নারী, নিজ শক্তিতে অদম্য

লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।

বিশ্ব নারী দিবসে প্রথম আলো বন্ধুসভার আয়োজনছবি: প্রথম আলো

নারী কেবল একটি পরিচয় নয়, নারী এক অবিরাম শক্তির নাম। নজরুলের কবিতায় আছে—‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’।
কবিতায় নজরুল নারীশক্তির জয়গান করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে এটিই সত্য যে কেবল রূপ, সৌন্দর্য আর মমতার মধ্যেই নারীর বিশালতা ফুরিয়ে যায় না, নারীশক্তিতেও সমুদ্রের মতো বিশাল। প্রত্যেক নারীর মধ্যেই রয়েছে অদম্য শক্তি। কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশে যে দুর্বলতা, এই দুর্বলতা সৃষ্টি করে পরিবার, সমাজ ও কাছের মানুষেরা। আর পথ রোধ করে নারীকে দুর্বল প্রতীয়মান করার এ ঘটনা খুবই চলমান একটি প্রক্রিয়া। তারপরও কি নারীকে থামিয়ে রাখা যায়? যায় না। সব বাধা উপেক্ষা করে আজ সর্বত্র নিজ শক্তিতে নারী দীপ্তি ছড়িয়ে যাচ্ছেন। সব প্রতিবন্ধকতা ও রূঢ়তার বুকে এঁকে দিচ্ছে বিজয়ের চিহ্ন।

ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি ফেরালে দেখা যাবে, সভ্যতার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে নিজ নিজ সমাজ ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনে পুরুষের পাশাপাশি নারীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। নারী সন্তান জন্ম দেন, লালন- পালন করেন, তৈরি করেন মানবিক মনুষ্যত্ববোধসম্পন্ন মানুষ। অথচ নারীর সমগ্র জীবনটাই লড়াইয়ের। একেবারে শৈশবে একজন কন্যাশিশু যখন প্রথম হাঁটতে শেখে, তখন থেকেই শুরু হয় তার লড়াই। কখনো পরিবারে, কখনো সমাজে, কখনো নিজের সঙ্গে তার এই লড়াই চলতে থাকে। কিন্তু সে থেমে থাকে না। কারণ, তার শক্তি অন্য কারও দেওয়া নয়, তা সে নিজেই নিজের মধ্যে গড়ে তোলে। প্রতিটি অসম্মান, প্রতিটি বাধা, প্রতিটি না-বলা স্বপ্ন তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে।

মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জীবনবোধ, তাঁর সংগ্রাম, সমাজ সংস্কার ও নারীশিক্ষায় তাঁর অবদান মনে করিয়ে দেয় কোনো বাধাই আসলে বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তিই গুরুত্বপূর্ণ। না হলে সেই যুগে শত বাধা উপেক্ষা করে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীর মুক্তির জন্য কাজ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন না। রোকেয়ার কাছে ‘নারীশক্তি' ধারণাটি ছিল শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজ ও মননের সব ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণাঙ্গ বিকাশ এবং পুরুষের পাশাপাশি সমানভাবে দেশের উন্নয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বেগম রোকেয়ার সেই ১০০ বছর আগের ভাবনা এখনো প্রাসঙ্গিক। নারীর শক্তি কেবল বাহ্যিক সাফল্যে নয়, সহনশীলতায়, অনুভূতিতে ও ভালোবাসায়। যে নারী ভেঙে পড়েও আবার দাঁড়াতে জানেন, যে নারী কাঁদতে জানেন, কিন্তু হাল ছাড়েন না, সেই নারীই প্রকৃত শক্তির প্রতীক। তিনি জানেন, কখন নীরব থাকতে হয়, আবার কখন নিজের কণ্ঠস্বরকে বজ্রের মতো করতে হয়। তিনি নিজেই নিজের পথ তৈরি করে। শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, শিল্প, বিজ্ঞান—সবখানেই তাঁর পদচিহ্ন স্পষ্ট।

আর নারী যখন নিজের শক্তি চিনে নেন, তখন কোনো শিকল তাঁকে বেঁধে রাখতে পারে না। তিনি জানেন, তাঁর পরিচয় কারও ছায়া নয়, তাঁর পরিচয় তিনি নিজেই। নিজের সিদ্ধান্ত, নিজের ভুল, নিজের সাফল্য—সবকিছুর দায় তিনি সাহসের সঙ্গে নেন। তাই পথ চলতে গিয়ে কখনো থমকে গেলে, পিছিয়ে পড়লে হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। তীব্র মানসিক শক্তি দিয়ে সব বাধা উপেক্ষা করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। আর একবার নিজের ভেতরের শক্তিকে জাগ্রত করতে পারলে তখন আর কোনো প্রতিবন্ধকতায় পথ রোধ করতে পারে না। মনে রাখতে হবে, নারীর আত্মবিশ্বাসই তাঁর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য, যা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে লালিত হয়ে সাহসে পরিণত হয়।

প্রতিদিন নীরবে যুদ্ধ করে যে নারীরা এগিয়ে যান, হাল ছাড়েন না, তাঁদের চলার পদধ্বনিতে উচ্চারিত হয়, ‘নারী, তুমি নিজ শক্তিতে অদম্য।’ তাঁরা আলো না পেলেও আলো হয়ে ওঠেন অন্যের জীবনে। তাঁরা জানেন, শক্ত হতে হলে অন্যের মতো হতে হয় না, নিজের মতো হলেই যথেষ্ট। কারণ, নারী যখন নিজেকে বিশ্বাস করেন, তখন তিনি শুধু নিজেকে নয়, পুরো পৃথিবীকেই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

নির্বাহী সভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ (২০২২–২৫)