যে ঝরনায় পৌঁছাতে হলে আগে নিজেকে জয় করতে হয়

হাম হাম ঝরনায় আমরা সবাই।

বাঁশের লাঠিটা শক্ত করে ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। হাঁটুর ওপরে উঠে এসেছে পাহাড়ি ঝিরির ঘোলা পানি। বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। চারপাশে শুধু পানির শব্দ—ঝিরির, বৃষ্টির,আর দূরের অচেনা পাখির ডাক। পা ফেলার আগেই বুঝতে হচ্ছে, নিচে পাথর নাকি কাদা। এক মুহূর্তের ভুল মানেই পা পিছলে পড়ে যাওয়া।
তখনো জানতাম না, সামনে অপেক্ষা করছে এমন এক জলপ্রপাত, যার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ কয়েক মুহূর্তের জন্য বাক্‌রুদ্ধ হয়ে যায়।

আমাদের যাত্রা শুরু হয় শ্রীমঙ্গলের এক বৃষ্টিভেজা সকাল থেকে। আমরা ছয়জন। ঢাকা থেকে পাঁচজন। আর সিলেট থেকে এসে শ্রীমঙ্গলে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন আশফাক আদি ভাই। সকালের নাশতা শেষ করতেই ঝুম বৃষ্টি নামে। অনেকেই এমন দিনে ট্রেকিং পরিকল্পনা বাতিল করেন। কিন্তু হাম হামের পথে বৃষ্টি যেন বাধা নয়, বরং ভ্রমণেরই এক রোমাঞ্চকর চরিত্র।

বর্ষাকালে হাম হাম ঝরনায় এমন সৌন্দর্য থাকে।

স্থানীয় একজন গাইডকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হলো পথচলা। শুরুতে পথটা নিরীহ মনে হয়। কয়েক মিনিট পরই বোঝা যায়, এই পথ কাউকে সহজে গ্রহণ করে না। কখনো কোমরসমান ঝিরির স্রোত, কখনো কাদামাখা সরু পাহাড়ি পথ, কখনো বিশাল বাঁশঝাড়ের ভেতর অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো ট্রেইল। কোথাও আবার শ্যাওলা ধরা পাথরের ওপর পা রাখতে হয় নিশ্বাস আটকে। চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। মনে হচ্ছিল, আমরা যেন কোনো সিনেমার দৃশ্যের ভেতর হাঁটছি। দুই পাশে পাহাড়, মাঝখানে সরু ঝিরি। মাথার ওপর বাঁশ একে অন্যের গায়ে হেলে সবুজ ছাউনি তৈরি করেছে। মাঝেমধ্যে কুয়াশা নেমে এসে পুরো পথটাকেই রহস্যময় করে তুলছিল।

পাহাড় শুধু সৌন্দর্য দেখায় না, পরীক্ষাও নেয়। এই পরীক্ষার একটি অদৃশ্য অংশের মুখোমুখি হলাম মাঝপথেই। মেঘার পায়ে হঠাৎ করে কয়েকটি জোঁক আক্রমণ করে বসে। প্রথমে দুটো জোঁক চোখে পড়ে—সেগুলো সাবধানে সরিয়ে ফেলা হলো। ভেবেছিলাম, বিষয়টা সেখানেই শেষ।
কিন্তু ট্রেকিং শেষ করে ঝরনা দেখে ফিরে এসে যখন ফ্রেশ হচ্ছি, তখনই ধরা পড়ল আসল ঘটনা। হাঁটুর ওপর আরও দুটি জোঁক তখনো লেগে ছিল—যেগুলো পুরো পথেই নীরবে রক্ত শুষে নিয়েছে। ততক্ষণে বেশ খানিকটা রক্তক্ষরণ হয়ে গেছে। ভিজে শরীর, ক্লান্তি আর হঠাৎ দেখা সেই রক্ত—মুহূর্তেই বুঝিয়ে দিল, এই ভ্রমণ শুধু সৌন্দর্যের নয়, সতর্কতারও।

ঝরনায় যেতে প্রায় আড়াই ঘণ্টার ট্রেকিং করতে হয়।

প্রায় আড়াই ঘণ্টার ট্রেকিংয়ে কয়েকবার থেমেছি। ছোট ছোট টিনের ছাউনি দেওয়া দোকানে গরম চা খেয়েছি, ভিজে জামাকাপড়ে একটু দম নিয়েছি। আবার হাঁটা শুরু করেছি।
শরীর তখন ক্লান্ত। হাঁটু ভারী হয়ে এসেছে। মনে হচ্ছিল, ঝরনা বুঝি আর আসবেই না। হঠাৎ করেই দূর থেকে ভেসে এল বিশাল জলরাশির শব্দ। আর কয়েক মিনিট এগোতেই সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে হাম হামের সাদা জলরাশি চোখের সামনে নেমে এল। মুহূর্তেই সব ক্লান্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

প্রায় ১৩৫ ফুট ওপর থেকে জল আছড়ে পড়ছে নিচে। বাতাসে উড়ে আসা পানির ফোঁটা মুখে এসে লাগছে। এত শব্দ, অথচ অদ্ভুত এক নীরবতা। কেউ ছবি তুলছে। কেউ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ আবার শুধু তাকিয়ে আছে।

হাম হামের আসল সৌন্দর্য হয়তো ঝরনায় নয়। বরং সেখানে পৌঁছানোর প্রতিটি পদক্ষেপে। এই পথ আপনাকে ধৈর্য শেখায়। সতর্কতা শেখায়। বন্ধুত্ব শেখায়। আর শেখায় প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর উপহারগুলো পেতে হলে একটু কষ্ট করতেই হয়।

এই ঝিরি দিয়ে প্রায় বিশ মিনিটের মতো হাঁটতে হয়।

হাম হাম ঝরনায় যাওয়ার আগে যা জানবেন
বর্ষাকালে হাম হামের পথ সবচেয়ে সুন্দর, আবার সবচেয়ে বিপজ্জনকও। তাই প্রস্তুতি নিয়েই বের হওয়া ভালো।

সঙ্গে যা রাখবেন
ভালো গ্রিপযুক্ত ট্রেকিং জুতা বা স্যান্ডেল
বাঁশের লাঠি (স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়)
রেইনকোট (যদি বৃষ্টিতে ভিজতে না চান)
জলরোধী ব্যাগ কভার
মুঠোফোনের জন্য ওয়াটারপ্রুফ পাউচ
পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি
শুকনা খাবার, চকলেট বা এনার্জি বার
অতিরিক্ত পোশাক
ছোট ফার্স্টএইড কিট

পিচ্ছিল পথ পাড়ি দিয়ে ঝরনায় পৌঁছাতে হয়।

জোঁক লেগে গেলে কী করবেন
বর্ষাকালে হাম হামে জোঁক খুবই স্বাভাবিক।
আতঙ্কিত হবেন না।
জোর করে টানবেন না।
লবণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান-পানি লাগালে জোঁক নিজে থেকেই ছেড়ে দেয়।
ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে জীবাণুনাশক লাগান।
কিছুক্ষণ রক্ত পড়া স্বাভাবিক।

হাম হাম এমন এক যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পা ফেলার সঙ্গে মিশে থাকে অনিশ্চয়তা, রোমাঞ্চ আর প্রকৃতির প্রতি নতুন করে মুগ্ধ হওয়ার গল্প। তাই হয়তো ফিরে আসার পরও ঝরনার গর্জন কানে বাজে, আর ভেজা বাঁশবনের গন্ধ অনেক দিন পর্যন্ত সঙ্গ ছাড়ে না।