ব্রহ্মপুত্রের কোলে এক বিকেল
সাপ্তাহিক ছুটির দিন মানেই নাগরিক ক্লান্তি ভুলে খানিকটা সময়ের জন্য প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া। আমরা দুই বন্ধু সম্প্রতি গিয়েছিলাম ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পার্কে। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত এই নয়নাভিরাম উদ্যানে হঠাৎ সিদ্ধান্তে আমাদের যাত্রা।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নামকরণ করা পার্কটি গড়ে উঠেছে শহরের বুক চিরে বয়ে চলা পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের তীর ঘেঁষে, কাচারিঘাট এলাকায়। নদের পাড় ধরে প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত এই উদ্যান দীর্ঘদিন ময়মনসিংহবাসীর প্রাণকেন্দ্র। সবুজ গাছগাছালি, সারি সারি বেঞ্চ, শিশুদের জন্য নানা রাইড আর নদের উন্মুক্ত পাড়—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি পার্ক নয়, শহরের নিশ্বাস নেওয়ার জায়গা।
ছুটির দিন হওয়ায় পার্কে ঢুকেই চোখে পড়ল সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়। চেনা শহরের বুকে যেন একটুকরা প্রাণের মেলা।
পার্কের সবুজ চত্বর পেরিয়ে এগোলাম ঘাটের দিকে। নদের বুকে ভাসমান রঙিন পাল তোলা ডিঙিনৌকার সারি আর পর্যটকদের আনন্দমুখর কোলাহল পরিবেশটাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। আমরাও একটি নৌকা ভাড়া করে পাড়ি জমালাম নদের ওপাড়ে। নদের মাঝখানে পৌঁছাতেই মনে হলো, নীল আকাশ আর শান্ত জলরাশি যেন কোনো এক রহস্যময় বিন্দুতে মিলে গেছে। দূরে শহরের কোলাহল ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে, বাতাসের সতেজ ছোঁয়া মুহূর্তেই মনকে শান্ত করে দেয়।
পারাপারের ফাঁকে ফাঁকে চলল স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের সঙ্গে পোড়া রুটির স্বাদটা ছিল একেবারেই অন্য রকম, সঙ্গে আড্ডার সঙ্গী হয়ে রইল ফুচকা আর ঝালমুড়ি। পার্কজুড়েই যেন একটা মেলার আবহ—নাগরদোলা, বেলুন খেলা, শিশুদের খেলনার পসরা মিলিয়ে পরিবেশটা সব সময়ই উৎসবমুখর থাকে। সন্ধ্যা নামলেই কাচারিঘাট থেকে পার্কের ভেতর দিয়ে বসানো আলোকসজ্জা যেন নদের পাড়কে সাজিয়ে তোলে অন্য এক রূপে।
ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মুহূর্তটি অপেক্ষা করছিল দিনের শেষ ভাগে। সন্ধ্যায় সূর্য যখন ধীরে ধীরে ব্রহ্মপুত্রের বুকে ঢলে পড়ছিল, তখন নদের তীরে বসে সেই রক্তিম সূর্যাস্ত দেখার অনুভূতি শব্দে প্রকাশ করা কঠিন। গোধূলির সোনালি আলোয় নদের জল আর চারপাশের প্রকৃতি এক অপরূপ মায়াবী রূপ ধারণ করে।
সময় থাকলে পার্ক লাগোয়া শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালাটিও ঘুরে দেখা যায়। যেখানে সংরক্ষিত আছে এই কিংবদন্তি চিত্রশিল্পীর বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম। কাছেই আছে শশীলজ ও আলেকজান্ডার ক্যাসেলের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। চাইলে একই দিনে ইতিহাসের সঙ্গেও খানিকটা সময় কাটিয়ে নিতে পারেন।
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়