দাদুরা বুঝি এমনই হন
সবুজের বুক চিরে ঝকঝক করে বাড়ির পথে এগিয়ে চলেছে ট্রেন। আনমনে জানালার দিকে তাকিয়ে সবুজের ছুটে চলা দেখছি। সদ্য ধোয়া রাস্তার পাশে শুকাতে দেওয়া পাটের গন্ধ এসে নাকে লাগছে। চোখ বন্ধ করে সেই গন্ধ গভীর শ্বাসে টেনে নিচ্ছি বুকের ভেতর। কেন জানি না, এই গন্ধটা আমার ভীষণ পছন্দের। হতে পারে ছেলেবেলার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকার কারণেই এই ভালো লাগা।
এই সময়টাতে আমাদের স্কুলের মাঠে বাঁশের আড় পেতে তাতে পাট শুকাতে দেওয়া হতো। মাঠের প্রায় অধিকাংশ জায়গা দখল করে রাখত পাটকাঠির ছোট ছোট ঘর। পাটকাঠির আঁটিগুলো এভাবে গোল গোল করে ছড়িয়ে শুকাতে দেওয়া হতো; দেখতে দক্ষিণ আফ্রিকার জুলু উপজাতির ঐতিহ্যবাহী ‘রন্ডাভেল’ কুঁড়েঘরের মতো মনে হতো।
স্কুল শেষে সহপাঠীরা মিলে সেই পাটকাঠির ঘরে গিয়ে খেলা করতাম। সবার আলাদা আলাদা ঘর থাকত। আড়ে শুকাতে দেওয়া পাটের আড়ালে লুকোচুরি খেলতাম। ঝাঁকে ঝাঁকে গঙ্গা ফড়িংয়ের দল আমাদের খেলায় শামিল হতো। খানিক সময় লুকোচুরি খেলতাম তো খানিক সময় ফড়িংয়ের পেছনে ছুটতাম। কী সব বাহারি রঙের ফড়িং ছিল! কী গাঢ় সে রং! দেখে মনে হতো এইমাত্রই কেউ বুঝি ওদের গা রাঙিয়ে দিয়েছে।
ছোটাছুটি করতে গিয়ে ভেজা পাটের আঁশ এসে নাকে মুখে লাগত। সেই গন্ধ আজও মনে গেঁথে আছে।
দাদুও আমাকে ছাড়তে চান না। যেন তাঁর সঙ্গে আরও বেশি সময় থাকি। তাই তিনি এটা-ওটা কাজ খুঁজে বের করেন। বলেন, ‘দ্যাহো, আমার নখটি কত বড় অইছে, এগুলা কাইটা দেও তো।’
ট্রেন ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হকারদের হাঁকডাকে ট্রেনের ভেতর গমগম করছে। কল্পনার স্কুলমাঠ ছেড়ে যাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের গল্প পড়ার চেষ্টা করছি। প্রত্যেক মানুষ খোলা বইয়ের মতো। মুখের দিকে তাকিয়ে তাঁদের গল্প পড়তে ভীষণ ভালো লাগে। বাড়িতে গিয়ে কে কী করবে, সেসব নিয়ে তারা আলোচনা করছে। প্রায় সবার চোখ-মুখেই বাড়ি ফেরার উচ্ছ্বাস। কিন্তু আমার মধ্যে এর ছিটেফোঁটাও টের পাচ্ছি না। মা চলে যাওয়ার পর এখন আর বাড়ি যাওয়ার জন্য আমার মন কেমন করে না। কোনো পরিকল্পনা থাকে না। কোনো উত্তেজনাও কাজ করে না।
আমি আসলে যেতেই চাই না বাড়ি। কিন্তু দাদুর (দাদি) জন্য না গিয়ে পারি না। মা-আব্বা চলে যাওয়ার পর এই মানুষটিই আমার খোঁজখবর রাখেন। ফোন করে কথা বলেন। আমি না ফোন করলে অভিমান করেন। বাড়ি গেলে মাথায়-শরীরে হাত বুলিয়ে ঝরঝর চোখের পানি ফেলে বাচ্চাদের মতো কাঁদেন। সবকিছু উপেক্ষা করতে পারলেও তাঁর এই নির্ভেজাল ভালোবাসা উপেক্ষা করার শক্তি সৃষ্টিকর্তা আমাকে দেননি। এই যে বাড়ি যাচ্ছি, এটা আসলে তাঁর জন্যই যাচ্ছি।
বাড়িতে যাওয়ার পর তিনি কী যে খুশি হন! কী রেখে কী খেতে দেবেন—সে এক এলাহি কাণ্ড! মিটসেফ থেকে বিস্কুট-চানাচুর বের করে আনবেন, আলমারি থেকে আমার পছন্দের আচারের বয়াম টেনে নামাবেন, ফ্রিজে আমার জন্য ফ্রোজেন করে রাখা গাছের লিচু, ফালি করে রাখা আম—সবকিছু এনে সামনে রাখবেন। তারপর বলবেন, ‘এহন খাও।’ যদি বলি, ‘এত খাবার একসঙ্গে কীভাবে খাব? রেখে দিই, পরে খেয়ে নেব।’ তাঁর এক কথা—‘না, তুমি আমার সামনে বইসা খাও। না হইলে পরে ভুইলা যাইবা আর খাইবা না।’ আমি তাঁর মায়া জড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে কান্না লুকিয়ে মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে বলি, ‘তুমি এই মানুষটিকে আরও হাজার বছর আয়ু দান করো।’
