বন্ধুসভায় কীভাবে লিখবেন
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
বন্ধুসভা কেবল একটি পাঠক সংগঠন নয়, এটি তারুণ্যের ইতিবাচক শক্তিকে একত্র করার একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। বন্ধুরা বছরব্যাপী নানা সাংস্কৃতিক, সামাজিক, মানবিক ও আত্মোন্নয়নমূলক কাজ করেন। এই কর্মকাণ্ড দেশের উন্নয়নে যেমন অবদান রাখে, তেমনি বন্ধুদের দক্ষ ও যোগ্য হওয়ার পাশাপাশি সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতেও ভূমিকা রাখে। আর দেশ ও বহির্বিশ্বের বন্ধুসভার বন্ধুদের করা ভালো কাজ, উদ্যোগ, কর্মসূচি, আয়োজনের সংবাদ অনলাইন (বন্ধুসভা ডটকম) ও প্রথম আলোর ছাপা কাগজে ‘বন্ধুসভা পাতা’য় তুলে ধরা হয়। কার্যক্রম সংবাদের পাশাপাশি অনলাইন ও পাতা সাজানো হয় গল্প, কবিতা, ফিচার ইত্যাদি দিয়ে।
অনলাইন হোক কিংবা অফলাইন, মানুষের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম একটি মাধ্যম হলো লেখা। লেখার মাধ্যমে যেকোনো বিষয় দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়। তবে লেখা কেবল শব্দের সমষ্টি নয়, এটি চিন্তাকে যেমন ধারালো করে, তেমনি যুক্তিকেও শক্তিশালী করে। অনুভূতিকে গুছিয়ে নেয় এবং জ্ঞানকে বিনিময়যোগ্য করে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বন্ধুদের লেখালেখিতে উৎসাহিত করতে বন্ধুসভা ডটকম (অনলাইন) ও ছাপা কাগজের পাশাপাশি বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ প্রতিবছর লেখালেখিবিষয়ক বিভিন্ন কর্মশালা ও লেখক বন্ধু উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এ ছাড়া বন্ধুসভার একটি বার্ষিক প্রকাশনাও রয়েছে। বন্ধুসভার প্রত্যাশা, বন্ধুদের মধ্য থেকে নতুন লেখক তৈরি হবে। তাঁরা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে যেমন ভূমিকা রাখবেন, তেমনি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা দিয়ে মাতৃভূমিকেও আলোকিত করবেন।
লেখালেখি কর্মশালা
বন্ধুদের লেখালেখির যাত্রাকে সহজ করতে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ প্রতিবছর কর্মশালার আয়োজন করে থাকে। ২০২৫ সালে ‘ফিচার’, ‘কবিতা', 'গল্প' ও 'সংবাদ'—এই চার বিষয়ের ওপর চার পর্বে প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশের স্থানীয় বন্ধুসভাগুলোও নিজেদের উদ্যোগে লেখালেখির ওপর কর্মশালার আয়োজন করছে। যেখানে প্রশিক্ষক হিসেবে থাকছেন কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিকসহ সাহিত্যের গুণীজনেরা।
লেখক বন্ধু উৎসব
বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের নতুন উদ্যোগ ‘লেখক বন্ধু উৎসব'। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম আসর। দুই বছর পর ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আসর। যেখানে নিবন্ধনের মাধ্যমে সারা দেশের নির্বাচিত লেখক বন্ধুরা অংশ নেন। দিনব্যাপী এই উৎসবে কবিতা : ভাব, ছন্দ ও ভাষাপ্রয়োগ; গল্প লেখা, গল্প বলা, গল্পের কলাকৌশল; পত্রিকার জন্য লেখালেখি : ধরন, শব্দসীমা ও যোগাযোগ; লেখক হতে হলে তরুণদের করণীয়সহ সাহিত্যের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন দেশসেরা কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকেরা। এ ছাড়া থাকে লেখক-প্রকাশক আলাপচারিতা। যেখানে ‘লেখা প্রকাশে করণীয় : গুণমান, ভাষারীতি, শব্দ ও পাতাবিন্যাস, প্রকাশনা কৌশল' ইত্যাদি বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনায় লেখক বন্ধুরা অংশ নেন।
