মোস্তফা থেকে মুস্তারি

ছবি: এআই/বন্ধুসভা

ক্লাস ওয়ানে কি টুয়ে পড়ি। রবার্ট, মোস্তফা ও আমি একসঙ্গে টিফিন টাইমে খেলাধুলা করতাম। টিফিন খেতাম। টিফিন বলতে ঝালমুড়ি, বাদাম বা আইসক্রিম। আইসক্রিম বলতে বরফ। নারকেল দেওয়া থাকত সেখানে।

একদিন বন্ধু মোস্তফাকে দেখলাম স্কুলের সাদা শার্ট ও নীল প্যান্ট না পরে, পরে এসেছে মেয়েদের ইউনিফর্ম। বসেছে মেয়েদের সঙ্গে! আমাদের আর সাহস হলো না ওর সঙ্গে কথা বলার। অথচ ওর সঙ্গে কত হেসেছি, মারামারি করেছি, মনের কথা বলেছি। সেই বন্ধু কিনা আমাদের ছেড়ে একই ক্লাসের মেয়েদের সঙ্গে বসছে!

সহপাঠীদের কাছ থেকে জানলাম, মোস্তফার আসল নাম মুস্তারি। ওরা পাঁচ বোন। সে সবার ছোট। ওকে ওর অন্য বোনেরা ও মা–বাবা ছেলে সাজিয়ে রাখত। তিন বছর সে ছেলেদের ইউনিফর্ম পরেই স্কুলে এসেছে। তবে ও যখন মেয়েদের সঙ্গে বসতে শুরু করল, তখন ওর কণ্ঠ সত্যি মেয়েদের মতো লাগছে। এর আগে আমরা কেউ কখনো বুঝতে পারিনি যে সে মেয়ে!

মুস্তারি বেশি দিন আর ওই স্কুলে ছিল না। জানার কোনো উপায় ছিল না কোথায় গেছে সে।

৩০-৩২ বছর হলো। শৈশবের সেই স্মৃতি, বাল্যবন্ধু চোখের সামনে ছেলে থেকে মেয়ে হয়ে যাওয়ার ঘটনা এখনো ভুলতে পারি না। এরপর হাইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে; এখন কর্মজীবনে অনেক বন্ধু-শুভাকাঙ্ক্ষী পেয়েছি; কিন্তু মোস্তফা পরে যে মুস্তারি হয়েছে, ওর মতো কাউকে পাইনি। ওর পায়ে ব্যথা লাগলে যেন আমারই পায়ে ব্যথা লাগত। আমার কষ্টে সে–ও সমব্যথী হতো।

সৃষ্টিকর্তার কাছে মাঝেমধ্যে প্রশ্ন করি, আমি কি আবার কখনো আমার সেই শৈশবের বন্ধুটির দেখা পাব? সে কি আমাকে চিনতে পারবে? দেখা না পেলেও কোনো ক্ষতি হবে না; তবে শৈশবের সেই বন্ধুকে হারিয়ে আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। আমার মতোই কি সেই বন্ধু কষ্ট পেয়েছিল? যদিও সেই বন্ধুত্ব ছিল শুধুই বন্ধুত্ব। দুটি শিশুর বন্ধুত্ব। সৃষ্টিকর্তা কি আবার আমাদের সাক্ষাৎ করার ব্যবস্থা করতে পারেন না? তাঁর নিকট তো সবই সম্ভব।

বনপাড়া, বড়াইগ্রাম, নাটোর