আমাদের বাড়িটা বেশ পুরোনো। একটা সময় পুরো বাড়িটা অনেক প্রাচীন গাছ দিয়ে ঠাসা ছিল। ছেলেবেলায় পাখিদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব গাছে চড়ে বেড়িয়েছি, ফল পেড়ে খেয়েছি। কত স্মৃতি ছিল গাছগুলোর সঙ্গে! বাড়ি সংস্কারের সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবেই অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। যে কাজের অজুহাতে গাছগুলো কাটা হয়েছে, সেই কাজ গাছ না কেটেই করা যেত। যাহোক, আমার দাদু তাঁর ছেলেদের সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ করেই একটা আমগাছের জীবন রক্ষা করতে পেরেছেন। প্রতিবছর সেই গাছ প্রতিদানস্বরূপ ফল দিয়ে ভরিয়ে দেয় আমাদের।
কোরবানির ঈদে বাড়ি গিয়ে দেখি, গাছে কাঁচা-পাকা বেশ কিছু আম আছে। একটা বাঁশের কোটা (লগি) নিয়ে আম পাড়ছিলাম খাওয়ার জন্য। তখন আমার আম্মু (কাকি) হেসে হেসে বললেন, ‘আম পেড়ে খান। আপনার দাদু আপনার জন্য কাউকে গাছের আম পাড়তে দেননি। বলেছেন, পাড়লে তো সব আম তাড়াতাড়ি শ্যাষ হইয়া যাইব। আর না পাড়লে পাইকা গিয়া যা পড়ব, তা কুড়াইয়া খাইলে আপনি বাড়িতে আসা পর্যন্ত গাছে আম কিছু হলেও থাইকা যাইব। আপনি এসেছেন, এখন আমরা সবাই আম পেড়ে খেতে পারব। আর কোনো বাধা নেই।’
স্বার্থপর এই পৃথিবীতে নির্মল ভালোবাসার মানুষ ছাড়া এমন চিন্তা আর কে করতে পারে?
দাদু কিছুদিন আগে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে অ্যাসিটাবুলাম (হিপ সকেট) ভেঙে গিয়েছে। কৃত্রিম লাগালেও খুব একটা হাঁটতে পারেন না। ঘর আর বারান্দাতেই এখন তাঁর বেশি সময় কাটে। মাঝেমধ্যে খুব বেশি ইচ্ছা করলে লাঠিতে ভর দিয়ে উঠানে হেঁটে বেড়ান। তাঁর রুমে গেলে তিনি আগের মতো এটা-ওটা বের করে দিতে না পারলেও শুয়ে শুয়ে বলতে থাকেন, ‘দ্যাহো, মিটসেফের উপ্রে নীল রঙ্গের একটা বাক্স আছে, সেইহানে তোমার লিগা মিষ্টি আছে, খাও। আলমারির তাকে সাদা রঙ্গের নেটের ব্যাগে তোমার লিগা আঙুর রাখছি, খাইয়া দ্যাহো কী মিষ্টি! টেবিলের নিচে আমার পানের বাটায় দ্যাহো বরই আছে, তোমার ছোট ফুফা নিয়া আইছিল, আমি তোমার জন্য আলাদা কইরা তুইলা রাখছি।’
আমি এসব বের করে দাদুর মাথার পাশে বসে খেতে খেতে দাদুর সঙ্গে কথা বলি। আনন্দ-অশ্রুতে আমার চোখ ভেসে যাওয়ার উপক্রম হয়। দাদুকে সে জল দেখতে দিই না। কথা বলতে বলতে শার্টের হাতায় মুছে ফেলি।
দাদুও আমাকে ছাড়তে চান না। যেন তাঁর সঙ্গে আরও বেশি সময় থাকি। তাই তিনি এটা-ওটা কাজ খুঁজে বের করেন। বলেন, ‘দ্যাহো, আমার নখটি কত বড় অইছে, এগুলা কাইটা দেও তো।’
তাঁর হাতে-পায়ে হাত দিয়ে দেখি নখ ছোটই আছে—হয়তো দু-এক দিন আগেই কেউ কেটে দিয়েছে। আমি নেইল কাটার হাতে নিয়ে সেই নখই কেটে দেওয়ার ভান করি। আবার কখনো মাথাভর্তি তেল থাকার পরেও বলেন, ‘আমার চান্দিডা গরম হইয়া আছে, একটু কদুর ত্যাল দিয়া দেও।’
আমি তেলভরা মাথায় হাত বুলিয়ে চুলগুলো আলতো করে টেনে দিই। দাদু তৃপ্তি নিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকেন।
কখনো কখনো আমি নিজেই দাদুর কপালে হাত দিয়ে বলি, ‘দাদু, তোমার তো কপালের পাশের রগ লাফাচ্ছে, মাথা ব্যথা করছে তাই না? দাঁড়াও, বাম লাগিয়ে মাথা টিপে দিই।’
দাদু মাথা নাড়েন। আমি মাথা টিপে দিতেই তিনি ঘুমিয়ে যান। এটা আমার ভীষণ ভালো লাগে। ঘুমালে দাদুকে কী যে মায়াবী লাগে দেখতে!
