একুশে বইমেলায় এক দিনে যা দেখলাম

অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে শিশু–কিশোরদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণীছবি: লেখক

অমর একুশে বইমেলা ২০২৬, শেষ হওয়ার দুই দিন আগে, অর্থাৎ ১৩ মার্চ শুক্রবার, বইমেলায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে নরসিংদী স্টেশন গিয়ে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় কিছুক্ষণ। তারপর তিতাস কমিউটার ট্রেন এল। সেই ট্রেনে করে ঢাকা গিয়ে তেজগাঁও স্টেশন নামলাম। সেখান থেকে হেঁটে ফার্মগেট, তারপর বাসে শাহবাগ, আবার হেঁটে বাংলা একাডেমিতে গেলাম।

বেলা ১১টায় যখন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রবেশ করি, তখন বইমেলার জন্য আয়োজন করা মঞ্চে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম। অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে শিশু–কিশোরদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ছিল—কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, চিত্রাঙ্কন ইত্যাদি। সেগুলোতে যারা বিজয়ী হয়েছিল, তাদের পুরস্কার দেওয়া হচ্ছিল। ক্রেস্ট, সার্টিফিকেট ছাড়াও অনেকগুলো করে বই দেওয়া হয়। আর সংগীতে যারা বিজয়ী হয়েছিল, তাদের প্রত্যেককে দেখলাম উপরিউক্ত জিনিসগুলো ছাড়াও অতিরিক্ত একটি করে হারমোনিয়াম দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির সচিব মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) মামুন আহমেদ। সভাপতি হিসেবে ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম। ওনার বক্তব্যের একটা অংশ ভালো লেগেছে। তিনি বলছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আরও উন্নত হওয়া প্রয়োজন। উন্নত দৃশ্যভঙ্গির অভাবে সাহিত্যচর্চা কোথাও কোথাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোথাও মানুষ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। সে জন্য বইমেলা ও শিশু–কিশোরদের নিয়ে এমন সাহিত্য আয়োজন আরও বেশি বেশি করা দরকার।’

অনুষ্ঠান দেখা শেষে বইমেলাতে ঘোরাঘুরি করি। ইচ্ছা করেই শুক্রবার সকালে গিয়েছিলাম। এই সময় ভিড় কম থাকে। বাংলা একাডেমি আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মিলে যে কয়েকটা স্টল দেওয়া হয়েছিল, প্রায়ই প্রতিটি বইয়ের স্টলেই গিয়েছি। চেষ্টা করেছি সময় নিয়ে দেখার। নতুন অনেক বইয়ের পাশাপাশি পুরোনো জনপ্রিয় বইগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য। রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, সমরেশ, বিভূতিভূষণ, হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবালের মতো জনপ্রিয় লেখকদের বইয়ের পাশাপাশি সাদাত হোসাইন, আনিসুল হক ও নতুন যাঁরা দীর্ঘদিন লেখালেখি ভালো করছেন, তাঁদের বই দেখা গেছে।

শিশুদের কথা চিন্তা করে পুতুলনাচ ও বয়োস্কোপ দেখার ব্যবস্থাও রাখে বইমেলা কর্তৃপক্ষ।

শীত গিয়ে বসন্ত এলেও সকালের পর দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টা নাগাদ কিছুটা বাতাস ছিল। রৌদ্রের তাপের গরমের সঙ্গে সহনীয় একটা আবহাওয়া ছিল। ঘড়ির কাঁটা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকসমাগম বাড়তে থাকে।

শিশু–কিশোর থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের লোকজনের চলাচল চোখে পড়ার মতো ছিল। শিশুদের কথা চিন্তা করে পুতুলনাচ ও বয়োস্কোপ দেখার ব্যবস্থাও রাখে বইমেলা কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বইয়ের স্টলগুলো থেকে খাবারসহ অন্যান্য যেসব স্টল ছিল, সেগুলো বেশ অতিরঞ্জিত ও ক্রেতা আকর্ষণ করার ক্ষমতা বেশি বলে মনে হয়েছে। যদিও বইয়ের স্টল থেকে সেগুলো সংখ্যায় কম ছিল।

