চন্দনাইশের কাঞ্চননগরের পেয়ারা কেন এত বিখ্যাত
বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার পাহাড়ি জনপদে শুরু হয় পেয়ারার মৌসুম। সবুজে মোড়া বাগান থেকে ভোরবেলা ঝুড়িভর্তি পেয়ারা পৌঁছে যায় রৌশনহাট, বাগিচাহাটসহ আশপাশের বাজারে। ক্রেতাদের ভিড় আর পাইকারদের ব্যস্ততায় তখন মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এই ব্যস্ততার কেন্দ্রবিন্দু একটি নাম ‘কাঞ্চননগরের পেয়ারা’। স্বাদ, গুণগত মান ও দীর্ঘদিনের সুনামের কারণে এই পেয়ারা আজ দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম পরিচিত কৃষিপণ্য।
কাঞ্চননগরের পেয়ারার বিশেষত্বের মূল কারণ এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়ি উর্বর মাটি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, আর্দ্র জলবায়ু এবং চাষিদের অভিজ্ঞ পরিচর্যা ফলটির স্বাদ ও গুণগত মানকে অনন্য করে তুলেছে। ফলটি তুলনামূলক মিষ্টি, রসালো ও মাংসল। এতে শক্ত বিচির পরিমাণ কম এবং পাকলে শাঁস সাদা, হালকা হলুদ কিংবা লালচে আভা ধারণ করে। স্থানীয় ব্যক্তিদের মতে, একই জাতের চারা অন্য এলাকায় রোপণ করা হলেও কাঞ্চননগরের মতো স্বাদ পাওয়া যায় না।
এই পেয়ারার ইতিহাসও বেশ পুরোনো। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে পটিয়ার কচুয়াই চা–বাগানে বিদেশি জাতের পেয়ারার বীজ রোপণ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই জাতের পেয়ারা চন্দনাইশ ও পটিয়ার পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশে অভিযোজিত হয়ে এটি একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় জাত হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
স্বাদের পাশাপাশি পুষ্টিগুণেও পেয়ারা সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি, খাদ্যআঁশ, পটাশিয়াম ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে পেয়ারা খেলে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি, হজমে সহায়তা এবং শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে। তাই শিশু থেকে বয়স্ক, সবার কাছেই এটি একটি উপকারী ফল।
এই পেয়ারা স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। মৌসুমজুড়ে চন্দনাইশ ও পটিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত এই পেয়ারা পুরো চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। রৌশনহাটসহ স্থানীয় বাজারে প্রতিদিন ভিড় করেন পাইকারেরা। এই ফল ঘিরে প্রতি মৌসুমে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য হয় এবং কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সৃষ্টি হয় কর্মসংস্থানের সুযোগ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিপণ্যের মতো কাঞ্চননগরের পেয়ারাও এখন একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করছে। এই সুনাম ধরে রাখতে প্রয়োজন উন্নত চাষাবাদ, মানসম্মত সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ। যথাযথ পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কাঞ্চননগরের পেয়ারা দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি লাভ করতে পারে। তাই এই পেয়ারা শুধু সুস্বাদু একটি ফল নয়, চট্টগ্রামের কৃষিঐতিহ্য, মানুষের পরিশ্রম এবং সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক, চট্টগ্রাম বন্ধুসভা