‘দাদাভাই, আপনার বাচ্চা ছেলেটা আসছে’

অলংকরণ: আরাফাত করিম

ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় খেয়াল করলাম, আব্বার স্যান্ডো গেঞ্জিটা ফুটো ফুটো। সবার জন্য এটা–ওটা কিনলেও নিজের জন্য পাঁচ টাকা খরচ করে গেঞ্জি কিনতেন না।
জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আরে বেটা কিনে নিব, চলে তো।

নিজে বাবা হয়ে বুঝলাম, চলে তো মানে কী? প্রতিটা বাবাই পরিবারের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়ে যান। আমাকে সব সময় ‘ডিয়ার সান, ডিয়ার সান’ বলতেন, কখনো গানের সুরে, কখনো ধমকের সুরে; কিন্তু চোখেমুখে তৃপ্তির ঝিলিক দেখতে পেতাম।

ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় পাশের বাসায় ভিসিআরে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমা চলছে, টিনশেড ভবন হওয়ায় সব ঠিকঠাক শুনতে পাচ্ছিলাম, মন পড়ে আছে ওখানে। হঠাৎ আব্বার কলিগ এল, সুযোগ পেয়ে সিনেমা দেখতে চলে গেলাম। আংকেল চলে গেলেন, আব্বা অনেকবার ডাকলেন, সিনেমা শেষ করে বাসায় ঢুকতেই ফুটবলের মতো একটা কিক মারলেন; চোখেমুখে অন্ধকার দেখতে দেখতে দেয়ালের ওপাশে গিয়ে পড়লাম। সেনাবাহিনীর কিক বলে কথা। আম্মা–আপা চিল্লাতে লাগল, তখন আমাকে ধরে পা দুটো ওপরের দিকে দেয়ালের সঙ্গে রেখে দুহাতে কান ধরিয়ে রাখলেন। এরপর আর অবাধ্য হবার সাহস পাইনি।

আরেক দিন ফজরের নামাজের সময়ে আমাকে আর মেজ আপাকে ডেকে মসজিদে চলে গেলেন। তখন অক্টোবরের শেষ দিকে, সকালের আবহাওয়া ঘুমের জন্য চমৎকার হওয়ায় আমরা উঠতে পারিনি। আব্বা এসে দেখেন, আমরা ঘুমে। ব্যস, সারা দিন কাঁথা গায়ে ভাইবোনকে শুয়ে থাকতে হবে, নো খাওয়া, নো স্কুল। এরপর আর খুব একটা নামাজ কাজা হয়নি।

মাঝেমধ্যে এ রকম কঠোর হলেও মন ঠিকই আমাদের জন্য কাঁদতেন। নাশপাতি পছন্দ করি, কিন্তু এত দাম দিয়ে কিনতে পারেননি বলে সব সময় আফসোস করতেন; গলদা চিংড়ি খেতে চেয়েছিলাম, দামের জন্য আনতে না পারার দুঃখ এখনো শেষ হয়নি।

আব্বার বয়স এখন ৮১। চোখে খুব একটা দেখেন না, কানে একেবারেই শোনেন না। তবু আমি কখন বাড়িতে ফিরব, সেই টেনশন সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে দ্বিধা করেন না। আমার ছেলেমেয়েরা বলে, ‘দাদাভাই, আপনার বাচ্চা ছেলেটা আসছে’, তখন আব্বা হাসেন।
সকালে উঠেই জিজ্ঞেস করেন, ‘অফিসে কখন যাবা?’
হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা প্রয়োজনে ছুটি কাটালে, বারবার জানতে চাইবেন, প্রপার ওয়েতে ছুটি নিয়েছি কি না? কোনো সমস্যা হবে কি না? ইত্যাদি ইত্যাদি।

বাবা মানেই বাবা, বাবার স্নেহ–ভালোবাসা সব সময়ই একই রকম। কখনো কখনো মনের অজান্তেই বলে ওঠেন, ‘ডিয়ার সান, ডিয়ার সান’।

লেখক: ম্যানেজার, এনআরবি ব্যাংক পিএলসি