ব্রাজিলের ভাষা পর্তুগিজ হলো কীভাবে

ব্রাজিলিয়ান ফুটবল-সমর্থকছবি: টুইটার থেকে

দক্ষিণ আমেরিকার মানচিত্রে চোখ রাখলে একটি বিষয় সহজেই নজরে পড়ে। প্রায় পুরো মহাদেশেই মানুষের মুখের ভাষা স্প্যানিশ, অথচ বিশাল আয়তনের ব্রাজিলের রাষ্ট্রভাষা ও প্রধান ভাষা পর্তুগিজ। প্রশ্ন জাগে, দক্ষিণ আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে ব্রাজিল কেন ভাষাগতভাবে ব্যতিক্রম? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পাঁচ শতাব্দীর বেশি পুরোনো ইতিহাসে। যেখানে রয়েছে একজন পোপ, দুটি সামুদ্রিক পরাশক্তি, একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং একটি অনাবিষ্কৃত মহাদেশকে ভাগ করে নেওয়ার অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত।

১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয়দের কাছে ‘নতুন বিশ্ব’ উন্মোচন করার পর স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যে নতুন ভূখণ্ড দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয়। সংঘাত এড়াতে স্পেনের অনুরোধে পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের মধ্যস্থতায় ১৪৯৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক টরডেসিলাস চুক্তি (Treaty of Tordesillas)। এ চুক্তির মাধ্যমে আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর একটি কাল্পনিক সীমারেখা টেনে দেওয়া হয়। রেখার পশ্চিমের নতুন আবিষ্কৃত অঞ্চল স্পেনের এবং পূর্বের অঞ্চল পর্তুগালের অধীনে থাকবে, এমন সিদ্ধান্তই ভবিষ্যতের দক্ষিণ আমেরিকার ভাষাগত মানচিত্র নির্ধারণ করে দেয়।

প্রথমে পর্তুগালের ভাগে খুব বেশি ভূমি পড়েনি। পরে আলোচনার মাধ্যমে সীমারেখা কিছুটা পশ্চিমে সরানো হয়। এর ফলেই ১৫০০ সালে নাবিক পেদ্রো আলভারেস ক্যাব্রাল বর্তমান ব্রাজিল উপকূলে পৌঁছালে পর্তুগাল বৈধভাবে সেই ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। যদি সীমারেখা পরিবর্তিত না হতো, তাহলে আজকের ব্রাজিলও হয়তো স্প্যানিশভাষী দেশগুলোর কাতারে থাকত।

প্রথম দিকে পর্তুগালের আগ্রহ খুব বেশি ছিল না। কিন্তু ষোড়শ শতাব্দীতে ব্রাজিলউড (পাউ-ব্রাজিল) নামের মূল্যবান লাল রং উৎপাদনকারী কাঠের সন্ধান মেলার পর অঞ্চলটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এ কাঠ থেকেই ‘ব্রাজিল’ নামটির উৎপত্তি। এরপর শুরু হয় স্থায়ী বসতি স্থাপন, কৃষিকাজ, বিশেষ করে আখের চাষ এবং ধীরে ধীরে পর্তুগিজ প্রশাসন ও সংস্কৃতির বিস্তার।

ব্রাজিলের ইতিহাস অবশ্য একেবারেই নিরবচ্ছিন্ন ছিল না। ১৫৫৫ সালে ফরাসিরা রিও ডি জেনিরো অঞ্চলে উপনিবেশ গড়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কয়েক বছরের সংঘর্ষের পর ১৫৬০-এর দশকে পর্তুগিজরা অঞ্চলটি পুনর্দখল করে। পরবর্তী সময়ে তারা দেশের অভ্যন্তরে আরও বিস্তৃত অঞ্চল অন্বেষণ ও দখল করে, যা পরবর্তীকালে আধুনিক ব্রাজিলের বিশাল ভৌগোলিক সীমানা গঠনে ভূমিকা রাখে।

লিসবনের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত জোসে রেবেলোর সংগ্রহ থেকে টরডেসিলাস চুক্তির মূল পাণ্ডুলিপির একটি পৃষ্ঠা
ছবি: সংগৃহীত

পর্তুগিজ উপনিবেশ হিসেবে ব্রাজিলে প্রায় তিন শতাব্দী ধরে প্রশাসন, শিক্ষা, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ও বাণিজ্যের ভাষা ছিল পর্তুগিজ। ইউরোপীয় বসতি স্থাপনকারীদের পাশাপাশি আফ্রিকা থেকে আনা দাস ও স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে দীর্ঘ মিথস্ক্রিয়ার ফলে আজকের ব্রাজিলীয় পর্তুগিজ গড়ে ওঠে। এটি পর্তুগালের পর্তুগিজ ভাষার সঙ্গে একই শিকড়ের হলেও উচ্চারণ, শব্দভান্ডার ও কিছু ব্যাকরণগত ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। অনেকটা যেমন ব্রিটিশ ইংরেজি ও আমেরিকান ইংরেজির মধ্যে দেখা যায়।

১৮২২ সালে ব্রাজিল পর্তুগালের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও ভাষাগত উত্তরাধিকার অটুট থাকে। স্বাধীনতার পরও পর্তুগিজই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্তুগিজভাষী মানুষের বাস ব্রাজিলে; অর্থাৎ পর্তুগালের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ আজ ব্রাজিলে পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে।

আরও পড়ুন

এ কারণেই লাতিন আমেরিকার মানচিত্রে ব্রাজিল একটি অনন্য ব্যতিক্রম। মেক্সিকো থেকে শুরু করে আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু, কলম্বিয়া কিংবা উরুগুয়ে—অধিকাংশ দেশের সরকারি ভাষা স্প্যানিশ, কারণ সেগুলো ছিল স্পেনের উপনিবেশ। অন্যদিকে ব্রাজিল ছিল পর্তুগালের উপনিবেশ, তাই সেখানকার মানুষের ভাষা হয়ে ওঠে পর্তুগিজ।

একটি সীমারেখা, একটি কূটনৈতিক চুক্তি এবং কয়েক শতাব্দীর উপনিবেশিক ইতিহাস—এই তিন বিষয়ই আজকের ব্রাজিলের ভাষাগত পরিচয় নির্ধারণ করেছে। ইতিহাসের সে সিদ্ধান্ত শুধু একটি দেশের সীমানাই নির্ধারণ করেনি; নির্ধারণ করেছে কোটি কোটি মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি এবং জাতীয় পরিচয়ও। তাই ব্রাজিলের মানুষ যে পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে, এটি কেবল ভাষার ইতিহাস নয়, বরং বিশ্বরাজনীতি, উপনিবেশবাদ ও ইতিহাসের এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জীবন্ত সাক্ষ্য।

তরুণ লেখক, কুড়িগ্রাম