‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
মহাভারতে ধর্মরাজ বকরূপ ধারণ করে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরকে পাঁচটি প্রশ্ন করেছিলেন। তার একটি ছিল, ‘বন্ধু কে?’ জবাবে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, ‘উৎসবে, বিপ্লবে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গী হন, তিনিই বন্ধু।’ তাই বলা যায়, ভালো বন্ধুত্ব হলো এমন এক সম্পর্ক, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যে বিপদে-আপদে, আনন্দ-বেদনায় সব সময় পাশে থাকে।
সমাজে বন্ধুহীনতার যাবতীয় পরিবেশ থাকার পরও একজন ভালো বন্ধু না থাকলে জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। বন্ধু অনেকটা জানালার মতো। তবে এই জানালা হৃদয়ের। যে জানালা দিয়ে প্রতিদিন নির্মল বায়ু প্রবাহিত হয়ে হৃদয়কে সতেজ ও সহজ করে। জীবনের ঘানি টানতে টানতে মানুষ মুক্তির পথ খোঁজে। দুদণ্ড কারও কাছে বসে হৃদয়ের ভাব আদান-প্রদান করে নিজেকে হালকা করতে চায়। এ ক্ষেত্রে এমন একটা মানুষের প্রত্যাশা থাকে যে ব্যক্তিকে যেমন বুঝতে পারবে, তেমনি মুখ দেখে উপলব্ধি করতে পারবে মনের অবস্থা। আবার আস্থাহীনতায় সাহসও জোগাবে। কথায় আছে, ‘অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রাণ’–এই আলো, এই প্রাণের ছোঁয়া পেতে জীবনে একজন ভালো বন্ধুর বিকল্প নেই।
‘কাউকে সারা জীবন কাছে পেতে চাও? তাহলে প্রেম দিয়ে নয়, বন্ধুত্ব দিয়ে আগলে রাখো। কারণ, প্রেম একদিন হারিয়ে যাবে, কিন্তু বন্ধুত্ব কোনো দিন হারায় না।’ উক্তিটি ইংরেজ সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের।
তাই বন্ধুত্ব গড়তে হয় সময় নিয়ে, দীর্ঘদিন মন ও মননে উপলব্ধির মাধ্যমে। বন্ধুত্ব রাতারাতি গড়ে তোলার বিষয় নয়। আবার উদ্দেশ্য করেও বন্ধু নির্বাচন করা সম্ভব হয় না। একসঙ্গে দীর্ঘদিনের পথচলা, নিজেদের মধ্যে ভাববিনিময়, চিন্তাচেতনার মিল এবং সর্বোপরি পরস্পরকে বোঝা ও উপলব্ধি করার মধ্য দিয়েই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। বন্ধুত্বের সম্পর্কটা অনেকটা ফুলগাছ রোপণ করার মতো। একটি ফুলগাছ রোপিত হলো, তাতে ফুল ফুটল, দেখে আনন্দ অনুভব করলাম, হৃদয়মন পুলকিত হলো। কিন্তু গাছটির যদি পরিচর্যা না করা হয়, তাহলে ধীরে ধীরে ফুলগাছটি বিবর্ণ হয়ে যাবে, শীর্ণকায় হয়ে যাবে এবং একসময় হয়তো মরে যাবে। তাই বন্ধুত্ব বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রতিনিয়ত পরিচর্যা করতে হয়। এ জন্য দুই দিকের আন্তরিকতা, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রয়োজন। একক চেষ্টায় কোনো সম্পর্ক স্থায়ী হয় না। একসময় সম্পর্কগুলো প্রাণহীন সম্পর্ক হয়ে ওঠে।
১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর দৈনিক প্রথম আলোর যাত্রা শুরু হয়। এর এক সপ্তাহ পর ১১ নভেম্বর থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথম আলোর পাঠক ফোরাম- বন্ধুসভা। বন্ধুসভা মূলত পাঠকদের সংগঠন।
এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই যে আজকের তরুণসমাজই আগামী দিনে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু নেতৃত্ব দিতে হলে ব্যক্তিকে যেমন মানবিক হতে হয়, কাজে-কর্মে স্বার্থহীন হতে হয়, তেমনি দক্ষও হয়ে উঠতে হয়। ইত্যাদি মানবিক মূল্যবোধ ও প্রয়োগমূলক দক্ষতায় উজ্জীবিত মানুষের সম্মিলিত হওয়ার, নিজেদের গড়ে তোলার এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করার একটি মঞ্চ বন্ধুসভা।