কোথাও কোথাও লেখকের পেছনে অনেকগুলো লোক ছুটে চলেছে। কারও হাতে বই, কারও হাতে মোবাইল, আবার কারও হাতে ক্যামেরা। কেউ বই কিনে অটোগ্রাফ নিচ্ছে লেখক থেকে, কেউ মোবাইল দিয়ে ছবি ও ভিডিও করছে, আবার কেউ ক্যামেরা অন করে ইন্টারভিউ নিচ্ছে। বিভিন্ন স্টলেও পরিচিত লেখকের দেখা গেছে। জনপ্রিয় যে কজন লেখক স্টলে ছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই বইয়ে অটোগ্রাফ আর ইন্টারভিউ দিতে ব্যস্ত ছিলেন।

বই ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম, নতুন বইয়ের সংখ্যা কেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তা বলা মুশকিল। যদিও প্রতিবছর বইমেলায় নতুন বই প্রকাশ পায়, আর মাঝেমধ্যে আগের বছরকে ছাড়িয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির স্টল থেকে প্রতিদিন যেসব নতুন বই মেলায় প্রকাশ পাচ্ছে, সেগুলোর বর্ণনা একটু পরপর ঘোষণা হচ্ছিল। পুরোনো হলেও জনপ্রিয়তা রয়েছে এমন বইয়ের সংখ্যা ভালো ছিল। নতুন বই হয়তো তুলনামূলক কম ছাপা কাগজে এসেছে মেলায়। হয়তো বেশিও হতে পারে, যা আমার চোখে কিংবা পর্যবেক্ষণে পড়েনি। তবে নতুনত্বের মধ্যে আহামরি কিছু নতুন মনে হয়নি।

চারপাশে চলাচল করা যাদের দেখেছি, তাদের অনেকেই বই কিনতে আগ্রহী নয়। একটি বাচ্চা মেয়ে, বয়স হবে পাঁচ–ছয় বছর হবে। সে একটা বই হাতে নিয়ে ভাঙা ভাঙা স্বরে সেটার নাম নিয়ে বলছে, ‘এই বাংলা ছড়া বইটা আমায় কিনে দাও আম্মু, আমি ক্লাসে গিয়ে সবাইকে দেখাব।’ সঙ্গে থাকা শিশুটির মা বললেন, ‘বাসায় অনেক বই আছে তোমার মামণি, এটা লাগবে না। তোমায় বরং একটা আইসক্রিম কিনে খাওয়াব। ওই যে দোকান দেখা যাচ্ছে, চলো।’ কিন্তু বাচ্চাটি যেতে চাচ্ছিল না এবং কান্না করেই যাচ্ছিল, ‘আমার বই লাগবেই, কিনে দাও।’ কিন্তু তার মা তাকে জোর করে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন অন্য স্টলে।

বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত কবি পিয়াস মজিদ ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা আর বইপ্রেমিক তন্ময় তনুর সঙ্গেবাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত কবি পিয়াস মজিদ ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা আর বইপ্রেমিক তন্ময় তনুর সঙ্গে।

আরেকটা স্টলে দাঁড়িয়ে লেখক রণজিৎ বিশ্বাসের লেখা ‘শুদ্ধ বলা শুদ্ধ লেখা’ বইটি দেখছিলাম। এমন সময় পাশে থাকা এক কিশোর ছেলেকে দেখলাম। যে বই তার পছন্দ হচ্ছে, সেটারই ইংরেজি ভার্সন খুঁজছে সে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ বইটা হাতে নিয়ে দোকানদারকে বলছে, ‘এটার ইংলিশ ভার্সন হবে?’ দোকানদার দেখলাম তখনই কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, ‘না, নেই, বাংলা ভার্সনই আছে।’ ছেলেটা মন খারাপ করে তার বাবাকে বলল, ‘আমার এটা ইংলিশ ভার্সনই লাগবে বাবা, বাংলা পড়তে ভালো লাগে না।’ বাবা বললেন, ‘আচ্ছা, অন্য দোকানে চলো।’

