করোটির রন্ধ্রে জমে থাকা ব্যথা, কথা, অনুভূতি লিখতে ইচ্ছা করে ভীষণ। কিন্তু ওই যে আলো ফুটলেই বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়, বাঁচতে হয়—তার জন্য রসদ লাগে।
নভেম্বর ২১, বেলা আড়াইটা
আগে থেকেই পরিকল্পনা ছিল, মিথ্যা কথা বলে অফিস থেকে বের হয়ে যাব, তা–ই করলাম। বরং এক ঘণ্টা আগেই বের হলাম।
বাইরে ভীষণ তুষারপাত। আজ মাইনাস ১২ দেখাচ্ছে, সঙ্গে বৃষ্টির মতো বরফ পড়ছে; কিন্তু বের হতে হবে, কাজে যেতে হবে। কোথায় কোন অচেনা পরিবার, কী কারণ, কিছুই জানি না; কিন্তু যেতে তো হবেই। বিকেল সাড়ে চারটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত একটা দোভাষীর অ্যাসাইন্টমেন্টে রাজি হয়েছি। কোনো বিকল্প নেই, মারা গেলে বা বড় দুর্ঘটনা না হলে কাজ বাতিল করতে পারব না।
অনেকটা পথ, প্রায় দুই ঘণ্টা—শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত, নানান ভাবনা আসে। আচ্ছা কী কাজ আজকে? কোনো পারিবারিক নির্যাতন নাকি, যা সচরাচর হয়? নাকি কোনো বাচ্চার ইস্যু? বাস থেকে নেমে সহজেই সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে যাই। চাপ চাপ বরফ মারিয়ে বাসায় নক করতেই তাগড়া ১৯–২০ বছরের ছেলে দরজা খুলে দেয়। ওর নাম মুন্না। প্রায় দেড় ঘণ্টা পরে জানতে পারি নাম, তবু শুরুতেই বললাম।
একটা হাউস বাড়ি। দেখি বয়স্ক, মধ্য বয়সী বা একটু বেশিই হবে হয়তো বয়স, খালাম্মা নামাজের পাটিতে ছিলেন। আমাকে সোফা দেখিয়ে দিয়ে আবার নামাজে বসলেন। মুহূর্তেই আরও একটা জোয়ান ছেলে আসে। বোঝা যায়, খালাম্মার দুই ছেলে। যদিও চায়নিজ মহিলা চোন আসার আগে কাজের জায়গায় ঢোকার আদেশ নেই দোভাষীদের, কিন্তু আমি কী করি? বাইরে বরফে দাঁড়ানো দায়। জোয়ান বয়স্ক ছেলে মুন্না খাবারের বাটি নিয়ে অপ্রকৃতিস্থ মানুষের মতো ঘুরছে, হাসছে, একা একা কথা বলছে। খালাম্মা তখনো নামাজের পাটিতে বসা। আমি নিজেকে গুছিয়ে চোনের পাশে গিয়ে বসি।
সেশন শুরু হয়। ২৫ থেকে ২৮ বছরের মধ্যে বয়স হবে চোনের, সিএসএসের দামি চাকরি করে। পাশে দোভাষী আমি, অন্য সোফায় মুন্নার বয়স্ক মা–বাবা এবং একটা সিঙ্গেল চেয়ারে মুন্নার বড় ভাই। মুন্না এই দুই ঘণ্টার সেশনে বারবার আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর কথা বলতে চাইছে। এদিকে মুন্নাই আজকের প্রধান আলোচ্য বিষয়। জন্মের সময় ওর ব্রেনের দুটি টিস্যু ছিঁড়ে যায়। তাই মুন্না যদিও ২০ বছরের তাগড়া জোয়ান ছেলে, কিন্তু ওর আচরণ ৫ থেকে ৮ বছরের শিশুর মতো। এই ১৮ বছর পর্যন্ত কানাডার সরকার মুন্নার সব দেখভাল করেছে। কিন্তু এখন মুন্না প্রাপ্তবয়স্ক। ওকে অন্য প্রোগ্রামে দিতে হবে, যা খুব সহজেই জোগাড় করা যায় না। সেখানে অনেক ডলারের হিসাব আছে। মুন্নার পরিবার এখন দিশাহারা—কী করবে? কার কাছে যাবে? মুন্নার মা–বাবা জানেন, ওনারা মারা গেলে ছেলের এক দিনের দায়িত্ব নেওয়ারও কেউ নেই। বাইরে ভীষণ তুষারপাত, খালাম্মার একমাত্র আশ্রয় নামাজের পাটি।
পাঠক, আসলে ইচ্ছা ছিল ২১ নভেম্বর রাতে বাড়িতে ফিরে মুন্নার কথা খুব বিস্তারিত লিখব। অনেক অনেক তথ্যও আছে লেখার মতো। কিন্তু বিধাতা আমার জন্য আজকের রাতে আরও কিছু আয়োজন রেখেছেন। এই রাতেই সেই গল্পে যাওয়ার জন্য মুন্নার কথার এখানেই ইতি টানছি।
নভেম্বর ২১, রাত সোয়া ৮টা
দুই ঘণ্টায় তিনটা বাস বদলে বাসায় ফিরি সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। গোসল সেরে পরদিনের সব গুছিয়ে নিয়েছি। ভোরে অফিসে যাব। নয়টার মধ্যে শুয়ে পড়ি। ঘড়িতে সোয়া আটটা বাজে। মোবাইল বেজে উঠল। অপর প্রান্তে দোভাষীর অফিস। সহকর্মী জোডির কণ্ঠ—‘মাহমুদা, ৪৪ ডিভিশনে পুলিশ স্টেশনে রওনা করতে পারবে এখনই? ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স কেস।’
এখনই যেতে হবে? কী করব আমি? না বলে দেব? একদিকে কমিউনিটির কাজের প্রতি দায়, অন্যদিকে ডলারের পেমেন্ট। রাত নয়টার পরে কাজ মানেই ডলারের অঙ্ক বেশি। কোনটা আমি এড়াতে পারি? আবার রওনা করলাম।
লেখা বড় হচ্ছে। কিন্তু করোটির কোষে কোষে জমে থাকা অনুভূতি লিখতে ইচ্ছা করে ভীষণ। ইচ্ছা করে পুলিশ স্টেশনে বসে রাত পৌনে ১১টা থেকে পৌনে ৩টা পর্যন্ত মুনিরা আপা তাঁর ২৩ বছরের জীবনে কতবার নিজের স্বামীকে দিয়ে ক্রমাগত নির্যাতন সয়ে গেছেন, সেটা লিখতে। আরও ইচ্ছা করে, ধর্ষিত হওয়ার সেই সব রগরগে বর্ণনা যখন দিচ্ছিলেন, তখন সেই কথাগুলো আমি কী করে, কোন শক্তি থেকে টরন্টো পুলিশ কাস্টডিতে বসা অফিসার স্কট আর কেভিনকে বলছিলাম—সেটা যদি সত্যিই লিখতে পারতাম, সেই ক্ষমতা যদি আমার থাকত।
আপা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তাঁর ২০ বছরের মেয়েকে। বারবার সেই মেয়ের গায়ে বাবা কীভাবে হাত তুলেছেন, সেই কথাও আপা বলে চলছেন। মেয়ে যদিও আমাদের সঙ্গে নেই, সে অন্য পুলিশ অফিসারের সঙ্গে লিখিত বক্তব্য দিচ্ছে। এখানে মুনিরা আপা, আমি আর দুই পুলিশ অফিসার। চারপাশে ক্যামেরা লাগানো, আমাদের সবার নিশ্বাসও রেকর্ড হচ্ছে প্রতি সেকেন্ডে। মুনিরা আপা পাক্কা দুই ঘণ্টা নিজের ব্যক্তিজীবনের কষ্ট বলার পরে যখন ঘড়িতে প্রায় দুইটা, তখন মনে হচ্ছিল, সেশন বুঝি শেষ হলো। স্কট যখন বলল, ‘আপনি আর কিছু বলবেন?’ তখন মুনিরা আপা বলেন, ‘আপা, স্বামী যখন আমার সঙ্গে সঙ্গম করে, তখন মনে হয়, সে আমারে রেপ করতেছে। গায়ে হাত তোলা, মারা—এসব না হয় সহ্য করলাম; কিন্তু আপা, এই সঙ্গমের কষ্ট তো আর নিতে পারি না, আমার বাঁচার পথ বলেন?’
