কৈশোরের নজরুল, স্মৃতির বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িছবি: লেখক

বাংলার আকাশে যাঁর কণ্ঠ বিদ্রোহের বজ্রধ্বনি হয়ে উঠেছিল, যাঁর কলমে প্রেম আর প্রতিবাদ একই সুরে ধ্বনিত হয়েছে—জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জীবন কেবল কবিতা বা গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে, নানা স্মৃতিতে, নানা ঠিকানায়। এমনই এক স্মৃতিধন্য স্থান হলো ময়মনসিংহের ত্রিশালের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি। নজরুলের কৈশোরের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জড়িয়ে আছে এই বাড়িটি ঘিরে। সময়ের প্রবাহে এটি আজ রূপ নিয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্রে। যা কবির জীবন, সাহিত্য ও আদর্শের নীরব বাহক।

‘আমি বিচুতিয়া ব্যাপারীর চতুর্থ বংশধর। শৈশবে চারবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য হয়েছে। কবি নজরুল বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করেছেন এবং এই বাড়িকেই তিনি নিজের বাড়ি বলে পরিচয় দিতেন। তাঁর স্মৃতি আমাদের পরিবারের জন্য গর্ব ও ইতিহাসের অমূল্য অংশ।’ জানান স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ মো. আবুল কাশেম।

কৈশোরের নজরুল ও ত্রিশালের পথচলা
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের শুরুর দিকের সময়টা ছিল সংগ্রামমুখর, অনিশ্চিত, আবার একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার বীজ বপনের সময়। কৈশোর বয়সে জীবিকার সন্ধানে, পড়াশোনার তাগিদে এবং অভিজ্ঞতার খোঁজে তাঁকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে বিভিন্ন জায়গায়। ত্রিশালের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি সেই ঘুরে বেড়ানোর এক স্মরণীয় ঠিকানা।

এই বাড়িতে অবস্থানকালেই নজরুল দরিরামপুর হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এখান থেকেই তিনি ত্রিশাল ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যেতেন, মানুষের সঙ্গে মিশতেন, প্রকৃতিকে দেখতেন। ধারণা করা হয়, এই সময়কার অভিজ্ঞতাগুলোই পরবর্তী জীবনে তাঁর সাহিত্য ও সত্তার ভিত নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। গ্রামীণ সমাজ, প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম—সবকিছুরই ছাপ পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়, গানে ও গদ্যে।

স্মৃতি থেকে স্মৃতিকেন্দ্র সময় বদলেছে। নজরুলের সেই সময়কার বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি আজ আর আগের মতো নেই। তবে ইতিহাসের গুরুত্ব বিবেচনায় এই স্থানটিকে সংরক্ষণ করা হয়েছে স্মৃতির নিদর্শন হিসেবে। বর্তমানে এটি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র নামে পরিচিত এবং এর তত্ত্বাবধান ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউট।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশালের বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি
ছবি: লেখক

তিনতলা ভবনটি শুধু একটি স্থাপনা নয়। এটি কবির জীবনের সময়কে ধারণ করে রাখা এক নীরব জাদুঘর। ভবনের প্রতিটি তলা আলাদা আলাদা কাজে ব্যবহৃত হলেও সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নজরুল।

স্মৃতিকেন্দ্রের নিচতলায় রয়েছে একটি মিলনায়তন। এখানে নিয়মিতভাবে সাহিত্যসভা, স্মরণ অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়। জাতীয় কবিকে ঘিরে গবেষণা, পাঠচক্র ও স্মৃতিচারণার জন্য এই মিলনায়তন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। স্থানীয় মানুষ থেকে শুরু করে গবেষক, শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিকর্মীদের পদচারণে মিলনায়তনটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে বিশেষ বিশেষ দিনে।

দোতলায় চলে দাপ্তরিক কার্যক্রম। নজরুল ইনস্টিটিউটের তত্ত্বাবধানে স্মৃতিকেন্দ্রের প্রশাসনিক কাজ, সংরক্ষণ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন আয়োজনের প্রস্তুতি এখান থেকেই পরিচালিত হয়। যদিও এটি মূলত দাপ্তরিক জায়গা, তবু এর প্রতিটি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবিকে ঘিরে দায়িত্ববোধ।

তৃতীয় তলাটি হচ্ছে স্মৃতিকেন্দ্রের মূল আকর্ষণ—নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র ও গ্রন্থাগার। এখানে প্রবেশ করলেই যেন সময় কিছুটা থমকে যায়। দেয়ালজুড়ে সাজানো রয়েছে কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিভিন্ন বয়সের ছবি। কোনো ছবিতে তিনি তরুণ, চোখে আগুন। কোনো ছবিতে পরিণত, গভীর চিন্তামগ্ন। এই তলায় নজরুলের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে একটি গ্রামোফোন। এই গ্রামোফোন শুধু একটি যন্ত্র নয়। এটি নজরুলের সময়, তাঁর সংগীতপ্রেম ও সংস্কৃতিচর্চার সাক্ষ্য বহন করে। দর্শনার্থীদের কাছে এটি বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

এ ছাড়া কবির হাতের লেখা কবিতা বাঁধাই করে ছবির পাশে দেয়ালে সাঁটানো হয়েছে। তাঁর নিজের হাতের লেখায় লেখা কবিতার পঙ্‌ক্তিগুলো যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে এই দেয়ালে। লেখা আর ছবির এই সহাবস্থান দর্শনার্থীদের নজরুলের আরও কাছে নিয়ে যায়।

কবি নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র
ছবি: লেখক

কবির থাকার ঘর: ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধা
বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির মূল স্মৃতিকেন্দ্র ভবনের পাশেই রয়েছে কবি নজরুল ইসলামের থাকার ঘরটি। ইতিহাসের মূল ভিত্তি অক্ষুণ্ন রেখে এটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে একটি টিনের ঘর হিসেবে। আধুনিকতার ছোঁয়া না দিয়ে, যতটা সম্ভব সেই সময়ের আবহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

এই ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে—নজরুলের কৈশোরের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। এখানে দাঁড়ালে সহজেই কল্পনা করা যায়, তরুণ নজরুল হয়তো এই ঘরের ভেতর বসেই কবিতার লাইন ভাবছেন, কিংবা দূরের কোনো মেলার গান শুনে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।

প্রকৃতি ও পরিবেশ: স্মৃতির সঙ্গে সৌন্দর্যের অপরূপ দর্শন
বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি শুধু একটি স্মৃতিকেন্দ্র নয়, এর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। তিনতলা ভবনটির চারপাশে সারি সারি গাছ, যা জায়গাটিকে ছায়াঘেরা ও শান্ত করে রেখেছে। সামনে রয়েছে শানবাঁধানো পুকুরঘাট—যেখানে দাঁড়িয়ে একটু থামলে মনে হয়, এই পানির ধারে বসেই হয়তো নজরুল সময় কাটিয়েছিলেন।

স্থানীয় মানুষজন এখানে অবসর সময় কাটাতে আসেন। কেউ আসেন ইতিহাস জানতে, কেউ আসেন শুধু প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে। শিশু থেকে বৃদ্ধ—সব বয়সের মানুষের উপস্থিতি এই স্মৃতিকেন্দ্রকে একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণে রূপ দিয়েছে।

বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ির সামনে।

স্মৃতিকেন্দ্রের গুরুত্ব ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতি সংরক্ষণ শুধু ইতিহাসের দায়িত্ব নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি সেই দায়িত্ব পালনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এখানে এসে নতুন প্রজন্ম শুধু নজরুলের নাম জানে না, তাঁর জীবনসংগ্রাম, শিক্ষাজীবন ও শিকড়ের সঙ্গেও পরিচিত হয়।

তবে এই স্মৃতিকেন্দ্রকে আরও কার্যকর ও প্রাণবন্ত করে তুলতে নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম, পাঠচক্র, শিশু-কিশোরদের জন্য কর্মশালা এবং পর্যটনবান্ধব উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে নজরুলের আদর্শ ও চেতনা আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

স্মৃতির ঠিকানায় ফিরে দেখা
বিচুতিয়া ব্যাপারী বাড়ি এক অর্থে নজরুলের কৈশোরের মানচিত্র। এখানে তাঁর পড়াশোনা, ভাবনা, ঘোরাফেরা—সবকিছু মিলেমিশে আছে স্মৃতির আবরণে। এই স্মৃতিকেন্দ্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন জাতীয় কবি হঠাৎ করে তৈরি হন না, সমাজ, পরিবেশ ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে তাঁর সত্তা।

ত্রিশালের এই নিরিবিলি প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্মৃতিকেন্দ্র তাই শুধু অতীতের গল্প বলে না। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে, নিজের শিকড় জানার, ইতিহাসকে সম্মান করার এবং সৃষ্টিশীলতার পথে এগিয়ে যাওয়ার।

উপদেষ্টা, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা