তরুণ হিসেবে আমাদের দায় কোথায়
আজ যে ভিড় কাউকে মারছে, কাল সেই একই ভিড় ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যে কাউকে টার্গেট করতে পারে। এতে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনা আমাদের সমাজে ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণের আগেই একদল মানুষ কাউকে ঘিরে ধরে শাস্তি দিচ্ছেন—এ দৃশ্য এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়। একজন তরুণ হিসেবে এসব ঘটনা আমাদের শুধু আতঙ্কিতই করে না, গভীরভাবে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে—আমরা কি ধীরে ধীরে আইনের শাসনের জায়গা থেকে সরে যাচ্ছি?
তরুণেরা বুঝি, সহিংসতার পেছনে ক্ষোভ আছে। বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা, ন্যায়বিচার পেতে দেরি হওয়া এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দায়মুক্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। সেই অসন্তোষ থেকেই অনেক সময় মানুষ নিজেরাই বিচার করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কখনোই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না, এ কথা আমরা অস্বীকার করতে পারি না।
মব ভায়োলেন্সের সঙ্গে আমাদের প্রজন্মের আরেকটি বাস্তবতা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। গুজব, অর্ধসত্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি পোস্ট, একটি ভিডিও বা একটি মন্তব্য মুহূর্তেই উত্তেজনা তৈরি করে। আমরা অনেক সময় না ভেবেই তা শেয়ার করি। অথচ সেই শেয়ারের ফল হতে পারে একটি মানুষের জীবননাশ। এই দায় থেকে তরুণ সমাজ কোনোভাবেই মুক্ত নয়।
গণপিটুনির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো—এটি সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তোলে। মানুষ ভুলে যায়, সন্দেহ মানেই অপরাধ নয়। আজ যে ভিড় কাউকে মারছে, কাল সেই একই ভিড় ভুল তথ্যের ভিত্তিতে যে কাউকে টার্গেট করতে পারে। এতে সমাজে নিরাপত্তাহীনতা বাড়ে, পারস্পরিক বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।
তবে এই অন্ধকার বাস্তবতার মধ্যেও আশার জায়গা আছে। অনেক তরুণ এখন প্রকাশ্যে মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন—অপরাধীর বিচার চাই, কিন্তু তা হোক আইনসম্মত প্রক্রিয়ায়। তরুণদের এই সচেতন কণ্ঠই প্রমাণ করে, সমাজ এখনো পুরোপুরি দিশাহীন নয়।
আজ তরুণ সমাজের সামনে বড় একটি দায়িত্ব রয়েছে। শুধু ঘটনার নিন্দা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। গুজব যাচাই করা, সহিংসতায় উসকানি না দেওয়া, ভিড়ের অংশ না হয়ে প্রতিবাদ করার সাহস দেখানো—এগুলোই এখন নাগরিক দায়িত্ব।
একজন তরুণ হিসেবে বিশ্বাস করি, মব ভায়োলেন্স বন্ধ করতে হলে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচার মানে মানবিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। সহিংসতার এই সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য।
বন্ধু, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বন্ধুসভা