তারুণ্যের শক্তিতে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
তারুণ্য একটি শক্তি। যে শক্তিকে অবদমিত করা যায় না। থামিয়ে দেওয়া যায় না। সব তরুণের নেতা হওয়ার যোগ্যতা আছে। কোনো না কোনো ক্ষেত্রে সে নেতা। নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে তরুণদের হতে হয় সবার। ঈর্ষণীয় সাফল্য রয়েছে এ দেশের তারুণ্যের। তারা সচেতন। উন্নয়ন, প্রযুক্তি, বিনোদন, রাজনীতি, অর্থনীতি—সবই আছে তাদের ভাবনায়। বিশ্ব তাদের মুঠোয়। জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যে তারা অতুলনীয়। দেশে পাঁচ কোটির বেশি তরুণ-তরুণী এখন।
হাজার হাজার মোধাবী শিক্ষার্থী প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশংসনীয় ফলাফল করে। কয়েক লাখ তরুণ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। নানা ক্ষেত্রে তারা সৃজনশীল! বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশে- বিদেশে আলো ছড়ানো তাদের ঈর্ষণীয় সাফল্যের কথা লেখা হয় খবরের কাগজে। প্রায় সব ক্ষেত্রে তরুণেরা জয়ী হচ্ছে। যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশের তারুণ্য এখন অনেক বেশি স্মার্ট। আর এই তারুণ্যই দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
পেছনে ফিরলে চোখে পড়ে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের তারুণ্য ব্যাপকভাবে রাজনীতিতে যুক্ত ছিল। শুধু তা-ই নয়, ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে ছিল তারুণ্যের ভূমিকা। ভাষাসংগ্রাম থেকে আজ পর্যন্ত সব আন্দোলনে তারা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নূর হোসেন, সেলিম, দিপালী, দেলোয়ার, তাজুল ও বসুনিয়াদের জীবন উৎসর্গের কথা। এখনো দগদগে রয়েছে চব্বিশের জুলাই গণ- অভ্যুত্থানের মৃত্যুর মিছিল। সমাজকে ঝাঁকুনি দেওয়ার জন্য তারুণ্যের বিকল্প নেই। অফুরন্ত মানবিক শক্তি নিয়ে শত্রুকে পরাজিত করে তারুণ্য। জন্ম দেয় এক নতুন ভোরের। নতুন সময়ের। জন্ম দেয় নিজেকেই।
মালয়েশিয়ার অবস্থা একসময় বাংলাদেশের চেয়েও খারাপ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের কাছে বিধ্বস্ত দক্ষিণ কোরিয়াও আজ উন্নয়নের শিখরে। নানা সংকট মাথায় নিয়ে আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি। এই অগ্রযাত্রা আরও বেশি গতিশীল হবে তখন, যখন তরুণেরা আরও বেশি অগ্রসর হবে। এটি তারুণ্যের মূল্যবোধের দায়, মানবতার দায়, গণতন্ত্রের দায়। কেননা স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পর পেছনে ফিরে তাকালে হতাশ হতে হয়। আজও জীবনযাপনের জন্য একটি নৈতিক, মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ নির্মিত হয়নি। কিছু উঁচু ভবন, রাস্তাঘাট তৈরি হলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। জীবনের জন্য একটি বাসযোগ্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তুলতে হয়। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে হয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদাকে। আর এই ভাবনা থেকে দেশের জন্য কাজ করতে হয়। তা না হলে পিছিয়ে পড়তে হবে। পেছনে থেকে সামনের দৃশ্য দেখা যাবে; কিন্তু কখনো সামনে যাওয়া যাবে না।
ষাটের দশকের একটি কবিতার পক্তি মনে পড়ছে, ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং তার পরের সব সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল ও দেয়াললিখনে হেলাল হাফিজের বিখ্যাত কবিতার এ পঙ্ক্তিটি ব্যাপক ব্যবহৃত হয়েছে। কবিতাটিতে তারুণ্যের ক্ষমতা মহাশক্তি হিসেবে চিত্রিত হয়েছে। তারুণ্যের ক্ষমতা অসীম। অদমনীয় সাহস আর অসীম শক্তিতে তরুণেরাই নির্মাণ করতে পারে দুর্নীতিমুক্ত, লুটপাটহীন মানবিক ভবিষ্যৎ।
ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সব বড় অর্জনে তারুণ্যের অবদান রয়েছে। কবিতা, গানে, গল্পে কবি-লেখকেরাও করেছেন তারুণ্যের জয়গান। নজরুল লিখেছেন, ‘থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, 'ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা / আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা'। বাংলাদেশের মুসা ইব্রাহীম, নিশাত মজুমদার, ওয়াসফিয়া নাজরীনরা দেখিয়েছেন স্বপ্ন আর সাহসের বলীয়ানে কত দূর যাওয়া সম্ভব।
তরুণদের মাথায় রাখতে হবে, প্রকৃত ভালোবাসা কখনো সুবিধা দেয় না। তাই দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসাকে পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব থেকে মুক্তি দিতে হবে। সত্যিকার তারুণ্য অন্যের বেঁচে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করে। ভুলে গেলে চলবে না, তারুণ্য সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারের পতাকাবাহী। আর আসাদ-জোহা-মতিউরের রক্ত শপথে বলীয়ান। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে অনেক সময় নিষ্ঠুর হতে হয়। প্রচণ্ড আঘাতে আঘাত করতে হয়। অনেকে এটা সহ্য করতে পারে না। নিষ্ঠুরতা বলে দোষারোপ করে। কিন্তু বৃহত্তর কল্যাণে কখনো কখনো নিষ্ঠুর হতে হয়। পাশাপাশি এই ধারণা থাকাও জরুরি যে মানুষ তার আপন উন্নতি দিয়েই নিজেকে ছাড়িয়ে যায়। এভাবে সে বড় হয়ে ওঠে। তাই তারুণ্যের প্রধান কাজ হলো নিজেকে সমৃদ্ধ করা। পেছনের কোনো ঘটনায় দুঃখ না পেয়ে বর্তমানকে সুন্দর করা। আজকে যেটা সত্যি কালকে সেটা সত্যি না-ও থাকতে পারে। তবে আজকের সত্যিটাই জীবনকে বদলে দিতে পারে। বিশেষ কিছু করতে হলে বিশেষ হতে হবে, এ ধারণাও ঠিক নয়। যেকোনো মানুষই তার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অসম্ভবকে জয় করতে পারে।
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেনের মতে, ‘বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে।’ বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক উন্নয়ন, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন— এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারত থেকে এগিয়ে। বাংলাদেশের কৃষক দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে ফলাচ্ছেন সোনার ফসল। পোশাকশিল্পের নারীরা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা এনে দিচ্ছেন। দেশের নারী-পুরুষেরা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছেন। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তাই তারুণ্যের নীরবতার জন্য যেন অগ্রযাত্রার এই অপার সম্ভাবনার মৃত্যু না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তারুণ্য যে সমাজ বদলে দিতে পারে, এটা ঐতিহাসিক সত্য। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ।' আমাদের সৃজনশীল তারুণ্যের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে, ভরসা করতে হবে। আমাদের তারুণ্য হবে আদর্শের, শক্তির, শান্তির ও ভালোবাসার প্রতীক। তাদের হাতেই আমাদের স্বপ্ন, তাদের হাতেই রচিত হবে বৈষম্যহীন, মানবিক মাতৃভূমির স্বপ্ন। তারুণ্যের শক্তিতেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।