আমরা কেন হাসি

অসীম দুঃখের মধ্যেও একটা ফুরফুরে হাসি মনকে শান্ত করে তোলেছবি: এআই/বন্ধুসভা

পৃথিবীতে এমন একটি বিষয় রয়েছে, যা কারও কাছ থেকে শিখতে হয় না। এমনকি শিশুরা জন্মের পর ভাষা শেখার আগেও হাসতে পারে খুশিমনে। এই হাসির সঙ্গে সংস্কৃতি, ভাষা ও ধর্মীয় কোনো বাধা নেই। হাসি মানুষের আবেগ থেকে সৃষ্ট দৃষ্টিনন্দন প্রকৃতিগত উপাদান। আবার এই আনন্দভরা হাসি একক নয়, বরং সামাজিক। অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া আনন্দই হাসির মূল ভিত্তি। মনের ভালো লাগা থেকে, আনন্দ ও উৎফুল্লতায় এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

অসীম দুঃখের মধ্যেও একটা ফুরফুরে হাসি মনকে শান্ত করে তোলে, যেভাবে বর্ষাকালে অঝোরধারায় বৃষ্টির শেষে নতুন ভোরে সূর্য উদিত হওয়ার মতো প্রকৃতি সজীব হয়ে ওঠে। কখনো অস্থির হৃদয়ে স্থিরতা ফিরে এলে, এর অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে মুখে প্রশান্তিভরা হাসির মাধ্যমে। পৃথিবীর কোনো মানুষ কারও হাসির কারণ বুঝতে অক্ষম হলেও এটা উপলব্ধি করতে পারে যে মুখে হাসিওয়ালা মানুষটি বেশ আনন্দে রয়েছেন। হাসি একটা অমূল্য সম্পদ, যা হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে আসে। পৃথিবীর কোনো ধনী ব্যক্তি চাইলেও কারও কাছ থেকে মুখের হাসি কেড়ে নিতে পারবে না। সাংবিধানিক কঠোর আইনের মাধ্যমেও মনের আনন্দ বিলুপ্ত করা যায় না। মনের আনন্দ প্রকাশের একমাত্র মাধ্যমে হচ্ছে মুখের হাসি।

কেউ কেউ হাসির কারণে কারও পছন্দের ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে কিছু মানুষের হাসি হৃদয় থেকে নয়, শুধু মুখেই বিরাজমান থাকে। কেউ কেউ অন্তরে ঘৃণা, হিংসা কিংবা দুঃখ চেপে রেখে লোকের চোখে ইতিবাচক দেখানোর লক্ষ্যে অভিনয়ের হাসি হাসেন। সব মানুষের হাসির কারণ এক নয়। কেউ মনের আনন্দে হাসেন, আবার কেউ মনের মধ্যে সীমাহীন দুঃখ লুকিয়ে রেখে লোক দেখিয়ে হাসেন। মানুষের হাসি নিয়ে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের অনেক গবেষণা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী রবার্ট লেভিসন দম্পতিদের নিয়ে এক গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, যাঁরা টানাপোড়েনের সময় হাস্যরস ব্যবহার করেন, তাঁদের সম্পর্কে সন্তুষ্টি বেশি ও দীর্ঘায়িত হয়। হাসলে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন কমে যায়। একই সঙ্গে অ্যাড্রেনালিন ও অ্যান্ডোরফিন নিঃসৃত হয়। ফলে মন হালকা হয় এবং চাপ কমে। অ্যান্ডোরফিন নিঃসরণ করে শারীরিক ও মানসিক ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে। এ ছাড়া ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাসলে প্রায় ৪০ ক্যালরি পর্যন্ত খরচ হতে পারে।

আরও পড়ুন

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ সোফি স্কটের গবেষণা অনুযায়ী হাসির সময় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে অ্যান্ডোরফিন নামক রাসায়নিক পদার্থ নিঃসৃত হয়। এটি শরীরকে প্রশান্তি দেয় এবং ভালো অনুভূতি তৈরি করে থাকে। মুখের পেশি ও শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। সবাই জন্মগতভাবেই হাসার ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। এমনকি অন্ধ, বধির কিংবা প্রতিবন্ধিরাও আনন্দের সময় হাসার ক্ষমতা রাখেন।

জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভ সায়েন্সেস’-এর প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে মানুষ একা থাকার চেয়ে অন্যদের সঙ্গে থাকলে প্রায় ৩০ গুণ বেশি হাসতে পারে। আবার কখনো কখনো হাসি ইচ্ছাকৃত হয়। অনিচ্ছাকৃত স্বতঃস্ফূর্ত হাসিও হঠাৎ করেই বেরিয়ে আসে কারও কারও ক্ষেত্রে। তার মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তির কল্পনাশক্তির কারণে এমনটা হয়ে থাকে। আর হাস্যরসাত্মক ভিডিও দেখার পর প্রবীণদের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতি উন্নত হয়েছে বলে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে এপিডেমিওলজি জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলেছেন, অনেকে একা থাকেন এবং সামাজিক সম্পর্ক কম রাখেন; তাই তুলনামূলকভাবে কম হাসার কারণে তাঁদের হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হয়ে থাকে।

আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে অফিসে কাজের চাপ, রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে হাসতে ভুলে যাই। হাসি শুধু আনন্দের প্রকাশ নয়, এটি আমাদের শরীর ও মনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। পরিবার কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো সময়, ইতিবাচক পরিবেশে থাকা এবং জীবনের ছোট ছোট আনন্দ উপভোগ করা আমাদের আরও আনন্দিত করে এবং বেশি বেশি হাসতে সাহায্য করতে পারে। একটি সুন্দর হাসি সামাজিক বন্ধন তৈরি করে এবং মনকে প্রশান্ত রাখে। শুধু হাসি নয়, হাসিমুখও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে আশপাশের মানুষের মধ্যে। প্রাণখোলা হাসি সবার হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা