ঘড়ির কাঁটা কেন সব সময় ডান দিকেই ঘোরে

ঘড়িছবি: পেক্সেলস

সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি। আবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় সময়। এই সময় জানার জন্য মানুষের দ্বারাই আবিষ্কৃত হয়েছে একটি যন্ত্রঘড়ি। ঘড়ির সাহায্যে প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন-রাত্রি এবং পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিশীল জীব-জন্তু, জলবায়ু-পরিবেশ ইত্যাদির জন্ম-মৃত্যু ও পরিবর্তনের হিসাব রাখার সুযোগ হয়েছে। ঘড়ির কাঁটার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিসাব রেখে উৎপত্তি হয়েছে ক্যালেন্ডার আর ক্যালেন্ডারের মাধ্যমে উৎপত্তি হয়েছে মাস ও সালের। পাশাপাশি লিপিবদ্ধ হয়েছে পৃথিবী ও বিশ্বপরিমণ্ডলের আদি থেকে অন্তিম রহস্যের ইতিহাস। ঘড়ি হলো এমন এক যন্ত্র, যা দিয়ে আমরা সময়কে জানতে পারি, তবে ধরে রাখতে পারি না।

ঘড়ি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন দেয়ালঘড়ি, হাতঘড়ি, টেবিলঘড়ি ইত্যাদি। এই ঘড়িগুলোর মধ্যে রয়েছে একধরনের স্মার্ট ঘড়ি এবং আরেক ধরনের কাঁটাযুক্ত ঘড়ি। এসব ঘড়ি আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস। বর্তমানে আমরা যে ঘড়ি ব্যবহার করি, তা এক দিনে এবং একজনের শ্রম ও সাফল্যের ভিত্তিতে আবিষ্কৃত হয়নি।

সময় গণনার জন্য উদ্ভাবন করা হয় পেন্ডুলাম ঘড়ি, কোয়ার্টজ ঘড়ি ইত্যাদি
ছবি: এআই আর্ট

ঘড়ি আবিষ্কারের আদিম ইতিহাস
ঐতিহাসিক মতে জানা যায়, মিসর ও ব্যাবিলনে প্রথম ঘড়ি আবিষ্কৃত হয়েছিল। তখন ঘড়ির যাত্রা শুরু হয়েছিল সূর্যঘড়ির মাধ্যমে। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মিসর ও ব্যাবিলনে উৎপত্তি হয়েছিল এই সূর্যঘড়ি। এটি ছিল গোলাকার চাকতিতে একটি নির্দেশক কাঁটা ও দাগ কাটা ঘরের মতো। সূর্যঘড়ির পর আবিষ্কৃত হয় তারাঘড়ি, যা প্রথম আবিষ্কার করে জার্মানরা। তারপর খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ শতকের সময়ে মিসরে উৎপত্তি হয় পানিঘড়ির। তখন গ্রিকরা ঘড়িটির নাম রাখে ক্লেপসাড্রা। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো পানিঘড়ি বা ক্লেপসাড্রা ঘড়ি সংরক্ষিত আছে মিসরের ফারাও প্রথম আমেনহোতেপের সমাধিতে। এই পানিঘড়ির হাত ধরেই উৎপত্তি হয় দিন, ঘণ্টা ও মাসিক ক্যালেন্ডারের। তখন একটি পাত্রের গায়ে নির্দিষ্ট দূরত্বের দাগ বা চিহ্ন কাঁটা দেওয়া হতো। একটি পাত্র থেকে অন্য পাত্রে ফোঁটা ফোঁটা করে পানি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাত্রের পানির স্তর নিচে নেমে অন্য পাত্রটির স্তর ওপরে উঠে আসত এবং এই স্তরের পরিবর্তন দেখেই সময় হিসাব করা হতো।