তখন প্রথমেই মন বলে উঠছিল, এই যে দেশে–বিদেশে কয়েক লক্ষ বাঙালি মেয়ে প্রতিনিয়ত নিজের স্বামীকে দিয়ে মি–টু হচ্ছেন, এর হ্যাশট্যাগ কে করবে? এটা তো কাগজে–কলমে ধর্ম, পরিবার, সমাজ, মা–বাবা সাক্ষী রেখে সারা জীবনের জন্য মি–টুতে সাইন করা। স্বামীর প্রতি মুনিরা আপার ঘৃণা ছাড়া আর কিচ্ছু বাকি নেই। সেই স্বামী কী করে ভোরবেলা আপার ঘরে আসে এবং আপার পায়জামা টেনে খুলে ফেলে? কী করে আপার শরীর ছানতে থাকে পিশাচের মতো, যেখানে ভালোবাসার বা মায়া–মমতার চিহ্নমাত্র নেই, সেই অপরাধের শাস্তি আপা কার কাছে চাইবেন? এটা সত্য যে টরন্টো পুলিশ হয়তো আপার স্বামীকে ভীষণ অপরাধে তাঁর বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল চার্জ দিতে পারে; কিন্তু এই মুনিরাই তো মাত্র এক মাসের মাথায় গিয়ে নিজের স্বামীকে ছাড়িয়ে আনবেন পুলিশ চার্জ থেকে! যতবার পুলিশ জিজ্ঞাসা করেছে, ‘আপনি কি এই সম্পর্ক টেনে নিতে চান?’ আপা ততবার বলেছেন, ‘আমার ছেলেমেয়ে আছে। আমি সমাজের সামনে কী করে দাঁড়াব?’
আমরা সত্যিই কি কেউ বুকে হাত দিয়ে নিজেদের জীবনের সামনে দাঁড়াতে পারি? ছেলে বা মেয়ে কেউই কি নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছি, সেটা বলতে পারি সাহস করে? যাঁরা পারেন, পারছেন, তাঁদের স্যালুট।
নভেম্বর ২২, রাত পৌনে ৩টা
৪৪ ডিভিশন থেকে দুজন পুলিশ অফিসার ওদের গাড়িতে করে যখন বাসায় পৌঁছে দিচ্ছিল, তখন বারবার একটা কথাই বলেছি নিজের মনকে—এই জীবনের কাছে পরম পাওয়া, আমি মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়াতে পারছি। মুন্নাকে পাগল বলে সবাই জানে; মুনিরা আপা, যিনি হিজাব পরে একটা ভদ্রতার মুখোশ পরে জীবন যাপন করছেন, কিন্তু তিনি নিজেই জানেন, কতটা পাগল হয়ে বেঁচে আছেন। আর এই যে আমি, জীবনের সব গল্প লিখতে গিয়ে বারবার নিজেকে সামলাই, আসলে আমরা সবাই তো এই এক জীবনেরই অংশ, তা–ই না?
করোটির রন্ধ্রে জমে থাকা ব্যথা, কথা, অনুভূতি লিখতে ইচ্ছা করে ভীষণ। কিন্তু ওই যে আলো ফুটলেই বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়, বাঁচতে হয়—তার জন্য রসদ লাগে। সেই সত্য এসে সামনে দাঁড়ালেই সময় বয়ে যেতে থাকে, যা করতে ভীষণ ইচ্ছা করে, সেটা আর করা হয় না কিছুতেই।
২৩ নভেম্বর, ২০১৮
টরন্টো, কানাডা