মাঝেমধ্যে কিছু স্বপ্ন শুধু নিজের থাকে না, বাবারও হয়ে যায়। এসএসসি পাসের পর যখন সায়েন্স নিয়ে পড়ার জেদ ধরলাম, মধ্যবিত্ত পরিবারের সামর্থ্যের টানাপোড়েনে কেউ সেটা চাইল না। ঘরের কোণে একা কেঁদেছি, মন খারাপ করেছি। তখন বাবা সবেমাত্র ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে দেশের বাইরে গেছেন। ওখান থেকেই ফোনে বাবা সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘আমার মেয়ে যেটা চায়, সেটাই পড়বে।’
কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস, করোনাকালীন লকডাউনে কলেজ বন্ধ হয়ে গেল। বিজ্ঞান নিয়ে পড়লেও ল্যাব ক্লাসে সেই কাঙ্ক্ষিত অ্যাপ্রনটা আর গায়ে জড়ানো হলো না। এইচএসসি শেষ হতেই বাবা বললেন, ‘মা রে, এবার মেডিকেল পরীক্ষাটা দাও, তোমাকে একটু অ্যাপ্রন পরা অবস্থায় দেখি।’ কিন্তু আমি মেডিক্যালে বসলাম না। বাবা দমে না গিয়ে বললেন, ‘তাহলে বিএসসি নার্সিং দাও।’ বাবার সেই আকুতিভরা অনুরোধটাও যখন ফিরিয়ে দিলাম, ওপাশ থেকে ওনার নীরব কষ্টটা আমি টের পেয়েছিলাম।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এইচই ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলাম। রেজাল্ট এল-সাবজেক্ট ‘ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সায়েন্স’। উচ্ছ্বাস নিয়ে বাবাকে ফোন করে বললাম, ‘বাবা! আপনার মেয়ে এবার অ্যাপ্রন পরতে পারবে।’ ওপাশে বাবা স্তব্ধ হয়ে রইলেন। কোনো কথা না বললেও বুঝতে পারছিলাম, তিনি মনে মনে তাঁর মেয়ের শ্বেতশুভ্র অ্যাপ্রন পরা রূপটাই কল্পনা করছেন।
কিছুদিন পর বাবা হঠাৎ বললেন, ‘আমি যখন দেশে ফিরব, তুমি এয়ারপোর্টে আমাকে রিসিভ করতে এসো। তবে অবশ্যই অ্যাপ্রন পরে আসবে। আমি তোমাকে ওভাবেই প্রথম দেখতে চাই।’
বাবার সেই ইচ্ছেপূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর অ্যাপ্রন পরে, গলায় একটা স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে ইমোতে বাবাকে ছবি পাঠালাম। শুনলাম, বাবা নাকি প্রবাসে সবাইকে সেই ছবি দেখিয়ে গর্ব করে বলেছেন, ‘এই যে দেখো, এটা আমার মেয়ে!’
অবশেষে এল সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন—২ নভেম্বর ২০২৪। সন্ধ্যা সাতটায় আমি তৈরি হয়ে এয়ারপোর্টের উদ্দেশে রওনা হলাম। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর বাবা-মেয়ের দেখা হবে, বাবার প্রিয় সেই অ্যাপ্রন পরতে একবিন্দু ভুল করিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাত তিনটায় বাবার ফ্লাইট পৌঁছাল। আমি অধীর আগ্রহে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। এয়ারপোর্টের চারপাশের মানুষ আমার দিকে অবাক হয়ে তাকাচ্ছিল—এত রাতে এয়ারপোর্টে অ্যাপ্রন পরে কোন পাগল এসেছে!
আমি সব কৌতূহলী চোখ উপেক্ষা করে শুধু সামনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। একটা সুন্দর, চকচকে বক্স। যার ওপরে লেখা—‘মরহুম শাহজাহান কবির’।
আমার বাবা!