শূন্য শহর থেকে লালনের দরবারে—এক ভ্রমণকথা

ফকির লালন শাহের মাজার।

ঈদের ছুটিতে বাস, ট্রেন, লঞ্চে চড়ে সবাই যার যার গ্রামে বেড়াতে গেল। শূন্য মহানগরীতে পড়ে রইলাম আমি আর একরাশ হাহাকার। তবে কাজের সুবাদে ঈদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন চিড়িয়াখানা ও আহসান মঞ্জিলে যেতে হয়েছিল; তাতে ঘোরাঘুরিও হলো, কাজও হলো। এরপর ২৪ মার্চ পেলাম ঈদের ছুটি। ভাবছিলাম কী করা যায়!

বন্ধুবান্ধবদের অধিকাংশই ঢাকার বাইরে, যারা ঢাকায় আছে তাদেরও ছুটি শেষ হয়ে আসছে। এখন উপায়? নিজের ছুটিটা তো কাজে লাগাতে হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় আমার আত্মীয় আছে। কুষ্টিয়াতে ছোট ফুফুর বাড়ি। ঠিক করলাম কুষ্টিয়া থেকেই ঘুরে আসি। যেই ভাবা সেই কাজ, চলে গেলাম কুষ্টিয়া।

২৬ মার্চ ঘুরতে যাই লালন শাহর মাজারে। দুপুরে বের হই। ফুফু বলেছিল বিকেলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি দুপুরকেই বেছে নিলাম। ফুফুর বাড়ি থেকে লালনের মাজারের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। অটোরিকশা নিয়ে পৌঁছালাম মাজারের গেটে। রিকশা থেকে নামতেই একজন বলল, ‘১১০ টাকা দেও বাবা, কিছু খাইনি। তোমার জন্য দোয়া করব।’ পকেট থেকে টাকা বের করে তাঁর হাতে দিয়ে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করলাম।

গাছের নিচে বসে আছেন সাধু-সন্ন্যাসীরা

তপ্ত দুপুর, মানুষজন কিছুটা কম। অডিটোরিয়ামে গেলাম, সেখানে কিছু সাধু গান করছেন। বসে বসে দুটো গান শুনলাম, তারপর মাজার থেকে বের হলাম। মাজার গেটের উল্টো পাশে একটা মাঠ আছে, সেখানে গিয়ে মাঠের পাশ দিয়ে হাঁটছি। এমন সময় এক বেদের মেয়ে এসে বলল, ‘ভাই, ১০ টাকা দে, তোর বোন-ভাগনি চাইলে দিতি না? আমাকে দে।’ পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে তাকে ২০ টাকার একটি নোট দিলাম। সে বলল, ‘খুশি হয়ে দিছিস তো?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ ‘তাহলে ২০ টাকাই নিয়ে গেলাম’, সে বলল। আমি আর কিছু বললাম না।

হেঁটে সামনের দিকে যাচ্ছি...একটা পুকুর দেখা যাচ্ছে। পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। ১০ বছরের এক বাচ্চার সঙ্গে এক লোক মজার ছলে কথা বলছেন, ‘তুই যে পুকুরে নামছিস, এখানে সাপ আছে। তোকে কামড় দেবে।’ বাচ্চাটি নির্ভয়ে বলল, ‘কামড় দেবেনানে, সাপ আমার বন্ধু হয়।’
আরও নানা কথা বলছিল তারা, দাঁড়িয়ে শুনছিলাম। এরপর আবার পুকুরপাড় ধরে হাঁটছি। বেশ বড় পুকুর, পাড় ঘেঁষে কিছু বটগাছ আছে। গাছের নিচে বসে আছেন সাধু-সন্ন্যাসীরা। তাঁদের দু-একটা ছবি তুললাম। মাজারের পাশে বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্রের দোকান; সেখান থেকে ‘জিপসি’ নামের একটি বাদ্যযন্ত্র কিনলাম, যা লোকসংগীতে ব্যবহার করা হয়।

আশপাশে তাকালাম, কাউকে দেখে মনে হলো না যে সে ভালো ছবি তুলতে পারবে; তাই নিজেই একটা সেলফি নিলাম।

আবারও মাজারের ভেতরে প্রবেশ করলাম। এবার এক পাগলের দেখা মিলল, সে হাতে খেলনা বন্দুক নিয়ে অনবরত গোলাগুলি করছে। যেন কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে আছে এবং চারদিকে তার শত্রুরা; সে অবিরাম গুলি চালিয়ে যাচ্ছে!

আবারও অডিটোরিয়ামে গিয়ে গান শুনছি। হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছেলে এসে আসরে বসে গুরুকে সিজদাহ করল। একটু অবাক হলাম, তবে কিছু জিজ্ঞেস করিনি। কারণ, এ সম্পর্কে আগেও শুনেছি, কিছু কিছু দেখেছিও, যেমন গুরুকে পা ধরে সালাম করা বা পায়ের ধূলি মাথায় নেওয়া ইত্যাদি। তবে সরাসরি সিজদাহ দিতে এবারই প্রথম দেখলাম।

যাহোক, গান শোনা শেষ করে অডিটোরিয়াম থেকে বের হলাম। ভাবলাম, এসেছি যখন, একটা ছবি তুলে যাই। সমস্যা হচ্ছে, ছবি তুলে দেওয়ার মতো কেউ নেই। আশপাশে তাকালাম, কাউকে দেখে মনে হলো না যে সে ভালো ছবি তুলতে পারবে; তাই নিজেই একটা সেলফি নিলাম।

দপ্তর সম্পাদক, সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভা