বৈশাখের মেলায় ফেলে আসা শৈশব

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

ছোটবেলায় দেখতাম বৈশাখ এলেই বাড়িতে উৎসবের আমেজ। স্কুল ছুটি, পড়াশোনার চিন্তা নেই; সবাই মিলে মেলায় যাব, বাতাসা খাব। অর্থাৎ বৈশাখ মানেই ছিল হই হই রই রই ব্যাপার। এখনো মনে পড়ে প্রথম বাবার কাঁধে করে মেলায় ঘোরার কথা। তখন ছিল না পড়ালেখার কোনো বালাই, সারা দিন খেলা করে কাটাই। সকালে বাবা বললেন, চলো মেলায় যাই। বাবার হাত ধরে চলে যেতাম হাজী আসমত কলেজ প্রাঙ্গণের মেলায়।

আমার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল লম্বা কাচের রঙিন রকেট, ডুগডুগি আর টমটম গাড়ি। আহা! কত যে খেলেছি এগুলো দিয়ে। কাচের রকেটটা যখন ভেঙে যেত, একরাশ বিষাদের কালো মেঘ মনের আকাশে জমত। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই শুরু হতো খেলার আনন্দ। সবাই যার যার পছন্দের জিনিস নিয়ে বের হতাম। খেলনার দাম, আকার নিয়ে চলত তর্ক। কেউ কেউ কিনত ক্রিকেট ব্যাট। সেই ব্যাট আবার বেশি দিন টিকত না। মেলা থেকে কেনা ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট খেলার আনন্দ ছিল আলাদা।

কালের পরিক্রমায় স্থান পরিবর্তন করে বৈশাখী মেলা চলে আসে মেঘনা নদীসংলগ্ন তিন সেতুর নিচে। দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা মেলায় আসেন, নানা রকমের জিনিসের দোকান নিয়ে বসেন। কাঠের তৈরি খেলনা, মাটির জিনিসপত্র, ব্যাংক, মাটির পুতুল, হাতি, ঘোড়া ছিল চাহিদার শীর্ষে। আরও বিক্রি হতো হাতপাখা ও কাগজের ফুল। হাজার মানুষের মিলনমেলা ঘটে সেদিন মেলা প্রাঙ্গণে। বলা হয়, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেলা আয়োজিত হয় ভৈরবে।

প্রতিবছর মেলায় বাবা কয়েকটা করে মাটির ব্যাংক কিনতেন। আমার প্রিয় খাবার ছিল হাওয়াই মিঠাই। মুখে দিলে নিমেষেই মিশে যেত। বিনোদনের মাধ্যম ছিল গুলি করে বেলুন ফোটানো আর নাগরদোলায় চড়া।

পয়লা বৈশাখ মানে পান্তা ইলিশ খাওয়া। বাবাকে দেখতাম নববর্ষের সকালে বেশ আয়েশ করেই খাচ্ছেন। ইলিশের কাঁটার ভয়ে খেতে পারতাম না। নববর্ষ আমাদের কাছে আনন্দের হলেও ইতিহাস বলে, তৎকালীন সময়ে বছরের শুরুতে কৃষকদের সব খাজনা পরিশোধ করতে হতো। একদিকে এই দিনটি জমিদার শ্রেণির জন্য উৎসবের হলেও সাধারণ প্রজার জন্য ছিল রেহাই পাওয়ার দিন। তাদের উৎসব হতো পরিশ্রমের মাধ্যমে খাবার উৎপাদনে।

সময়ের পরিবর্তনে বৈশাখের অনেক রীতি এখনো আছে; তবে কমেছে হালখাতার প্রয়োজন। মেলার পণ্যে এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। বৈশাখ এখন নাচ–গান আর সেলফিতে উদ্‌যাপিত হয়। কালের পরিবর্তনে বৈশাখের আমেজে ভিন্নতা এলেও এর ঐতিহ্য যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা