বন্ধুসভা বাড়িয়ে দিল বড়বেলার ঈদ আনন্দ

ভৈরব বন্ধুসভার বন্ধুরা।

এক, দুই, সাড়ে তিন
রাইত পোহাইলে ঈদের দিন

ছোটবেলায় সন্ধ্যার আকাশে চাঁদ দেখার পর সমবয়সীদের সঙ্গে এই ছড়া চিৎকার করে বলার মাধ্যমেই শুরু হতো আমার ঈদ। বড় হওয়ার সঙ্গে ঈদ আনন্দ যেন মলিন হয়ে গিয়েছিল। তারপর যেদিন বন্ধুসভায় আসি, ছোট-বড় নানা মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই, একটু একটু জড়তা কাটিয়ে ঘরবিমুখ হই, বিশেষ করে ঈদের আনন্দ ফিরে পাই নতুন আমেজে। প্রতিবছর ঈদের দিন আমরা হাজির হই প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক সুমন মোল্লা ভাইয়ের বাসায়।

এর আগেও রমজানে ইফতার, মিটিং অন্যান্য কাজেও ওনার বাসায় যাতায়াত থাকে। তবে ঈদ হবে আর বন্ধুসভার সবাই সুমন ভাইয়ের বাসায় যাব না, তা হবে না। সুমন ভাইয়ের সহধর্মিণী ওয়াহিদা আমিন পলি, আমরা ডাকি পলি ভাবি। তিনি ভৈরব বন্ধুসভার একজন উপদেষ্টা এবং আমাদের অভিভাবকের মতো। তিনি আপ্যায়ন করতে খুব পছন্দ করেন। এখনো মনে পড়ে, ২০১৭ সালে প্রথমবার যখন ওনাদের বাসায় যাই, তিনি সবাইকে ফালুদা, নুডলস, ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন করছিলেন। ফালুদা মুখে নেওয়ার পর সেই মিষ্টি স্বাদ আজও ভুলতে পারিনি।

প্রতিবছর সারা দিনে বন্ধুসভার প্রায় ৫০ জন সুমন ভাইয়ের বাসায় ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যাই। বন্ধুসভায় যুক্ত হওয়ার পরই বড়বেলার ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে শুরু করি। আমার ঈদ শুরু হয় সুমন ভাইয়ের বাসায় যাওয়ার পর, সবার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর।

এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। ঈদের নতুন জামা পরে আমি আর প্রিয়াংকা রিকশা করে চললাম চন্ডিবের মোল্লা বাড়ির উদ্দেশে। একে একে আসতে শুরু করেন বন্ধুসভার বন্ধুরা। মানিক, রিফাত, নাফিস সুমন ভাইয়ের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে খাবারের টেবিলের দিকে যাই, সেখানে মেধা, মিশু, প্রিয়াংকা খাবার তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমিও যোগ দিই ফল কাটার কাজে। কিছুক্ষণ পর আসে মাহমুদা তমা। সে একসময় বন্ধুসভার সক্রিয় বন্ধু ছিল, এখন কর্মব্যস্ততায় ঢাকা থাকলেও সুযোগ পেলেই আমাদের সঙ্গে দেখা করতে আসে। সবাই একসঙ্গে হওয়ার পর শুরু হয় সাংগঠনিক আড্ডা। আলোচনায় উঠে আসে বন্ধুদের নানা পরিকল্পনার কথা, বিগত আয়োজনগুলো নিয়ে পর্যালোচনা এবং সামনের দিনের পরিকল্পনা।

ভৈরব বন্ধুসভার বন্ধুরা।

এবার খাবার পর্বে ছিল পলি ভাবির হাতে তৈরি মজাদার চটপটি, নুডলস এবং তরমুজ ও কোল্ড ড্রিংকস। নুডলস ছাড়া আমার ঈদ পরিপূর্ণ হয় না, তাই একটু বেশিই খাই। ছোটবেলায় অনুষ্ঠান ছাড়া মানেই ছিল নুডলস রান্না। উৎসব ছাড়া নুডলস খেত না কেউ। তাই এটার প্রতি শৈশব থেকেই একটা আকর্ষণ কাজ করে। খাওয়াদাওয়ার পর চলে সালামি পর্ব। সুমন ভাই সবাইকে নতুন টাকা সালামি দেন। এটা দিতে তিনি বেশ আনন্দবোধ করেন, আমরাও পেয়ে দ্বিগুণ খুশি হই। তারপর কালের সাক্ষী বাংলা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চলে গ্রুপ ফটোসেশন। প্রতিবছর আমরা ঈদের দিনে এখানে দাঁড়িয়ে গ্রুপ ছবি তুলি। এটাও ঈদ আনন্দের অংশ হয়ে গিয়েছে।

আনন্দের সময়গুলো যেন দ্রুতই চলে যায়। পড়ন্ত বিকেলের নরম আলো গায়ে মেখে চললাম মুসলিমের মোড়ের দিকে আমি, প্রিয়াংকা আর প্রীতি। সেখান থেকে গন্তব্য ছয়সূতি প্রিয়াংকার নানুবাড়ি। আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ছোট ভাই রেদোয়ান ও তার বাবা। দোকান থেকে কিনে নিলাম কোকাকোলা, উপহার পেলাম একটা গ্লাস। মূলত গ্লাসের জন্যই কেনা।

তা ছাড়া ঈদের দিন কোক না খেলেও চলে না। এই অভ্যাসটাও বন্ধুসভায় গিয়ে হয়েছে। আমরা কথায় কথায় বলি, বন্ধুসভায় লোক, তাই খাই কোক। বিভিন্ন আয়োজনে আমাদের আনন্দের সঙ্গী এই কোকাকোলা।

সিএনজি ঠিক করে আমরা চললাম ছয়সূতির দিকে। ঈদ আনন্দের একটা অংশ প্রিয়াংকার নানুবাড়ি যাওয়া। খাওয়াদাওয়ার পর বিদায়বেলায় প্রিয়াংকার নানু হাতে গুঁজে দেন সালামি।

সারা দিন এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো একদিকে এমন ঈদ আনন্দ বাড়িয়ে দেয়, তেমনি ফিরিয়ে দেয় হারানো শৈশবের ঈদ।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা