শীতের সকালে খেজুরের রসের সন্ধানে
শীত এলেই মনে পড়ে রসের গল্প—ছোটবেলার নানা রঙের স্মৃতি নিয়ে গড়া এক আলাদা জগৎ। শীত নামলেই মনে হয়, সময়টা যেন একটু ধীরে হাঁটে। কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই দিনগুলো আজও স্মৃতির দরজায় টোকা দেয় খেজুরের রসকে ঘিরে ছোটবেলার রঙিন গল্পগুলো নিয়ে।
তখন শীতের ভোর মানেই আলাদা এক উত্তেজনা। ঘুম ভাঙত ঠান্ডায় নয়, কৌতূহলে। চোখ মেলেই জানালা দিয়ে তাকাতাম কুয়াশার চাদরে মোড়া গ্রাম, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরগাছগুলো যেন নীরবে কিছু বলছে। দাদা ডাক দিতেন, ‘চলো, রস খেতে যাই।’ আমি শীতের পোশাক গায়ে জড়িয়ে তাঁর হাত ধরে বের হতাম। পায়ের নিচে শিশিরভেজা মাটি, নিশ্বাসে কুয়াশা, আর মনে অদ্ভুত এক আনন্দ।
গাছে ঝোলানো হাঁড়িটা দেখলেই বুকের ভেতর ধক করে উঠত। স্বচ্ছ ও টলটলে রস ধীরে ধীরে ঢালা হচ্ছে; সে এক মোহময় দৃশ্য। কখনো রস বেশি, কখনো কম। কোনো কোনো দিন শিয়ালের দুষ্টুমিতে হাঁড়ি ফাঁকা, সেদিন আফসোস ও হাসি একসঙ্গেই আসত। ঠান্ডা রসের প্রথম চুমুকেই কেঁপে উঠত শরীর, আর মনটা ভরে যেত অজানা সুখে।
সেদিন ভোরে নাছির ভাইয়ের ডাক শুনে শৈশবের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেন, ‘চলো, শীতের দিন রস খেয়ে আসি।’ আমিও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। নাজমুল ভাই, মশিউর ভাই, ইসমাইল, আবিদা, রিতাসহ আরও কয়েকজনকেও বললাম।
চারদিক কুয়াশায় আচ্ছন্ন। হাড়কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে ভোরের আলো ফোটার আগেই আমরা ছুটে গেলাম গাছ থেকে নামানো খেজুরের রস খেতে—স্বচ্ছ, মিষ্টি ও প্রকৃতির অপার দান।
কুয়াশা ভেদ করে রসের মিষ্টি ঘ্রাণ যেন জানান দেয় শীতের সৌন্দর্য। এক গ্লাস খেজুরের রসেই মিলিয়ে যায় শীতের ক্লান্তি, ফিরে আসে গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য ও ভালোবাসা।
নাজমুল ভাই ও নাছির ভাই বলেন, ‘আমরা চাই, গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে। রস উৎসব তারই একটি প্রয়াস। কুয়াশাঘেরা সকালে সবাই একসঙ্গে বসে রস খাওয়ার আনন্দ মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়।’
সময় অনেক কিছু বদলে দিয়েছে, কিন্তু স্মৃতির ভেতর সেই রস আজও আগের মতোই মিষ্টি, আগের মতোই আপন। শৈশব, গ্রামের সকাল, মানুষের আন্তরিকতা আর হারিয়ে যেতে বসা এক ঐতিহ্যের গল্প।