বন্ধুসভার বয়স বাড়ে না
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
স্কুল থেকে ফিরে কোনোরকমে খেয়েনেয়ে টাইট করে দুটো বেণি করে এক দৌড়ে খেলাঘর। আমি ছিলাম ‘কলকণ্ঠ’ খেলাঘর আসরে। শিশুদের সংগঠন। বড়দের ভাষায় ‘খেলাঘরে না গেলে তো ওদের ভাত হজম হয় না’—কথা সত্য। তবে গিয়ে যা যা পেয়েছি, তা-ই হয়তো জীবনের সম্পদ।
মনে আছে, আসাদগেট নিউ কলোনি থেকে এক দৌড়ে আমরা চলে গিয়েছিলাম ধানমন্ডি। উত্তেজনায় বড় ভাইদের ডাকে রিকশায় ওঠার সময় নেই। কারণ, তাঁরা আমাদের বলেছেন, আমরা আজ সরাসরি দেখতে পাব কাজী নজরুল ইসলামকে। ভাবা যায়?
খেলাঘরের কারণে কৈশোরেই কত গুণী মানুষকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান লেখক আবদুল্লাহ আল—মুতী শরফুদ্দীন, পটুয়া কামরুল হাসান, শিক্ষাবিদ দাবাড়ু কাজী মোতাহার হোসেন....।
মনে আছে, একবার খেলাঘর থেকে দাবা প্রতিযোগিতায় গেলাম আমরা। কাজী মোতাহার হোসেন প্রধান অতিথি। পুরো বক্তৃতায় তিনি এক বিস্ময়বালকের গুণগান করলেন। আমরা ভাবি, কে তিনি? পরে দেখি, সে-ও প্রতিযোগী হিসেবে পাশেই বসা। দাবাড়ু নিয়াজ মোরশেদ।
বন্যায় গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে গান গেয়ে টাকা, ওষুধ, শুকনা খাবার, কাপড় তোলা হয় পানিবন্দী মানুষের জন্য। কণ্ঠশিল্পী আব্দুল লতিফের নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারির জন্য ভাষার গান শেখা। দল বেঁধে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি দেখে ভয়ে শিউরে ওঠা—এ সবই জমে আছে স্মৃতির ভান্ডারে, মরিচা পড়েনি একটুও।
প্রথম আলোর বন্ধুসভার ছেলেমেয়েরা বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই কৈশোরে। নিঃস্বার্থভাবে ভালো কাজের সঙ্গে তারা যুক্ত হয়। দেশে বন্যা এলে দিনরাত জেগে খেয়ে- না খেয়ে তারা ত্রাণ পৌঁছে দেয় জেলায় জেলায়, বন্যার্ত মানুষের ঘরে ঘরে। এমনও ঘটনা ঘটেছে, সিডর কিংবা আইলার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্ধুসভার যে ছেলেটি দিনরাত খাটছে, সে বলেইনি তার পরিবার ত্রাণের অভাবে প্রায় অনাহারে।
প্রথম আলোর যেকোনো আয়োজনে তারা পাশে থাকে আপন হয়ে। দেশব্যাপী জিপিএ- ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনার সময় দেখা যায়, ওদের কাছাকাছি বয়সের হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে ওরা সামলাচ্ছে দায়িত্বের সঙ্গে। বৃক্ষরোপণ থেকে লেখাজোখার কর্মশালা— সারা বছর তারা যুক্ত থাকে এসব আয়োজনে। আবার এই বন্ধুরাই যখন জীবনদৌড়ে ভালো করে, তখন আমরা গর্বিত হই। আর বন্ধুরা যখন বলে, আমার এই ‘আমি’ হয়ে ওঠার পেছনে বন্ধুসভা আছে। বন্ধুসভাই আমাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে দিয়েছে। তখন ফিরে যাই নিজের কৈশোরে। তাই তো সেই যে খেলাঘর আমাদের লাঠিনৃত্য থেকে একুশে সংকলন প্রকাশ করা শেখাল, শেখাল মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে জীবনের অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করতে, পথ তো সেই একই।
বন্ধুসভা তারুণ্যে পরিপূর্ণ সম্মিলন। তারুণ্যের শক্তিই আলাদা। প্রথম আলোর অনেক জানালার একটা বড় খোলা জানালা এই বন্ধুসভা। বছর বছর নতুন নতুন ছেলেমেয়েরা যুক্ত হয়, নতুন নতুন আয়োজন হয়। ওরা যখন দল বেঁধে কোনো আয়োজনে প্রথম আলোর কার্যালয়ে আসে, তখন চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে। সংবাদপত্র অফিস নিমেষেই যেন ক্যাম্পাসে পরিণত হয়। মানে, আমাদের সবার বয়স বাড়ে, বন্ধুসভার বাড়ে না!