বন্ধুসভা বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড করে থাকে। যেখানে বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করার সুযোগ পান। এর মধ্য দিয়ে বন্ধুদের মধ্যে যেমন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে, তেমনি সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতাও তৈরি হয়। সবাইকে সমান চোখে দেখা ও আপন করে নেওয়ার চর্চাও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হলে থাকতে হয়। বন্ধুসভায় কাজ করতে এসে তরুণেরা ইত্যাদি নানা বিষয় শেখার সুযোগ পেয়ে থাকেন।
তরুণ বলতে আমরা কাদের বুঝব? শুধু বয়স কম হলেই কি মানুষ নবীন বা তরুণ হন? আবার বয়স বেশি হলেই প্রবীণ? এই ধারণা বন্ধুসভা ভেঙে দিয়েছে। আমাদের সমাজের দিকে তাকালে দেখতে পাই, অনেক তরুণ আছেন যাঁরা চিন্তাচেতনা ও ভাবনার জগতে এক অচলায়তনের বৃত্তে আটকে আছে। তাঁদের মধ্যে নেই তারুণ্যের উপস্থিতি। আবার বয়সে প্রবীণ হলেও অনেকে মন ও মননে ধরে রেখেছেন তারুণ্য। আর তারুণ্য যাঁরা সত্যিকার অর্থে ধরে রাখতে পারেন, তাঁরাই প্রকৃত তরুণ। সেই তরুণদের সংগঠন বন্ধুসভা।
বন্ধুসভার পার্থক্য যেমন নামে, তেমনি কাজে। অন্যের বিপদে যে এগিয়ে আসে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু। এ রকম বন্ধু হতে হলে মন ও মননে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। কবি বলেছেন, ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’। মানুষ একা বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঁচতে পারে না। বন্য জন্তুর আক্রমণ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে, খাদ্যের সংস্থান করতে, বিরূপ প্রকৃতিকে মোকাবিলা করতে গিয়ে মানুষ ক্রমে ক্রমে যূথবদ্ধ হয়েছে। ধীরে ধীরে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, দেশ প্রভৃতি ধারণাও এসেছে। আদিতে পারস্পরিক সাহায্য, সহযোগিতা ও সহমর্মিতার যে বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে, তার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।
বন্ধুসভা এই চেতনাকে ধারণ ও লালন করে। নিজেকে উন্নততর মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই তরুণসমাজের কর্তব্য। তাহলেই মেধা, শ্রম, শিক্ষা ও রুচি দিয়ে দেশ, মানুষ ও বিশ্বমানবতার কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করা সম্ভব হবে। বন্ধুসভায় বন্ধুরা সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও জ্ঞান- বিজ্ঞানের চর্চা এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে অংশ নিয়ে দেশপ্রেম ও মানবকল্যাণের জন্য কাজ করার সুযোগ পান।
বন্ধুসভার পরিচিতি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিতি লাভ করেছে। বৃহত্তর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে সদস্যদের নৈতিকতা, সততা ও নিষ্ঠার কারণে মানুষের কাছে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে বন্ধুসভা। বন্যাদুর্গতদের হাতে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা থেকে শুরু করে রক্তদান পর্যন্ত—এমন কোনো সামাজিক ও মানবিক কাজ নেই বন্ধুসভার সদস্যরা যা করে থাকেন না। পাশাপাশি প্রথম আলোর আয়োজনে গণিত উৎসব, ভাষা প্রতিযোগিতা, বিতর্ক উৎসব, জিপিএ- ৫ শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদানের মতো বড় আয়োজনগুলোর পাশাপাশি প্রথম আলোর প্রতিটি কর্মকাণ্ড সুচারুভাবে সম্পন্ন হচ্ছে বন্ধুসভার অদম্য, নিষ্ঠাবান, উৎসাহী সদস্যদের সুনিপুণ কাজের মাধ্যমে। প্রতেক সদস্যের পরস্পরের প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা না থাকলে এ অসাধ্য সাধন হতো না।
বন্ধুসভার বন্ধুদের চাওয়া হচ্ছে— বন্ধু হয়ে সবার পাশে থাকা। দেওয়ার মতো কোনো সম্পদ যদি না-ও থাকে পাশের মানুষটা যেন অনুভব করে আমি সুখে-দুঃখে সব সময় তাঁর পাশে আছি। এটাই বন্ধুসভার বন্ধুদের হৃদয়ের বাণী। কবিতার সুরে বললে, ‘সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’।