রোলেক্সের ঘড়ি
ছবি: রয়টার্স

পৃথিবীতে যান্ত্রিক ও আধুনিক ঘড়ির সূচনা
বিখ্যাত গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিবিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের (খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৭-২১২ অব্দ) হাত ধরে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ির সূচনা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে এসে ইউরোপীয়রা সূর্যঘড়ির তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি আবিষ্কার করে। কিন্তু এ সময় নির্মিত ঘড়িগুলোতে শুধু ঘণ্টা নির্দেশ করা সক্ষম হতো, মিনিট ও সেকেন্ড নির্ণয় করা সক্ষম হতো না। এরপর ১৪৯২ সালে আবিষ্কৃত হওয়া ‘প্যারাগুয়ে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক’ নামের ঘড়িতে ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডের কাঁটার সূক্ষ্ম ব্যবহার করা শুরু হয়। পরে ১৬১০ সালে ঘড়ির ডায়াল মাধ্যম হিসেবে কাচ ব্যবহার শুরু হয়।

১৮১৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস রোনান্ডসের উদ্ভাবনের হাত ধরে প্রথম ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক ঘড়ি আবিষ্কার হয়। ঘড়ির বহু পরিবর্তনের পর ১৯৮৩ সালে বিখ্যাত ও দূরদর্শী অস্ট্রিয়ান প্রকৌশলী জোসেফ পালওয়েবার প্রথম পকেটে বহনযোগ্য ডিজিটাল ঘড়ি তৈরি করেন। ১৯২৭ সালে আবিষ্কৃত হয় প্রথম কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল ঘড়ি। এই ঘড়ির মূল আবিষ্কারক কানাডিয়ান প্রকৌশলী ওয়ারেন মারিসন, যিনি ১৯৬৯ সালে জাপানের সেইকো কোম্পানি প্রথম এই প্রযুক্তির আধুনিক হাতঘড়ি বিশ্ববাজারে নিয়ে আসে। ১৯৭০ সালে এলইডি ডিসপ্লে-যুক্ত প্রথম হাত ঘড়ির প্রচলন হয়। এভাবে ধারাবাহিকতায় আসতে থাকে একের পর এক আধুনিক ও দামি সব ঘড়ি।

পুরোনো দেয়ালঘড়ি

ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরার কারণ
আধুনিক ঘড়ি আবিষ্কার হয়েছিল ইংল্যান্ড বা ইউরোপের কোনো দেশে। এর আগে ছিল সূর্যঘড়ি। ইংল্যান্ড পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় সূর্য দক্ষিণ আকাশে হেলে থাকে। এ কারণে সূর্যঘড়ির যে দণ্ডের ছায়া দেখে সময় পরিমাপ করা হয়, সেই ছায়া বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘোরে। কারণ, ওই স্থান উত্তর গোলার্ধে। ওখানে সূর্য যখন পূব থেকে পশ্চিমে যায়, তখন সূর্যঘড়ির দণ্ডের ছায়াটি বাঁ থেকে ডান দিকে ঘোরে। তাই ঘড়ি আবিষ্কারের সময় স্বাভাবিক ও অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তা অনুযায়ী ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরানোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ঘড়ি যদি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে আবিষ্কার হতো, তাহলে হয়তো ঘড়ির কাঁটা বাঁ দিকে ঘুরত। কারণ, দক্ষিণ গোলার্ধে সূর্যঘড়ির ছায়া উত্তর গোলার্ধের বিপরীত দিকে, অর্থাৎ ডান দিক থেকে বাঁ দিকে ঘোরে!

‘ওয়াচ’ ও ‘ক্লক’ শব্দের মধ্যে পার্থক্য
ঘড়ির ইংরেজি নাম হিসেবে ‘ওয়াচ’ ও ‘ক্লক’ শব্দ দুটি ব্যবহৃত হলেও এর মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে, অর্থের ব্যাখ্যার দিক থেকে। ‘ওয়াচ’ হলো এমন ঘড়ি, যা সাধারণত হাতের কবজিতে পরা হয়। অন্যদিকে ‘ক্লক’ হলো সাধারণত এমন ঘড়ি, যা দেয়াল বা পৃষ্ঠের ওপর স্থাপন করা হয়।

