অমন একটা ঘর আমার খুব দরকার

যেখানে একটা মাটির চুলো, একটা ডিঙিনৌকা আর মাটি–জল সব হবে আমার রাজত্বছবি: লেখকের সৌজন্যে

অমন একটা ঘর খুব দরকার। যখন সবাই আমাকে ব্যর্থ বলবে, বলবে তুমি রঙিন জীবনের দাসত্ব করবে। ঘড়িতে সময় দেখতে হবে না, একটু পর আমার জীবন শুরু হচ্ছে কি না। পথে পথে হাঁটতে মনে হবে না, কোনো দায়িত্বের পিছুটান ছুটে যাবে কি না। অমন একটা ঘর আমার খুব দরকার।

অমন একটা ঘর, যেখানে একটা মাটির চুলো, একটা ডিঙিনৌকা আর মাটি–জল সব হবে আমার রাজত্ব। আমি রাজা আর একটা ময়না পাখি—আমার মন্ত্রী মশাই। অমন একটা ঘর খুব দরকার।

সামনের সপ্তাহে হাটে গিয়ে একখানা ময়না কিনে আনব। বটের ছায়ায় বসে যখন এই বুকে শীতল বাতাস ছুঁয়ে যাবে গোধূলিবেলায়। কি অপরূপ এই সৌন্দর্য, কি মায়া প্রকৃতির। আমি ডাক দিয়ে বলব, পাখি! আমায় একটু গান শুনাবি?
গাছের ঢালে বসে পাখি গানের সুর তুলবে, অকূল দরিয়ায় বুঝি কূল নাই রে!!!

কি অপরূপ এই সৌন্দর্য, কি মায়া প্রকৃতির।

আমার অমন একখান ঘর খুব দরকার। সন্ধে হলে এক কাপ চা আমার চাই তো চাই। গত সপ্তাহে বাজার থেকে চা আয়োজনের সব বন্দোবস্ত করে নিয়ে এসেছি। এক কাপ চা ঝটপট বানিয়ে একটা কুপি জ্বালিয়ে আমার প্রাসাদের উঠানে পাটি বিছিয়ে বসব। নিজের হাতে বানানো চায়ের স্বাদই আলাদা। চায়ে চুমুক দিতেই মনে পড়বে শেষবার প্রাসাদে আসার সময় ট্রাঙ্কে করে কটা বই এনে ছিলাম। ট্রাঙ্ক খুলতেই ‘আরণ্যক’ খুঁজে পাব। চা খেতে খেতে পড়া শুরু করব।

এক পাতা–দুপাতা করে কখন যে বইয়ের পুরোটা শেষ করে ফেলব খেয়ালই থাকবে না। হঠাৎ কুপিতে কেরোসিনের সংকটে আলো কমায় চোখ পড়বে। বিভূতিভূষণ সাহেব বলবে, ‘মানুষ কী চায়—উন্নতি না আনন্দ?’

অরণ্যের এমন বর্ণনা খুব কম বইয়ের পাতা উল্টোলেই পাওয়া যায়। জীবনের স্মৃতি-অভিজ্ঞতাগুলোর এমন সৌন্দর্য মাধুর্য সত্যিই চমৎকার। উন্নতির আফসোস অসহায়ের দিকে একটু তাকালেই হয়ত কমে যেত। বেঁচে থাকার এমন পথের অভিজ্ঞতা কজন পেয়েছে?

জীবনের কোনো একটা অংশে প্রকৃতির কাছে ফেরা উচিত।

অমন একটা ঘর খুব দরকার। যেখানে আরণ্যক আমাকে আরও দারুণভাবে অনুভব করতে শেখাবে অরণ্যকে। জীবনের কোনো একটা অংশে প্রকৃতির কাছে ফেরা উচিত। সাধারণ জীবন আর বেঁচে থাকার লড়াই শেখার জন্য হলেও আমাদের ভরা যৌবনে মাটির কাছে ফেরা উচিত। হয়তো কোদাল দিয়ে মাটি কাটতে গিয়ে জীবনে সব থেকে কঠিন সিদ্ধান্ত সহজ মনে হবে, অথবা কাঠফাটা রোদে হাওরের মাঝে সারা দিন জাল ফেলে একখানা মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরা আমাদেরকে ধৈর্য, চাওয়া পাওয়ার সীমাবদ্ধতায় বাস্তবতা মেনে খুশিতে বেঁচে থাকার শিক্ষা দেবে।

গরম ভাত আর ওই একখানা মাছ ভাজা দিয়ে রাতে বেশ খাওয়া হবে আমার। আমার ঘরটায় চার দিকেই জানালা থাকবে। সবগুলো জানালা খুলে শীতল পাটিতে শুয়ে শান্তির ঘুম দিব।

আমি স্বপ্ন দেখছি!!! অমন একটা ঘর আমার খুব দরকার।

সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বন্ধুসভা