লেখক বন্ধু পুরস্কার
উৎসবের মূল আকর্ষণ 'লেখক বন্ধু পুরস্কার'। বন্ধুসভার ওয়েবসাইটে বন্ধুসভার যে সদস্যরা নিয়মিত লেখালেখি করেন তাঁদের মধ্য থেকে এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়। এর উদ্দেশ্য—বন্ধুসভার বন্ধুদের নিয়মিত লেখালেখিতে উৎসাহ দেওয়া, তাঁদের সৃজনশীলতা ও লেখা প্রকাশের মনোভাবকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তরুণ লেখকদের মধ্যে পাঠচর্চা ও সাহিত্যিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা। যাঁরা পুরস্কার পান, তাঁরা যাতে লেখক হওয়ার জন্য অধ্যবসায় চালিয়ে যান এবং অন্যরা যাতে তাঁদের দেখে লেখালেখি চর্চা অব্যাহত রাখার অনুপ্রেরণা পান।
বার্ষিক প্রকাশনা
বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদ কর্তৃক প্রকাশিত নিয়মিত প্রকাশনা তারুণ্য। প্রতিবছর একটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। সাধারণত জাতীয় পর্যদসহ সারা দেশের বন্ধুসভার বন্ধুদের নির্বাচিত লেখা তারুণ্যে প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি বন্ধুদের অনুপ্রাণিত করতে দেশবরেণ্য কবি, লেখক ও সাহিত্যিকেরাও তারুণ্যে লিখে থাকেন।
বন্ধুসভা ডটকম ও ছাপা কাগজ
বন্ধুসভার অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বন্ধুসভা ডটকম (https://www.bondhushava. com/)। তবে ওয়েবসাইটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, বন্ধুরা এখানে যেমন বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত লিখতে পারেন, তেমনি প্রকাশিত লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ারও সুযোগ পান। পাশাপাশি প্রথম আলোর ছাপা কাগজে ‘বন্ধুসভা পাতা' রয়েছে। মাসে দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। যেখানে বন্ধুসভার সংবাদের পাশাপাশি বন্ধুদের লেখা গল্প- কবিতাও স্থান পাচ্ছে।
কোন ধরনের লেখা প্রকাশে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়
বন্ধুসভার ওয়েবসাইটে মূলত এমন সব লেখা প্রকাশের প্রাধান্য থাকে, যা ইতিবাচকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং তারুণ্যবান্ধব ভাবনা প্রকাশ করে। যেমন—
১. মানবিক গল্প: দেশ-বিদেশের নানা প্রান্তের মানুষের জীবনের গল্প, সংগ্রাম, সাফল্য, সহমর্মিতা—যেকোনো মানবিক অভিজ্ঞতা।
২. স্বেচ্ছাসেবা ও বন্ধুসভার কার্যক্রম : বন্ধুসভার জাতীয় পর্ষদ, ঢাকা মহানগর, জেলা, উপজেলা ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়- কলেজ শাখার কাজ, আয়োজন, সেবা, সামাজিক উদ্যোগ – এ-সংক্রান্ত সব কার্যক্রমের সংবাদ।
৩. সামাজিক সচেতনতা : মানসিক স্বাস্থ্য, নারী ও শিশু অধিকার, পরিবেশ, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপত্তা, শিক্ষা—যেকোনো সামাজিক বিষয়ে যুক্তিপূর্ণ ও সচেতনতামূলক লেখা।
৪. ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণা : নিজের দেখা, শেখা বা অনুভব— যা অন্যকে অনুপ্রেরণা দেয়, এমন যেকোনো লেখা।
৫. বই ও সিনেমা রিভিউ : যেকোনো ইতিবাচক ও জ্ঞানবর্ধক রিভিউ প্রকাশ করা হয়।
৬. সৃজনশীল লেখা : লেখার মধ্যে যদি থাকে মানবিক বার্তা বা ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি—ছোটগল্প, কবিতা, মুক্তগদ্য, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার—সবই গ্রহণযোগ্য।
৭. খেলাধুলা: ক্রিকেট, ফুটবল, টেনিসসহ দেশ-বিদেশের যেকোনো খেলা, খেলোয়াড় নিয়ে ফিচার।
৮. ক্যারিয়ার : দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা, চাকরি, চাকরির পরামর্শ, নেতৃত্ব, যোগাযোগ, পারসোনাল ব্র্যান্ডিংসহ ক্যারিয়ারসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে সৃজনশীল ও তথ্যসমৃদ্ধ লেখা।
৯. ফটোফিচার: বন্ধুসভার যেকোনো ইভেন্টের ছবি কিংবা আপনি কোথাও ঘুরতে গেলেন সেই ভ্রমণের ছবি অথবা যেকোনো বিষয়ের অর্থবহ একাধিক ছবি ক্যাপশনসহ লিখে পাঠাতে পারেন। ফটোফিচার আকারে প্রকাশ করা হয়।
কোন ধরনের লেখা গ্রহণ করা হয় না
নারীবিদ্বেষ, রাজনীতি, ধর্মীয় বিভাজন বা নেতিবাচকতা ছড়ায়—এমন লেখা; কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে আক্রমণাত্মক ভাষায় উপস্থাপন করে—এমন লেখা; . অপতথ্য বা গুজব; অশ্লীল, অপরিণত বা বৈষম্যমূলক লেখা।
কীভাবে লেখা পাঠাতে হবে
বন্ধুরা প্রায়ই জানতে চান, লেখাটা কোথায় পাঠাব? লেখা পাঠানোর সঠিক পদ্ধতি–
লেখাটি ওয়ার্ড ফাইলে লিখুন। ফাইলের নাম দিন (লেখার বিষয়)। ফাইলটি ই-মেইলে সংযুক্ত করুন। চাইলে পুরো লেখাটি ই-মেইলের বডিতে লিখেও পাঠাতে পারেন। নিজের নাম, পরিচয় ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। বন্ধুসভার নাম, বন্ধুসভার পদবি, পদবি না থাকলে কেবল 'বন্ধু' উল্লেখ করুন।
বন্ধুসভার সদস্য না হলে নিজের বর্তমান ঠিকানা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করুন। বন্ধুসভার অফিশিয়াল ই-মেইলে লেখা পাঠাতে হবে : [email protected] ঠিকানায়।
নিউজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ইভেন্টের ভালো মানের ছবি দিতে হবে। অন্য লেখার ক্ষেত্রে লেখার সঙ্গে মানানসই নিজের তোলা ছবি পাঠাতে পারেন। অন্যের ছবি ব্যবহার করলে অবশ্যই ক্রেডিট উল্লেখ করতে হবে। ফটোগ্রাফারের নাম উল্লেখ করা ভালো।
ই-মেইলের সাবজেক্টে আপনার লেখার ক্যাটাগরি লিখুন—'নিউজ', 'কবিতা', 'গল্প', 'ফিচার', 'ভ্রমণ', ‘মুক্তগদ্য', 'সাক্ষাৎকার', 'খেলা', 'ক্যারিয়ার', 'মানসিক স্বাস্থ্য', 'বই আলোচনা', 'চলচ্চিত্র আলোচনা', 'ফটো ফিচার' ইত্যাদি।
লেখা সম্পাদনা
ওয়েবসাইটের মান বজায় রাখতে প্রয়োজনে লেখা সম্পাদনা করা হয়। তবে লেখার মূল ভাব অপরিবর্তিত থাকে। যেকোনো তথ্যের জন্য কখনো কখনো লেখকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়ে থাকে।
আমি বন্ধুসভার সদস্য নই। আমি কি বন্ধুসভায় লিখতে পারব?
অবশ্যই লিখতে পারবেন। বন্ধুসভার ওয়েবসাইট সবার—প্রত্যেক বন্ধুর ভাবনা, সৃজনশীলতা, মানবিকতা তুলে ধরার নিরাপদ ও ইতিবাচক ক্ষেত্র। আপনি লিখলে শুধু একটি লেখা তৈরি হয় না; তৈরি হয় একটি বার্তা, যা আমাদের সমাজকে আরেকটু ভালো করতে পারে। তাই লিখুন, লেখা পাঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করুন। আপনার লেখা কারও জীবনে হোক আলো।
টিপস
লেখালেখি একটি অভ্যাস। নিয়মিত চর্চা করলেই এগিয়ে যাবেন। তাই প্রতিদিন কিছু না কিছু লিখুন। অভ্যাসটাই গুরুত্বপূর্ণ। বেশি বেশি বই পড়ুন। ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়া কঠিন। নিজের চারপাশ থেকে গল্প খুঁজুন। বাসে, রাস্তায়, স্কুলে, পরিবারে—সব জায়গায় গল্প আছে। শুধু লক্ষ করতে হবে। সঙ্গে ডায়েরি বা নোটবুক রাখুন। অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ, চিন্তা— লিখে রাখলে লেখার শক্তি বাড়ে। ভুল করতে ভয় পাবেন না। লেখার সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভয়। ভুল শব্দ, ভুল বাক্য — সবই শেখার অংশ।