আরও পড়ুন
সৌদি আরবের মক্কা নগরীর ১ হাজার ৯৭২ ফুট উঁচু আবরাজ আল–বাইত ক্লক টাওয়ারের ঘড়ি
ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

বিশ্বের বৃহৎ ও ঐতিহাসিক ঘড়ি
মক্কা ক্লক: পৃথিবীর বৃহত্তম ঘড়ি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় অবস্থিত। মসজিদে হারাম শরিফের দক্ষিণ গেটের সম্মুখে ‘মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার’-এর ওপর স্থাপিত একটি বৃহৎ ঘটি। ঘড়িটির প্রস্তুতকারক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান জার্মানির এসএল রাশ কোম্পানি।

বিগ বেন: এটি লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার এলাকার সংসদ ভবনের উত্তরাংশের ক্লক টাওয়ারে অবস্থিত সুবিশাল ঘড়ি ঘণ্টার ডাক নাম, যা সময়ে সময়ে বেজে ওঠে। যে মিনারটিতে এই ঘড়ি এবং ঘণ্টাটি রয়েছে, সেটির উচ্চতা প্রায় ৩১৬ ফুট (৯৬ মিটার), যা প্রায় ১৬ তলা ভবনের সমান। এই মিনারের বর্তমান সরকারি নাম এলিজাবেথ টাওয়ার। ঘণ্টাটির ওজন প্রায় ১৩ দশমিক ৭ টন (১৩ হাজার ৭০০ কেজি), যা একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির ওজনের চেয়ে বেশি। ৩১ মে ১৮৫৯ সালে ওয়েস্টমিনস্টারজুড়ে প্রথমবারের মতো বেজে উঠেছিল বিগ বেন। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত ঘড়িসমূহের মধ্যে সবচেয়ে জটিল মনে করা হয় এই অযুতবর্ষী ঘড়িকে।

লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বিগ বেন
রয়টার্স

অক্টো ফিনিসিমো আলট্রা: এটি বিশ্বের সবচেয়ে চিকন ও পাতলা মেকানিক্যাল ঘড়ি। ঘড়িটির পুরুত্ব মাত্র ১ দশমিক ৭০ মিলিমিটার এবং এর ব্রেসলেটটির পুরুত্ব হচ্ছে মাত্র ১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার। একটি সাধারণ কয়েন বা ইউরো মুদ্রার চেয়ে পাতলা ঘড়িটি। ঘড়িটিকে মজবুত রাখতে এবং সহজে যাতে বেঁকে না যায়, সে জন্য এর ব্যাকপ্লেট বা মূল কাঠামো তৈরি করা হয়েছে অত্যন্ত শক্ত টাংস্টেন কার্বাইড দিয়ে এবং বাকি অংশ টাইটানিয়াম দিয়ে নির্মিত।

এ ছাড়া অনেক ঘড়ি আছে এমন, যা রাতের বেলায় জ্বলে। কারণ, এর ডায়ালে ট্রিটিয়াম নামের তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকে। আবার কিছু ঘড়ি দিনরাত চলতে থাকে। সময়ের চাকা চলতে থাকা যেন ফুরিয়ে যায় জীবনের আয়ু থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ। অন্যদিকে ঘড়ির উদ্ভাবনটি কেবল সময় পরিমাপকে আরও সহজলভ্যই করেনি, বরং সময় সম্পর্কে সামাজিক ধারণাকেও বদলে দিয়েছে; যা ব্যক্তিদের সময়কে আরও কার্যকরভাবে আত্মস্থ করতে ও পরিচালনা করতে শিখিয়েছে, উৎসাহিত করেছে। ঘড়ি সবার জীবনে ব্যক্তিগত সময়-সচেতনতার দিকে একটি পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা দৈনন্দিন জীবন এবং সময়কে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখার ধারণাকে প্রভাবিত করে।

তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা ও ইবিএসসিও
বন্ধু, কক্সবাজার বন্ধুসভা