লোকসংস্কৃতির সুরে কেন বলা হয় নির্বাচনের কথা
বাংলাদেশে নির্বাচন মানে শুধু ভোট দেওয়া নয়, একধরনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উৎসব। মানুষের ভাষা, গান, গল্প, মেলা, মাইকিং—সব মিলিয়ে এটা সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়। এই পুরো আয়োজনের ভেতরে লোকসংস্কৃতি খুব স্বাভাবিকভাবেই জায়গা করে নেয়।
বাংলাদেশ যে মাটি ও সুরের দেশ, তা যেকোনো বড় আয়োজনে শতভাগ প্রমাণ পাওয়া যায়। দেশজুড়ে চলছে নির্বাচনী প্রচারণা। এই প্রচারণায় লোকসংস্কৃতি জড়িয়ে আছে বহুমাত্রিকভাবে। স্থানীয় কিংবা জাতীয় নির্বাচন, লোকসংস্কৃতির প্রভাব খুব গভীর। কারণ, ভোট শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, এটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাও। মানুষ ভোট দেয় যুক্তি দিয়ে, আবার আবেগ, পরিচয় আর ঐতিহ্য দিয়েও। লোকসংস্কৃতি সেই আবেগের জায়গাটাকেই ছুঁয়ে যায়। তাই লোকসংস্কৃতি নির্বাচনী প্রচারণার এক শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে বহুকাল আগে থেকেই।
প্রার্থীরা নিজেদের কথা লোকভাষায়, লোকসুরে বলতে চান। কারণ, সেটাই মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভাষা।
সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ গোপাল হালদার হাজার বছরের প্রবহমান বঙ্গ সংস্কৃতিকে ‘পল্লীপ্রধান বাঙালি সংস্কৃতি’ বলে অভিহিত করেছিলেন। এই কথার ভেতরেই একটা বড় সত্য আছে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক শিকড় গ্রামমুখী, আর নির্বাচনও শেষ পর্যন্ত সেই গ্রামীণ ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে থাকে। লোকসংস্কৃতি মানুষের পরিচয়ের ভাষা। গ্রামবাংলার গান, পালা, যাত্রা, কবিগান, মেলা এসবের মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা খুব সহজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই যখন কোনো প্রার্থী লোকগান বা নাটকের মাধ্যমে নিজের কথা বলে, সেটা সাধারণ ভাষণের চেয়ে বেশি মনে থাকে। কারণ, মানুষ সেটা নিজের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে নেয়। তখন সেই সংস্কৃতি মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে একজন থেকে অন্যজনে।
সাহিত্য গবেষক ওয়াকিল আহমদের মতে, বাংলা সংস্কৃতিকে নগরসংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি এবং আদিমসংস্কৃতি—এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। তবে লোকসংস্কৃতিই হচ্ছে বঙ্গসংস্কৃতির প্রধান ধারা। ফলে রাজনৈতিক প্রচারণা যখন লোকগান, পালা, যাত্রা বা পুঁথির ভাষা নেয়, তখন সেটা মানুষের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। লোকসংস্কৃতি সামাজিক সংহতি তৈরি করে। স্থানীয় নির্বাচনে দেখা যায়, উৎসব বা সাংস্কৃতিক আসর মানুষকে এক জায়গায় আনে। সেখানে প্রার্থীরা মানুষের সঙ্গে সরাসরি মেশার সুযোগ পায়। এই মেলামেশা বিশ্বাস তৈরি করে, যা ভোটের সময়ে বড় ভূমিকা রাখে। জাতীয় নির্বাচনেও একই বিষয় কাজ করে, শুধু পরিসরটা বড় হয়।
যেমন বিএনপির এবারের থিম সং ‘ভোট দিবেন কিসে ধানের শীষে’, যেখানে রক ফিউশনের সঙ্গে দেশাত্মবোধক ও লোকসুর মিলেছে এক ধারায়। নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের নাটক ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’র বহুল পরিচিত সংলাপ, ‘ভোট দিবা কিসে? ঘড়ি মার্কা বাক্সে’ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আজগর হোসেন রাব্বি গানটির কথা ও সুর করেছেন।
লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী লিখেছেন, ‘লোকসমাজের জীবনাচরণ ও ভূয়োদর্শনের প্রতিফলন আছে লোক-বিশ্বাস, লোক-সংস্কার আর লোকাচারে।’ নির্বাচনের সময় এই জীবনাচরণই সরাসরি কাজে লাগে। প্রার্থীরা নিজেদের কথা লোকভাষায়, লোকসুরে বলতে চান। কারণ, সেটাই মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভাষা। লোকসাহিত্যের একটা বড় অংশজুড়ে আছে পুঁথি। ৫০ থেকে ৬০ বছর আগেও বাংলার ঘরে ঘরে পুঁথি পাঠের চল ছিল। সেই পুঁথির বয়ানধারা এখন নতুনভাবে ফিরে এসেছে নির্বাচনী গান ও আগমনী প্রচারণায়। যেমন এনসিপির আগমনী গানে পুঁথির সুরে বলা হয়েছে—‘শুনছনি ভাই শুনছনি/শহর নগর গ্রাম গঞ্জে আইতাছে এনসিপি।’
তাদের হালখাতা গানটি শুনলেও একই লোকধারার প্রভাব লক্ষ করা যায়। এমনকি ভোট উৎসবের গানেও লোকসুরের ছাপ লক্ষ করা যায় পুরোপুরি।
শহরের অলিগলি থেকে গ্রামগঞ্জের হাট মাঠ ঘাট সর্বত্র এখন বাজছে ভোটের গান। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় জনপ্রিয় বাংলা লোকগানের সুরে নতুন কথা বসানো হয়েছে। যেমন ‘মরার কোকিলে’, ‘বুক চিন চিন করছে’, ‘টিকাটুলীর মোড়ে একটা হল রয়েছে’, ‘আম্মাজান’, ‘খাইরুন লো’, ‘রূপবানে নাচে কোমর দুলাইয়া’, ‘বিয়াইন সাব’, ‘দেওরা’, ‘নয়া দামান’, ‘লাগে উরাধুরা’, ‘ও বন্ধু লাল গোলাপী’সহ এমন বহু জনপ্রিয় গানের সুরে তৈরি হচ্ছে ভোটের গান। এই পরিচিত সুরের প্রতি আগ্রহের কারণও স্পষ্ট। পরিচিত এই লোকসুর দ্রুত মানুষের কানে লাগে, মনে থাকে। সংগীত বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নকল সুরের ভোটের গান ঘিরে এখন কোটি টাকার বাজার দাঁড়িয়েছে।
আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির ব্যবহার আরও তাৎপর্যপূর্ণ। উত্তরবঙ্গের গম্ভীরা, ময়মনসিংহ অঞ্চলের জারি গান, নদীবিধৌত এলাকার সারি গান, পালা গান, গ্রামীণ পালা নাটক বা পুঁথি এসব মাধ্যম সরাসরি মানুষের সঙ্গে কথা বলে। যেমন লালমনিরহাটের একটা নির্বাচনী গান শুনেছিলাম, যেখানে ভাওয়াইয়া সুরের প্রাধান্য লক্ষ করেছিলাম—
‘আয় জনগণ ভোট খেলায়, দুর্নীতি সব যাবে বালাই,
যোগ্য নেতা শামীম আছে বসি।
ছিলেন যখন চাকরিরত,
উন্নয়ন করেছেন কত
সেই কথাটা না যায় ভুলিয়া…’
খুলনা অঞ্চলে পটের গানে নির্বাচনী প্রচার আজকাল বিরল হলেও একসময় এই আয়োজন ছিল জনমুখী। এবারের ভোট উৎসবে সেই সুর কিঞ্চিৎ হলেও লক্ষ করা যায়। যেমন—
‘সতেরো বছর পরে আইলো আবার নির্বাচন
পাড়ায় পাড়ায় ঘরে ঘরে তাইতো খুশির আয়োজন
চাচা ভোট দিতে যাইয়ো, চাচিরে লগে লইয়ো!
মামা ভোট দিতে যাইয়ো, মামিরে লগে লইয়ো!!’
অন্যদিকে বাউলগানের সুরে ভোটের গান চলে পুরোদমে। যেমন গ্রামের নওজোয়ান গানের সুরে—
‘মানিকগঞ্জ জেলাতে ভাই রিতা আপার তুলনা নাই
সবাই মিলে চিন্তা করে দেখেন ভাবিয়া, এমন মানুষ আর পাবো না আমরা খুঁজিয়া।’
আঞ্চলিক ভাষাও এসব গানে মানুষের মনে জায়গা করে নেয়। গত নির্বাচনে দেখেছি যেমন
‘মা বইন খবর আসেনি, ও হাক্কু বুঝিত পাইজ্জোনি, বীর বাহাদুর নৌকার মাঝি সঙ্গে যাইবানি।’
আধুনিক ডিজিটাল প্রচারণাতেও লোকঐতিহ্যের প্রভাব কম নয়। দেশজ সুরের সঙ্গে রক বা আধুনিক অ্যারেঞ্জমেন্ট মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের নির্বাচনী গান। এতে একদিকে থাকে সাংস্কৃতিক স্মৃতি, অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের রুচি। ফলে গ্রাম আর শহরের মধ্যে একটা সেতু তৈরি হয়।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচনী সংস্কৃতি লোকসংস্কৃতিকে বাদ দিয়ে ভাবাই যায় না। পুঁথি থেকে মাইকিং, গম্ভীরা থেকে ডিজিটাল থিম সং সব জায়গায় একই ধারা প্রবহমান। নির্বাচন এখানে রাজনৈতিক আয়োজন যেমন, তেমনি সাংস্কৃতিক উৎসবও। আর সেই উৎসবের ভাষা শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজের লোকসংস্কৃতির ভাষা। এই ধারা চলছে এবং আগামীতেও চলবে।
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, ভৈরবী
একটি দেশীয় সংস্কৃতি গবেষণা এবং গীতরঙ্গ পরিবেশনাকেন্দ্র।