কিছু আয়োজন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু রেশ থেকে যায় অনেক দিন। কিছু কর্মশালা শুধু লেখার কৌশল শেখায় না, নিজের ভেতরের লেখকটিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ করে দেয়। প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ আমার কাছে তেমনই একটি স্মরণীয় আয়োজন।
দুই মাস ধরে চলা এই কর্মশালার শুরু হয়েছিল অনলাইনে। প্রথম পর্যায়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৩০০ জন বন্ধুসভার সদস্য ও লেখালেখিতে আগ্রহী মানুষ এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। আমিও তাঁদের একজন। প্রথম চারটি অনলাইন কর্মশালায় অংশ নেওয়ার পর প্রতিটি সেশন আমার কাছে মনে হয়েছে লেখালেখির বিশাল জগতের নতুন একটি জানালা খুলে দেওয়ার মতো।
কর্মশালার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আমাদের বিস্তারিতভাবে জানানো এবং পুরো আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাছ থেকে কর্মশালার উদ্দেশ্য, লেখালেখির চর্চা ও পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে জানতে পেরেছি। আয়োজনটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল, সেটিও অংশগ্রহণকারীদের অনুপ্রাণিত করেছে।
আমার জন্য এই উৎসবের সবচেয়ে বড় পুরস্কার—আবার শিক্ষার্থীর আসনে বসতে পারা, তরুণদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেখা এবং নিজের কলমকে নতুন করে প্রশ্ন করার সাহস পাওয়া।
তবে এই যাত্রা সবার জন্য একই জায়গায় থেমে থাকেনি। প্রাথমিকভাবে অংশ নেওয়া প্রায় ৩০০ জনের মধ্য থেকে মূল্যায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন ৫৫ জন। তাঁদের মধ্য থেকেও সেরা পাঁচজনকে নির্বাচিত করে পুরস্কৃত করা হয়। ফলে পুরো আয়োজনটি কেবল একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল শেখা, নিজেকে যাচাই করা, প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নিজের সক্ষমতাকে আবিষ্কার করা এবং সর্বোপরি নিজের লেখাকে আরও পরিশীলিত করার সুযোগ।
২৮ আগস্ট সমাপনী দিনের অফলাইন আয়োজনটি যেন সেই দীর্ঘ পথচলার একটি আনন্দময় মিলনমেলা। সাতটি সেশনে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে সবার প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ ছিল। বন্ধুসভার সদস্যদের পাশাপাশি লেখালেখিতে আগ্রহী আরও অনেকে এতে যুক্ত হয়েছিলেন। চারপাশে ছিল তরুণ মুখ, নতুন ভাবনা, নতুন স্বপ্ন আর লেখার প্রতি গভীর আগ্রহ।
বয়সের বিচারে হয়তো তরুণদের ভিড়ে আমি কিছুটা ব্যতিক্রম। কিন্তু এই দিন আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিল, শেখার কোনো বয়স নেই। কলম হাতে নেওয়ার পর মানুষ আসলে কখনো বৃদ্ধ হয় না। তাঁর ভেতরে সব সময় একজন শিক্ষার্থী বেঁচে থাকে, যে নতুন কিছু জানতে চায়, নতুন কিছু ভাবতে চায়, নিজের ভুল থেকে শিখতে চায়।
নিজেও লেখালেখির জগতের একজন মানুষ। বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা আছে, দীর্ঘদিন ধরে লিখছি। তবু এই কর্মশালায় এসে মনে হয়েছে, যত লিখি, ততই বুঝি—জানার বাকি কত! একজন লেখকের পথ কখনো সম্পূর্ণ হয় না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাঁকে শিখতে হয়, পড়তে হয়, শুনতে হয় এবং নিজের লেখাকে প্রশ্ন করতে হয়।
কর্মশালার সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি ছিল আলোচকেরা। অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দীন, প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক ও কবি সাজ্জাদ শরিফ, মনোরোগবিশেষজ্ঞ ও কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল, সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন, প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক, বাতিঘরের সিইও অ্যান্ড চিফ এডিটর জাফর আহমদ রাশেদ ও কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। প্রত্যেকেই নিজস্ব অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। কারও সঙ্গে কারও তুলনা করতে চাই না; আমার কাছে প্রত্যেক সেশন পরিচালনাকারীই সমান শ্রদ্ধার।
৩০০ জনের সঙ্গে শুরু, ৫৫ জনের চূড়ান্ত নির্বাচন, সেখান থেকে সেরা পাঁচজনের স্বীকৃতি—এই সংখ্যাগুলোর ভেতরে আসলে লুকিয়ে আছে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন, চেষ্টা আর ভালোবাসা।
আমার জন্য এই উৎসবের সবচেয়ে বড় পুরস্কার—আবার শিক্ষার্থীর আসনে বসতে পারা, তরুণদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেখা এবং নিজের কলমকে নতুন করে প্রশ্ন করার সাহস পাওয়া। পাশাপাশি আমি একজন প্রকাশক, আমার আজকের অনুষ্ঠানে লেখক ও প্রকাশকের মধ্যে যে একটা শৈল্পিক সম্পর্ক, আজকের আলোচনায় আমাকে আরও বেশি প্রকাশনার কাজে দায়বদ্ধতার মধ্যে রেখে দিল।
প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’ শেষ হলো, কিন্তু আমার শেখার পথ শেষ হলো না; বরং সমাপনী দিনটি মনে হলো আরেকটি শুরুর দিন। কারণ, বয়স কেবল সময়ের হিসাব, শেখার ইচ্ছাই মানুষের প্রকৃত তারুণ্য।
অংশগ্রহণকারী, লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