কক্সবাজারে ঘুরতে এলে আমরা শুধু সমুদ্রের মোহে বিমোহিত হয়ে পড়ি। কিন্তু সাগরের শীতল হাওয়া উপভোগের বাইরেও আরও অনেক লুকায়িত সৌন্দর্য রয়েছে, যা আমাদের অনেকেরই দেখার সৌভাগ্য তেমন হয়ে ওঠে না। তেমনি কিছু জায়গার সঙ্গে আপনাদের আজ পরিচয় করিয়ে দেব।
১. খান বিচ, ইসলামপুর
কক্সবাজারে এসেছেন কিন্তু খান বিচ যাননি, তাহলে মিঠামইনের ছোট একটা ভ্রমণের স্বাদ মিস করে গেলেন। খান বিচ ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য সৌন্দর্যের ঠিকানা। এখানে ঘুরে দেখার সময় সড়কের দুই পাশে সারি সারি দৃষ্টিনন্দন চিংড়িঘের, যার পানিতে ছোট ছোট ঢেউ আর ভেসে চলা ডিঙিনৌকা মনকে প্রশান্ত করে তোলে। চারপাশের মনোরম পরিবেশ সহজেই ভালো লাগার আবেশ তৈরি করে।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আগমুহূর্তে জায়গাটি লোকজনে মুখর হয়ে ওঠে। যদিও নির্দিষ্ট বসার কোনো ব্যবস্থা নেই, তবু ঘেরের তীরই দর্শনার্থীদের জন্য হয়ে ওঠে প্রাকৃতিক বসার স্থান। সড়ক ধরে হেঁটে হেঁটে ভ্রমণপিপাসুরা উপভোগ করেন এই অপরূপ দৃশ্য।
শীতল বাতাস, পানির মৃদু কলকল ধ্বনি আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মিলিয়ে এখানে কাটানো সময় সত্যিই মনকে জুড়িয়ে দেয়।
কক্সবাজার থেকে খুরুশকুল রাস্তার মাথা ধরে গেলে দেখা যাবে বায়ুবিদ্যুত প্রকল্প একেবারে ঠিক যেন মাথার ওপর দিয়ে শোঁ শোঁ করে ঘুরছে।
২. দক্ষিণ হাজিপাড়া
ঘুরে বেড়ানোর জন্য জায়গাটি সত্যিই দারুণ। বিশেষ করে যাঁরা হালকা ট্রেকিং পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটি একদম উপযুক্ত। এখানে এসে মনে হবে যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে গেছেন।
কক্সবাজারের নতুন আকর্ষণ হিসেবে দৃষ্টিনন্দন এই পাহাড়টি ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পথজুড়ে সবুজে ঘেরা পরিবেশ, দুই পাশে সারি সারি ঘাস ও গাছপালা—সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা।
পাহাড়ে উঠে দাঁড়ালে চোখের সামনে ভেসে ওঠে অপরূপ দৃশ্য। আর দিনের শেষে সূর্যাস্তের সেই মায়াবী মুহূর্ত মনকে ছুঁয়ে যায় এবং ভ্রমণটিকে করে তোলে আরও স্মরণীয়। যেতে হবে শহরের বাস টার্মিনাল থেকে হাজিপাড়া পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত।
৩. জাহাজপুর গর্জনবাগান, টেকনাফ
ভ্রমণপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ জাহাজপুর গর্জনবাগান। টেকনাফের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে অবস্থিত এই স্থান বিশেষভাবে পরিচিত বিশাল গর্জনগাছের জন্য, যা পুরো এলাকায় ছায়াময় ও শীতল পরিবেশ তৈরি করেছে। গাছগুলোর সারি যেন এক সবুজ ছাতা হয়ে পথজুড়ে বিস্তৃত। এখানে এসে সমুদ্রের হাওয়া, পাখির ডাক আর নিরিবিলি পরিবেশ মনকে প্রশান্ত করে তোলে। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ জায়গা। সূর্যাস্তের সময় গর্জনগাছের ফাঁক দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য ভ্রমণকে করে তোলে আরও মোহনীয় ও স্মরণীয়। টেকনাফ যেতে পড়বে এই স্থান।
৪. দরিয়ানগর
দরিয়া নগর প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অসাধারণ গন্তব্য, যেখানে পাহাড়, সমুদ্র আর সূর্যের মায়াবী মিলন এক অনন্য অভিজ্ঞতা তৈরি করে। কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে কলাতলী মোড় থেকে মাত্র চার কিলোমিটার এগোলেই চোখে পড়বে এই মনোরম স্থান।
