ভোর চারটা ত্রিশ। বাইরে আলো-আঁধারি। একটু পরই ফজরের আজান হবে। তখন তূর্ণা এক্সপ্রেস পুবাইল স্টেশন অতিক্রম করছে। ভোর ছয়টায় কমলাপুর স্টেশনে পৌঁছলাম। শুভ্র মেঘের ভেলা থেকে নেমে আসছে অসময়ের বৃষ্টির ছাঁট। বন্ধু রব্বানিসহ রিকশায় করে নয়াপল্টনের বাসায় এলাম।
দীর্ঘ ট্রেনযাত্রার ক্লান্তি দূর করতে হাতমুখ ধুয়ে তন্দ্রাবিলাস করলাম কিছুক্ষণ। কলবেল বেজে উঠল। বুয়া খালা চিল্লাপাল্লা করে বাসায় ঢুকল। তাঁর ছেলে শুক্র আলীর সঙ্গে রোজ শুক্রবারে যত ঝগড়া। বুয়া বললেন, ‘ছুটির দিনেও শান্তি নাই। সবার ছুটি আছে, আমার নাই। খাটিয়ায় না চড়া পর্যন্ত ছুটি নাই। আমার পোত শুক্রইরগা জীবনটা ত্যানা ত্যানা কইরা ফেলছে। মামা, চিরতরে আল্লাহ ছুটি দিলে আমারে চানপুরে নিয়া মাটি দিয়েন। আমার পেটে যে পুত ধরছি, হেতে আমারে মাটিও দিবে না। কর্জ করে শুরের বাচ্চা আবার নেশা করছে।’
তাওয়ায় শুভ্র ঝলসানো রুটি ফুলে উঠছে বলের মতো। বুয়া শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে খুন্তি দিয়ে রুটি উল্টে নিচ্ছেন। আহা রুজিরুটির জীবন। গরম কড়াইয়ে ছ্যাঁতছুঁত ডিম পোচ হওয়ার শব্দ। বাড়ি থেকে আসার সময় গরুর কালা ভুনা দিয়েছিলেন হোম মিনিস্টার (গৃহকর্ত্রী)। নাশতা সেরে ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে সিএনজি করে রওনা দিলাম কারওয়ান বাজারের দিকে। ওভারব্রিজের মুখে নামিয়ে দিল। বৃষ্টির ময়লা পানি–কাদায় একাকার হয়ে আছে। সবজির টুকরি নিয়ে অনেকে বসে আছেন। ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড়। সবজির উচ্ছিষ্ট ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। দু–একজন টোকাই রাস্তা থেকে চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, তরুল, পটোল কুড়াতে ব্যস্ত। কিছু শ্রমিক টংদোকানে ধোঁয়া উড়িয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন।
প্রথম আলো অফিসের নিচতলা বন্ধুদের পদচারণে মুখর। রেজিস্ট্রেশন খাতায় স্বাক্ষর করে লিফটের বোতাম চেপে দশম তলায়। সকাল ৯টায় বন্ধুদের সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত শুরু হলো। ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি...’ শেষ চরণটি শুনে বুকের মধ্যে হু হু করে উঠল। এখানে ‘মা’ বলতে দেশমাতৃকার কথা বোঝালেও আমার নিজেরও মা নেই। আসলে মায়ের মুখ মলিন হলে সত্যিই দুনয়নের জলে ভাসি। কত গভীর অনুধাবন!
কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল আপাদমস্তক মনোবিজ্ঞানী। তাঁর কথায় জাদু আছে। অসাধারণ করে ফ্ল্যাশফিকশন ও মাইক্রোফিকশন উপস্থাপন করলেন। একেবারে আকাশের ঝলক দেওয়া বিজলি চমকানোর মতো। লেখকের কাজ লিখে যাওয়া। ভালো প্রশ্ন করার জন্য চারজন বন্ধুকে তাঁর লেখা বই উপহার দিলেন।
এরপর আসেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন। তিনি অনুবাদ নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করে বলেন, অনুবাদ কখনো শব্দের নয়। অনুবাদকের কাজ হলো প্রসঙ্গ বোঝা। ব্রেড অ্যান্ড বাটারের আক্ষরিক অর্থ পাউরুটি ও মাখন হলেও এর প্রকৃত অর্থ রুটিরুজি। অনুবাদককে সব সময় সৃষ্টিশীল হতে হবে, ভাষা সম্পর্কে জানতে হবে।
ক্লাস শেষে স্যারের কুশলাদি জেনে নিজের লেখা বই ‘কালের সাক্ষী পটিয়া’ উপহার দিলাম।
ততক্ষণে বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদ এবং সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ হাজির। জাফর আহমদ রাশেদ বই প্রকাশের পূর্বে কী করা উচিত এবং কী করা অনুচিত, এ নিয়ে সুন্দর দিকনির্দেশনা দিলেন। অনেকে সূচিপত্র, লেখকের নাম, পৃষ্ঠা নম্বর না লিখে প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি দেন। লেখককে লেখার পর পাঠক সেজে নিজের লেখা পাঠ করতে হবে। প্রচুর পড়তে হবে। লেখক হতে হলে বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
এই ফাঁকে ধোঁয়া উড়িয়ে ওয়ান-টাইম কাপে লাল চা এল। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতেই সব ক্লান্তি যেন ১০ তলা থেকে উড়ে গেল উষ্ণ হাওয়ার মতো।
টেবিলে চুপচাপ বসে টুক টুক করে তাহসিন আহমেদ ও শাকিব হাসান মগজধোলাই করে খাতায় টুকে নিচ্ছেন বসকিছু। সৌমেন্দ্র গোস্বামীর কবিতামাখা সঞ্চালনা ছিল দারুণ।
এর মধ্যেই হাজির হলেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন। ফিচার নিয়ে এত সুন্দর বললেন তিনি, মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। বললেন, পুরো পৃথিবীটা ফিচারের রসদ। ফিচারের শিরোনাম হবে ‘ক্যাটস অব দ্য আই’। শিরোনাম আকর্ষণীয় হতে হবে। না হলে তা হবে চিনিবিহীন শরবত।
সুমনা আপা তাঁর প্রয়াত বাবার একটা সুন্দর অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন। একদিন তাঁর বাবা রিকশা করে বাজার নিয়ে ফিরলেন। বাসায় এসে সুমনা আপাকে বললেন, ‘মা, রিকশাচালক গরমে হাঁপাচ্ছিল, একগ্লাস পানি চাইল।’
সুমনা আপা বাবার কথা শুনে ঠান্ডা পানিতে লেমন স্কোয়াশ দিলেন। রিকশাচালক ঠান্ডা শরবত পান করে বললেন, ‘আসলে মা, আমার পানির তৃষ্ণা পেয়েছিল। একটু পানি হলে ভালো হতো।’ তাঁর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী রে কিছু বলেছে?’ ‘বাবা, তিনি আসলে পানি চেয়েছেন।’
সুমনা আপা গল্পের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন, পাঠক আসলে কী চান, তা বুঝতে হবে। ফিচারের ক্লাসটি ছিল আমার কাছে দাবদাহ রোদে তৃষ্ণা মেটানো লেমন স্কোয়াশের মতো।
দুপুরের বিরতির পর কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন আনন্দের মাধ্যমে বন্ধুদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিলেন। স্বরচিত কবিতা শোনালেন। লেখক ছোটবেলায় নৌকার মাঝি, আইসক্রিমওয়ালা, টেনিস বল কারখানার মালিক হওয়ার স্বপ্নের কথা শোনালেন।
লেখক বন্ধু উৎসবের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ ছিল বিকেলের সেশন। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক বললেন, লেখালেখি করে টাকা নেই, ভাত নেই ,শিল্পী হওয়া মানে ব্যর্থ হওয়া। আর ব্যর্থ হলেই শিল্পী হবেন। অনেক শিল্পী, লেখক ও কবি জীবদ্দশায় মূল্যায়ন পায়নি। মৃত্যুর পরে মূল্যায়ন পেয়েছেন।
লেখকজীবনের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শিল্পী কামরুল হাসানের জীবনের ট্র্যাজেডির কথা বলেন আনিসুল হক। লেখালেখির জন্য কাছের মানুষ, এমনকি ঘরের সঙ্গী পর্যন্ত সমালোচনা করবেন, লেখক প্রশংসিত হবেন না।
শেষে ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার–২০২৬’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। পুরস্কার ও সনদ প্রদান শেষে সবাই মিলে হলো ফটোসেশন।
লেখক বন্ধু উৎসব শেষে যখন ফিরছিলাম, মন বলছিল আরও কিছুক্ষণ থাকতে। শেখার টানে এবং সারা দেশ থেকে আসা লেখক বন্ধুদের টানে। হামাগুড়ি দেওয়া থেকে শিখছি, মাথার চুল পেকে শনপাপড়ির না হওয়া পর্যন্ত শিখতে হবে। লেখক বন্ধু উৎসব আমার কাছে শুধু শেখার নয়, সারা দেশ থেকে আসা লেখক বন্ধুরা একে অপরকে জানার, ভালোবাসার বন্ধু হয়ে মনমন্দিরে থেকে যাবেন অনন্তকাল।
অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