বিদায় দিয়ে উঠে পড়লাম বিমানে। বিমানে ওঠার পর শুধু তার মুখচ্ছবি ভাসছিল, তার দুষ্টুমি, ভালোবাসা, রাগ, জেদ সবটা নিয়ে চলে যাচ্ছি।
দেশে এসেছি দুই মাস হয়ে গেল। ফেরার সময় হয়ে এসেছে। এই দুই মাসে মায়াবতীকে নিজের করে নিতে পেরেছি, কাছে পেয়েছি নিজের মতো করে। সময়টা কি রঙিন ছিল! তাকে বধূবেশে দেখার স্বপ্নটা অনেক দিনের, তা শেষমেশ মিটল। নেমন্তন্ন আর সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে ভালোমতো কাছে বসে কথা বলার সময়ই ছিল না ঠিক। দিন যত ঘনিয়ে এসেছে যাওয়ার, তার কান্নার রেশ বেড়েছে, মন যখন তখন খারাপ করছে।
এদিকে তার বিষণ্নতা দেখে আমার অস্থির লাগছে। কিন্তু বিধি বাম! বাস্তবতার বেড়াজালে বন্দী আমি। মায়াবতী ঠিক ছলছল ঝরনার মতো যখন অট্টহাস্যে হাসে, আবার শান্ত শুভ্র মেঘের মতো যখন তার সত্যি মন খারাপ হয়; সে কখনো কুয়াশার চাদরের মতো শীতল, আবার উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ভীষণ তেজি। মানভঞ্জন না করলে সে রেগে আগুনের ফুলকির মতো হয়ে যায়, আবার রাগের পারদের মাত্রা কমে গেলে সে হয় আমার কমলিকা। প্রেম-ভালোবাসায় টইটম্বুর একেবারে! তাই এবারের ফেরাটা অনেক কঠিন।
উড়াল দেওয়ার জন্য ঢাকায় এসে পৌঁছাই এক দিন আগে, সঙ্গে মা-বাবা আর মায়াবতী। ধীরে ধীরে তার মন খারাপের মাত্রা তীব্র হচ্ছে, কিন্তু খুব কষ্টে চেপে আছে কান্না। ফ্লাইটের দিন সকালে আমার প্রিয় খাবার খাওয়ানোর জন্য একদম উঠেপড়ে লাগে। দুপুরে মাটন বিরিয়ানি খাওয়াল। সময় ঘনিয়ে সন্ধে হয়ে এল। বিষণ্নতা আমাকেও তখন ঘিরে ধরেছে। তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আমার ফেরাকে বারবার কঠিন করে তোলে। অবশেষে সেই সময় চলেই এল।
বিদায় দিয়ে উঠে পড়লাম বিমানে। বিমানে ওঠার পর শুধু তার মুখচ্ছবি ভাসছিল, তার দুষ্টুমি, ভালোবাসা, রাগ, জেদ সবটা নিয়ে চলে যাচ্ছি। আমার উত্থান-পতনে পরিবারের পাশাপাশি শক্ত হয়ে পাশে ছিল সে। ভাঙতে দেয়নি আমাকে, হাতটুকু ছাড়েনি।
আবার দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা! জানি সে ঘড়ির কাঁটা গুনে গুনে দেখবে আমার ফেরার ঘড়ি কবে বেজে উঠবে। দুজন একসঙ্গে বসে চা খেতে খেতে হয়তো হাসব এই দিনগুলোর জন্য, আর বলব একে অপরকে সেই দুটি প্রিয় লাইন—
‘স্নিগ্ধ বিকেলে চায়ের আলাপে, তুমি আমি পাশাপাশি
আলাপ হবে, তর্ক হবে, কে কারে কত বেশি ভালোবাসি’
পিএইচডি গবেষক, চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া