একদিকে বিস্তীর্ণ বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে কক্সবাজার থেকে টেকনাফগামী দৃষ্টিনন্দন সড়ক।
যাঁরা নিরিবিলিতে সমুদ্র উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য দরিয়ানগর সমুদ্রসৈকত এক আদর্শ জায়গা। এখানে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বসে সমুদ্রের ঢেউ দেখা সত্যিই অন্য রকম অনুভূতি দেয়। এ ছাড়া উঁচু পাহাড়ের নিচ দিয়ে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গপথ শাহেনশাহ গুহা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ। সঙ্গে আছে ছোট ছোট ঝিরি ঝরনা, যা পুরো ভ্রমণকে করে তোলে আরও জীবন্ত ও রোমাঞ্চকর।
ভিন্ন স্বাদের অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে দরিয়ানগর অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখার মতো একটি গন্তব্য হতে পারে।
৫. টাইগাংকাটা, মিনি বান্দরবান, কক্সবাজার
মিনি বান্দরবান কক্সবাজারের এক নতুন আকর্ষণ, যা প্রকৃতিপ্রেমী ভ্রমণকারীদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। উঁচু-নিচু পাহাড়ের ভেতর দিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক সাপের মতো আঁকাবাঁকা, যা ভ্রমণকে করে তোলে রোমাঞ্চকর। দুই পাশে সবুজ গাছপালা, সুপারিবাগান, ধানখেত আর পাখির কিচিরমিচির—সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে এখানে।
মেরিন ড্রাইভ ধরে কক্সবাজার থেকে টেকনাফের পথে রেজুখাল সেতু পার হলেই চোখে পড়ে ‘মিনি বান্দরবান’ সাইনবোর্ড। সেখান থেকে পূর্ব দিকে গেলেই শুরু হয় এই দৃষ্টিনন্দন সড়ক। কিছু দূর এগোলেই পাওয়া যায় গোয়ালিয়া পার্ক, যেখানে পাহাড়চূড়া থেকে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি উপভোগ করা যায়।
এখানে ‘মিনি চিম্বুক’ নামে একটি পাহাড়ও রয়েছে, যেখানে উঠে দেখা যায় সমুদ্র, ঝাউবন ও দূরের পাহাড়সারি। যদিও এটি আসল বান্দরবানের মতো উঁচু নয়, তবু এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ভ্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। যারা স্বল্প সময়ে পাহাড়ি পরিবেশের স্বাদ নিতে চান, তাঁদের জন্য এটি আদর্শ গন্তব্য।
৬. নাইক্ষ্যংছড়ি লেক, বান্দরবান
নাইক্ষ্যংছড়ি লেক কক্সবাজারের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রাকৃতিক লেক, যা শান্তি ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমন্বয় ঘটিয়েছে। লেকের পানি নীলাভ এবং চারপাশের সবুজ বনভূমি ও পাহাড়ের মাঝে লেকটি যেন এক মনোরম দৃশ্য তৈরি করেছে। এখানে একটি ঝুলন্ত সেতুও রয়েছে।
ভ্রমণকারীরা লেকের তীরে বসে প্রকৃতির নীরবতা উপভোগ করতে পারেন। স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় ও কায়াকিং লেকটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। সকাল বা সন্ধ্যার সময়ে লেকের প্রতিফলিত সূর্যাস্তের দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ।
যাঁরা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সময় কাটাতে চান বা ফটোগ্রাফি এবং প্রকৃতি উপভোগ করতে চান, তাঁদের জন্য নাইক্ষ্যংছড়ি লেক একটি আদর্শ গন্তব্য। এখানে এসে ভ্রমণকারীরা শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে পারেন।
৭. সোনালি ঝরনা, নাইক্ষ্যংছড়ি
ঝরনা দেখার মোক্ষম সময় বর্ষাকাল। সোনালি ঝরনা নাইক্ষ্যংছড়ি ইউনিয়নের চাকঢালা বাজার থেকে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে, যেখানে দুটি প্রাকৃতিক ঝরনা রয়েছে। এই ঝরনাগুলোর দৃশ্য চোখে না দেখলে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য কল্পনাও করা যায় না। চারপাশের সবুজ পাহাড় ও বেষ্টিত পাথরের মাঝে ঝরনার ঝুম ঝুম শব্দ ভ্রমণকারীর মনকে শান্তি দেয় ও যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ দূর করে। বর্ষাকালে ঝরনার জলধারা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, যা ভ্রমণকে আরও রোমাঞ্চকর করে।
৮. বরইতলী ঝরনা, নাইক্ষ্যংছড়ি
বরইতলী ফাত্রাঝিরি ঝরনা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের বরইতলী-মংজয় পাড়া গ্রাম থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এক মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক ট্রেইল বরইতলী ট্রেইল, যা অনেকের কাছে বরইতলী ফাত্রাঝিরি ঝরনা নামেও পরিচিত। এই এলাকায় ফৈরাঙধং, তুলাতুলী ও জামতলী পাহাড়ের পাদমূল থেকে অসংখ্য ছড়া ও ঝিরি ঝরনা বয়ে গেছে।
ট্রেইলটি আঁকাবাঁকা ভালুকিয়া খাল, পাহাড়ি ঝিরিপথ, পাললিক শিলা এবং সবুজে ঘেরা পাহাড়ের সমাহারে দৃষ্টিনন্দন ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা দেয়। বরইতলী ট্রেইলে তিনটি প্রধান ঝরনা রয়েছে। শুরুতে দুটি ছোট ঝরনা, যা ‘নিঝুম ঝরনা’ নামে পরিচিত এবং পরে একটি বিশাল ঝরনা। এই বড় ঝরনাটি ভ্রমণকারীদের মূল আকর্ষণ। অনেকের কাছে এটি ‘মুরং ঝরনা’, আবার কারও কাছে ‘ত্রিমুখী ঝরনা’ নামেও পরিচিত।
ত্রিমুখী ঝরনার পানি পাহাড়ের পাথর ধরে পড়ে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। ঠান্ডা পানি এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ ভ্রমণকারীর মনকে সতেজ ও প্রাণবন্ত করে তোলে। বরইতলী ট্রেইল প্রকৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন করে, অ্যাডভেঞ্চার এবং শিথিলতার এক অনন্য অভিজ্ঞতা প্রদান করে। ট্রেইলের শুরুতে এখানে একটি বৌদ্ধমন্দিরও রয়েছে।
৯. ভুবন শান্তি ১০০ ফুট সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি
কক্সবাজার ঘোরাফেরা শেষে কিংবা দুপুরে লাঞ্চ করতে পারেন রামু চা–বাগানে। শেষে আপনারা যেতে পারেন ভুবন শান্তি ১০০ ফুট সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি, যা রামুর চা–বাগানের পাশেই অবস্থিত। এশিয়ার মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ বুদ্ধমূর্তি। আশা করি, এখানে গেলে ভ্রমণপিপাসুদের ভালো লাগবে।
১০. কুমির প্রজেক্ট
উখিয়ার কুতুপালং থেকে দেখতে যেতে পারেন দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির খামারে। খামারটির নাম হচ্ছে আকিজ ওয়াইল্ডলাইফ ফার্ম লিমিটেড। প্রধান সড়ক থেকে হেঁটে যেতে যেতে দেখা মিলবে রাবারবাগান এবং ড্রাগন ফল বাগানের। ভ্রমণপিপাসুদের এখানে আসার পর মনে হবে পৃথিবীর এত বড় বড় কুমিরের চাষ যে বাংলাদেশে হয়, তা এখানে না এলে জানা হতো না।
১১. বাংলাদেশ ও মিয়ানমার হাইওয়ে
কুমির প্রজেক্ট দেখা শেষে দেখতে যেতে পারেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার হাইওয়ে রোড, যা এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত। এর ঠিক পাশ দিয়ে একটা রাস্তা রয়েছে, যা ধরে এগোলে সীমান্তের কাছ ঘেঁষে যেতে পারবেন।
এ ছাড়া আপনারা দেখতে যেতে পারেন টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ। নাফ নদীর ওপরে অনেক বড় সেতু ভ্রমণপিপাসুদের মুগ্ধ করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী ঘুরে আসতে পারেন। যদি এক রাত সময় থাকে তাহলে সোনাদিয়া দ্বীপে ক্যাম্পিং করতে পারেন।