাকে। একসময় ৭০-৭৫ জনে গিয়ে পৌঁছায়। অফিসে বসার জায়গা না পেয়ে অনেকে ফ্লোরে বসে পড়ত, তবু আলোচনা শুনবে। এখন পাঠচক্র নিয়ে আমরা ফেরি করছি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। উদ্দেশ্য একটাই—বইপড়া, বইপড়া, বইপড়া। বর্তমানে ইলেকট্রনিক ডিভাইস তরুণদের চিন্তাকে সংক্ষিপ্ত করে আনছে। আর বই মনের স্বাস্থ্যের বিকাশ, কল্পনাশক্তিকে শাণিত করবে। আমাদের মুদ্রিত বইপড়ার এই মহাযজ্ঞে প্রাণ দিয়েছে বন্ধুসভার তরুণেরা।’

সুমন মোল্লাকে সম্মাননা স্মারক প্রদান
ছবি: বন্ধুসভা

পাঠচক্রে সুমন মোল্লা শুধু উপস্থিত থাকেন, তা নয়; পাঠের আসরের পূর্বে প্রতিটি বই তিনি নিজে পড়েন, আলোচনায় অংশ নেন এবং সবার আলোচনা শেষে মূল্যায়ন করেন। বিশ্লেষণধর্মী, নানা শব্দের ব্যাখ্যা, বইয়ের ব্যক্তি কিংবা ঘটনার সঙ্গে বাস্তব জীবনের প্রভাব—সবই চমৎকারভাবে তুলে ধরেন। আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনি তাঁর কথা।

সুমন মোল্লা সব সময় বলেন, ‘আমি স্বপ্ন দেখি একদিন ভৈরব হবে বইপড়ার শহর। পাবলিক লাইব্রেরিগুলো ধুলো মুছে মানুষের পদচারণে মুখরিত হবে, তরুণদের চায়ের আড্ডায় বই নিয়ে কথা হবে। আমার মামা বলেন, যারা বই পড়ে তারা ভুল করে না। আমাদের বইপড়ুয়া তরুণরা ভুল করবে না।’

আমিও তা–ই মনে করি। বই পড়ব, আমরাও পাঠের আসরের ফেরি করে বই পড়াব। বইপড়ুয়া মানুষ তৈরি করব। আমরা সবাই মিলে এগিয়ে নিয়ে যাব আমাদের বাংলাদেশকে। আমরা সবাই বাংলাদেশ।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা