চন্দ্রদ্বীপ থেকে বরিশাল—কীভাবে নামটি এল
ভোরবেলা কীর্তনখোলা নদীর কুয়াশা ভেদ করে যখন লঞ্চের সাইরেন বাজে, মনে হয় লঞ্চের চাকার সঙ্গে সঙ্গে যেন পেছনের দিকে সরে যাচ্ছে কয়েক শতাব্দী। স্টিমারঘাটের পন্টুনে পা রাখতেই নাকে এসে লাগে সুপারিপাতার গন্ধ আর পুরোনো ইটের স্যাঁতসেঁতে সুবাস। এই সুবাসই তো বরিশাল।
বরিশাল বাংলাদেশের মানচিত্রের এক জীবন্ত আখ্যান। এখানকার একেকটি নদী আর ইটের কোনায় লুকিয়ে আছে ইতিহাসের নানা জীবন্ত চরিত্র। গল্পের সুতা টানলে সবার আগে ভেসে ওঠেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ। শহরের অলিগলি পেরিয়ে একটু ভেতরে হাঁটলেই শোনা যায় তাঁর সেই চিরচেনা আক্ষেপ—‘বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর’। এই বরিশালের আকাশ, ধানখেত আর জলের ছবিই তো তাঁর কবিতার রক্তকোষ। পাশেই ছায়া হয়ে আছেন জননী কবি কুসুমকুমারী দাশ, যিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে’।
বরিশাল বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা এক মহাকাব্যিক রূপান্তর। এর ইতিহাস খুঁজতে ফিরে যেতে হবে প্রাক্-মোগল আমলে। তখন এই বিস্তৃত নিম্নভূমি পরিচিত ছিল ‘চন্দ্রদ্বীপ’ বা ‘বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ’ রাজ্য হিসেবে। রাজা দনুজমর্দন দেবের প্রতিষ্ঠিত এই দ্বীপরাজ্য ছিল নদ-নদী আর জলাভূমিতে ঘেরা এক প্রাকৃতিক দুর্গ। মোগল আমলে এবং পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিরোধে এই অঞ্চল এক রণকৌশলগত দুর্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ব্রিটিশ আমলে এই জনপদের প্রশাসনিক সীমানা বারবার পুনর্গঠিত হয়। ১৭৯৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট–ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বিশাল অববাহিকাকে ‘বাকেরগঞ্জ’ জেলা হিসেবে ঘোষণা করে। ১৮০১ সালে এর সদর দপ্তর কীর্তনখোলার কোল ঘেঁষে থাকা বরিশালে স্থানান্তরিত হলে তখন থেকেই মানচিত্রে ‘বরিশাল’ নামের আত্মপ্রকাশ।
নামকরণ নিয়ে তিনটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। প্রথমটি উদ্ভিদকেন্দ্রিক—অতীতে এখানে জন্ম নিত বিশাল শালগাছের অরণ্য, লোকমুখে ‘বর-শাল’ থেকে বরিশাল। দ্বিতীয়টি বাণিজ্যিক—উপকূলীয় লবণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের কাছে এটি ‘বরি-সল্ট’ নামে পরিচিত ছিল, যা থেকে বরিশাল। তৃতীয়টি নদীকেন্দ্রিক—এখানকার বিল-জলাভূমিতে পাওয়া বিপুল শোল মাছের প্রাচুর্য থেকে ‘বর-শোল’ বা বরিশাল।
এই ভূখণ্ডের চালিকা শক্তি এর নদীমাতৃক বাস্তুতন্ত্র। কীর্তনখোলা, বলেশ্বর, ধানসিঁড়ি, মেঘনা কিংবা হরিণপাশার মতো জলধারা এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি ও অর্থনীতিকে রূপ দিয়েছে। এর উর্বর পলিমাটি ও শস্যের বিপুল প্রবৃদ্ধি দেখেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বরিশালকে শস্যভান্ডার বলেছেন।
গল্পের এই ক্যানভাসে রং ছড়াতে আসেন মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা কবি বিজয় গুপ্ত, স্বদেশি আন্দোলনের চারণ কবি মুকুন্দ দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে মুকুন্দ দাসের গান এই মাটির মানুষকে শিখিয়েছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে। আর আছেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, যিনি ১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোর প্রস্তাবে বাঙালি জাতিকে স্বাধিকারের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তার শিকড় প্রোথিত ছিল এই বরিশালেরই পলিমাটিতে।
ইতিহাসের পাতা ওলটালে বুক কেঁপে ওঠে একাত্তরের রক্তস্নাত দিনে। কীর্তনখোলার কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ৩০ গোডাউন বধ্যভূমি আজও সেই বর্বরতার সাক্ষী। এখানেই ভেসে বেড়ায় ৭ নম্বর সেক্টরের বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ও ২ নম্বর সেক্টরের বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামালের বীরত্বের পদধ্বনি। ১৪ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রাক্কালে শহীদ হওয়া জাহাঙ্গীরের রক্তে এই মাটি আরও পবিত্র হয়েছে।
এই জনপদের বাতাসে মিশে আছেন মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্ত, কবি কামিনী রায়, লোকায়ত দার্শনিক আরজ আলী মাতুব্বর এবং নারী জাগরণের অগ্রপথিক জননী সাহসিকা সুফিয়া কামাল।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিবির পুকুরপাড়, একটু দূরে উজিরপুরের সাতলার বিলে লাল শাপলার চাদর কিংবা কুয়াকাটা সৈকত থেকে একসঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার রোমাঞ্চ—এসবের চেয়ে বড় সত্য, এখানকার মানুষের মন। গৌরনদীর খাঁটি দই আর মেঘনার ইলিশ দিয়ে অতিথিকে বরণ করার সংস্কৃতি কেবল আপ্যায়ন নয়, এক আত্মিক টান। এখানকার মিহি সুর—‘মনু, ডাইলে লবণ দেছো, না দেবা?’—শুনলে মনে হয়, কেউ পরম স্নেহে নিজের ঘরের দাওয়ায় ডেকে নিচ্ছে।
চন্দ্রদ্বীপের অতীত থেকে আজকের আধুনিক রূপান্তর—এটি বঙ্গীয় সভ্যতা, সাহিত্য, রাজনীতি ও লোকায়ত জীবনের এক সংমিশ্রিত মহাকাব্য। নদী আর মানুষের এই যুগলবন্দী যতক্ষণ বহমান থাকবে, বরিশাল তার ঐতিহ্যের মশাল নিয়ে বাঙালির হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাবে।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়