মাকে আর জামা কিনে দেওয়া হলো না
আমার মা জাহানারা খানম ঝর্না। ২০০৪ সালের ১৩ এপ্রিল তাঁর গর্ভ আলোকিত করে আমার জন্ম। ডেলিভারির সময় জটিলতায় আমার ডান হাত ভেঙে যায়। কথা বলতে না-পারা সেই নবজাতক শুধু কান্না করছিল। তবে মা বুঝতে পেরেছিল, তাঁর ছেলের কোথাও ব্যথা হচ্ছে। পরে আমাকে চিকিৎসার জন্য গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সন্তানকে নিয়ে গভীর চিন্তায় মা ছুটে যান ঢাকায়। প্রতিবেশীরা বলেছিলেন, ‘এই ছেলে যদি বাঁচে, তাহলে ধানের চিটায় ধানের চারা গজাবে!’ সেই মা আদরযত্নে আমাকে সুস্থ করে তুললেন।
ছোটবেলা থেকেই পড়ালেখায় খুব ভালো ছিলাম না। ঝুলিতে কোনো জিপিএ-৫ ছিল না। তবে মায়ের স্বপ্ন ছিল, তাঁর ছেলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। গোপালগঞ্জের রাস্তা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস গেলে মা স্বপ্ন দেখতেন, একদিন তাঁর ছেলেও এই বাসে চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে।
মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থাকলেও মায়ের স্বপ্নের জন্য নিজের জেলার বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেছে নিই। চান্স পাওয়ার দিন মা আমাকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদেছিলেন।
মায়ের আরেকটি ইচ্ছা ছিল, একদিন তাঁর ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়টা ঘুরে দেখবেন। কিন্তু সেই সুযোগ আর হয়নি। তাই আজ জার্সির পেছনে মায়ের নাম ‘ঝর্না’ লিখে রাখি। মনে হয়, মা আমার সঙ্গে আছেন; তাঁকে নিয়েই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ঘুরি।
নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ছোট্ট চেষ্টা হিসেবে টিউশনি শুরু করি। প্রথম উপার্জনের টাকা মায়ের হাতে দিই। মা টাকা হাতে নিয়ে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ।’ তারপর ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুই খরচ কর।’
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা। টিউশনির বেতন দিয়ে ভেবেছিলাম মায়ের জন্য এক সেট বাসায় পরার জামা কিনব। কিন্তু অক্টোবরের ১ তারিখে ফুফা অসুস্থ থাকায় ঢাকায় যেতে হয়। ৬ অক্টোবর রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি, মা রাত ১১টা-১২টা পর্যন্ত না খেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। সেদিন একসঙ্গে ভাত খাই।
কে জানত, সেটাই হবে মায়ের সঙ্গে আমার শেষ রাতের খাবার।
পরদিন ভোরে মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেপ্টেম্বরের সেই বেতনের টাকা দিয়ে মাকে আর জামা কিনে দিতে পারিনি। সেই টাকাতেই মায়ের কাফনের কাপড় কিনে দিয়েছিলাম।
জীবনের শুরুতে যে মা আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মাকেই হারিয়ে ফেলি।
মাকে অনেক কিছু দেওয়ার স্বপ্ন ছিল, অনেক কিছু বলা হয়নি। আজ শুধু তাঁর স্বপ্নগুলোকে নিজের জীবনের পথ করে এগিয়ে যেতে চাই।
আল্লাহ, আমার মাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।
বন্ধু, গোবিপ্রবি বন্ধুসভা