ঈদের ছুটি শেষে যেদিন চলে আসছিলাম, দাদু বারান্দায় কাউচে শুয়ে ছিলেন। এই কাউচটা দাদার জন্য ফরমাশ দিয়ে বিশেষ করে বানানো হয়েছিল। তিনি শেষ জীবনের অনেকটা সময় এখানে শুয়ে কাটিয়েছেন। দাদা চলে যাওয়ার পর এখন দাদু এই জায়গাটাকে আপন করে নিয়েছেন। হয়তো দাদার গন্ধ খুঁজে পান এখানে।
কাঁধে ব্যাগ দেখে দাদু বুঝে ফেললেন আমি চলে যাচ্ছি। মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তাঁর চোখ বর্ষার ভরা নদী হয়ে আছে; যেকোনো সময় পানি উপচে পড়ে আশপাশের সবকিছু ভাসিয়ে দেবে। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দাদুকে বললাম, ‘চলে যাচ্ছি, ভালো থেকো আর ঠিকমতো খাবার খেয়ো।’ দাদুও আমাকে বললেন, ‘তুমিও ঠিকমতো খাইয়ো, কারও সঙ্গে ঝামেলা কোইরো না, রাত জাইগো না, মন খারাপ কইরা থাইকো না, আর মাঝে মাঝে ভিডিও কল দিয়ো। তোমার লিগা কিছু আম কুড়াইয়া রাখছি আর কিছু কাঁঠালের বিচি শুকাইয়া রাখছি, তোমার ছোট আম্মুর (কাকি) কাছ থিকা নিয়া যাও।’
একদিন ফোনে কথা বলার সময় কাঁঠালের বিচির কথা বলেছিলাম। সেটা দাদু মনে রেখে আমার জন্য এগুলো জমিয়ে রেখেছেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে লাঠিতে ভর করে আমার জন্য আম কুড়িয়েছেন! এসব ভেবে চোখের কার্নিশ ডুবে যাওয়ার অবস্থা। দাদু কান্না দেখে ফেলবেন—এই ভয়ে আম্মুর কাছ থেকে সেগুলো নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম।
ছেলেবেলার অনেকটা সময় দাদুর সঙ্গে কেটেছে। মা অসুস্থ থাকার কারণে দাদুই আমার দেখভাল করতেন, আগলে রাখতেন। কেউ কিছু বললে চিলের মতো উড়ে এসে রক্ষা করতেন। দাদুর জন্য আব্বাও খুব একটা শাসন করতে পারতেন না। গায়ে হাত তুললেই দাদু এসে আব্বাকে বকাঝকা করতেন। যেখানে যেতেন, সেখানেই সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। আমিও দাদুকে চোখে হারাতাম। কিছু সময় না দেখলে উঠানে গড়াগড়ি করে কান্না করতাম। এসব নিয়ে আমাদের প্রতিবেশীরা কী যে হাসাহাসি করতেন! এখনো তাঁরা এসব নিয়ে আমার সঙ্গে মজা করেন।
আব্বা-আম্মা চলে যাওয়ার পর মনে হতো, আমার আর হারানোর কিছু রইল না। এখন আর কোনো কিছু হারানোর ভয় নেই আমার। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দাদুকে হারানোর ভয় আমাকে গ্রাস করল। প্রতিমুহূর্তে মানুষটাকে হারানোর ভয়ে থাকি এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থনা করি—তিনি যেন দাদুকে সুস্থভাবে আরও অনেক অনেক বছর বাঁচিয়ে রাখেন।