এর বিপরীত চিত্রও দেখেছি। ঐতিহ্য প্রকাশনীর সামনে দাঁড়িয়ে বই দেখছি, এমন সময় দেখলাম পাশে একজন ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে বই দেখছেন। ওনার দুই হাতে বইয়ে পূর্ণ দুটি ব্যাগ। দুই ব্যাগে কম করে হলেও ২৫–৩০টা বই রয়েছে। কথা বলে জানতে পারলাম, উনি পেশায় একজন শিক্ষক, কলেজে পড়ান, নাম কামরুন নাহার। কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, এত বই কিনে আবার আপনি বই দেখছেন?’ তিনি বললেন, ‘সারা বছরের বই চেষ্টা করি এই বইমেলা থেকে কিনে নেওয়ার। এ ছাড়া ছুটিও তেমন পাই না বলে আশা হয় না। তাই এক দিনেই সময় করে বেছে বই নিচ্ছি, বছরখানেক যাতে বইগুলো পড়তে পারি।’ ওনার কথা শুনে সত্যিই অবাক হলাম।

ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত লাগাতে বই উন্মোচন মঞ্চে গিয়ে কিছুক্ষণ বসলাম। আমার সামনে বসে ছিল চার সদস্যের একটি পরিবার। ছুটির দিন বলে হয়তো সবাই মিলে এসেছে। ৮–৯ বছর বয়সের ছেলেটি বলল, ‘আমার ক্ষুধা পেয়েছে আম্মু, বাবাকে বলো বার্গার এনে দিতে।’ দুই সন্তানের মাঝে বসা ভদ্রমহিলাটি স্বামীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমরা তো রোজা, কিছু খাব না, ওদের জন্য বার্গার বা অন্য কিছু নিয়ে আসো, ওদিকে খাবারের দোকান দেখা যাচ্ছে।’ ভদ্রলোকটি কিছু না বলে খাবার আনতে চলে গেলেন। মায়ের পাশে বসে ১০–১২ বয়সের মেয়েটি মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা আম্মু, আমাদের ক্ষুধা পেল বলে খাবার খাচ্ছি, কিন্তু বইমেলায় এসে বই কিনছি না কেন?’ মহিলাটি দেখলাম তাড়াতাড়ি বললেন, ‘আচ্ছা, আচ্ছা, যাওয়ার সময় বই কিনে দেব।’

বইমেলার বিভিন্ন স্টলে ঘুরতে ঘুরতেই দেখা হয়ে গেল বাংলা একাডেমির জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত কবি পিয়াস মজিদ ও পুরান ঢাকার বাসিন্দা আর বইপ্রেমিক তন্ময় তনুর সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলাম। মেলায় গিয়ে পরিচিত মানুষদের সঙ্গে দেখা হলে ভালোই লাগে। বিশেষ করে যাঁরা বই আর লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত আছেন, এমন ব্যক্তি।

বিকেল পাঁচটার পর দেখলাম বইমেলা পুরোদমে জমে উঠেছে। চারপাশে প্রচুর লোকজন এবং মানুষের ভিড় বেড়েই চলেছে। যদিও সেটা অন্য সব বছরের তুলনায় খুবই কম, তবু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে ভিড় বেড়ে যায়, এটাই স্বাভাবিক মেলার দৃশ্য। কিন্তু আমার মেলা দেখা তখন শেষ পর্যায়ে। ঘোরাঘুরি করার সময় পছন্দসই কয়েকটা বই কিনলাম।

এবার বাড়ি ফেরার পালা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেট্রো স্টেশনে গিয়ে টিকিট কেটে মেট্রোরেলে উঠলাম। ফার্মগেটে নেমে তেজগাঁও স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠে নরসিংদী স্টেশন।

হাজীপুর, সদর, নরসিংদী