কীভাবে ইতিহাসের ভাষা বদলায়

প্রতীকী

যুদ্ধ শেষ হলে শুধু বন্দুক আর কামানের শব্দ থামে, কিন্তু ইতিহাসের যুদ্ধ শুরু হয় যুদ্ধ বন্ধের পর থেকে। বিজয়ীরা ঘরে ফেরে পতাকা হাতে। পরাজিতরা ঘরে ফিরে যায় নীরবতা সঙ্গে নিয়ে। কিন্তু কয়েক বছর কিংবা দশক পর যখন নতুন প্রজন্ম সেই যুদ্ধের কথা জানতে চায়, তখন তাদের সামনে পড়ে একটি গল্প, একটি নির্দিষ্ট বয়ান, নির্দিষ্ট কিছু নাম, নির্দিষ্ট কিছু নায়ক এবং খলনায়ক।

একটি প্রবাদ আছে, ‘বিজয়ীরাই ইতিহাস লেখে’। এই কথাটি শুধু একটি প্রবাদ নয়, বরং এটি ইতিহাস ও ক্ষমতার পালাবদলের গল্পের কথা।

ইতিহাসের বীরত্বের কিংবা পরাজয়ের গল্পগুলো কাঁরা লেখে?
যে হাতে তরবারি থাকে, সেই হাত যখন কলমও ধরে, তখন ইতিহাসের ভাষা বদলে যেতে পারে। একটি যুদ্ধের বিজয়ী পক্ষের হাতে থাকে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের হাতে থাকে প্রশাসন, শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি নথিপত্র, সংবাদমাধ্যম এবং স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের ক্ষমতা। ফলে তারা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের বিজয়ী থাকে না, অনেক সময় তারা হয়ে ওঠে মানুষের স্মৃতিরও বিজয়ী।

কোনো রাজা যদি নিজের বিজয়কে সভ্যতার বিস্তার বলে লিখিয়ে রাখেন, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো সেটিই পড়বে। যে শহরটি রাজা জয় করেছিলেন, সেই শহরের মানুষেরা হয়তো ঘটনাটিকে বলত ‘বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ’। কিন্তু তাদের কণ্ঠ যদি হারিয়ে যায়, তাহলে ইতিহাসের পাতায় থেকে যায় শুধু বিজয়ীর ভাষা। ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম দিকগুলোর একটি এখানেই। যারা কথা বলার ক্ষমতা হারায়, অনেক সময় তারাই ইতিহাসে সবচেয়ে কম দৃশ্যমান হয়ে পড়ে।

ইতিহাসের সব গল্প কি তাহলে মিথ্যা কিংবা বানোয়াট? না। ‘বিজয়ীরা ইতিহাস লেখে’—এই কথাকে আক্ষরিক সত্য ধরে নিলে আমরা আরেকটি ভুল করব। কারণ, বিজয়ীর লেখা প্রতিটি কথা মিথ্যা নয়, যেমন পরাজিতের প্রতিটি কথা সত্য নয়। একজন বিজয়ী সেনাপতিও সত্য বলতে পারে। একজন পরাজিত রাজাও মিথ্যা বলতে পারে। ইতিহাসের সত্য কোনো পতাকার মালিকানাধীন নয়। সত্যকে খুঁজে পেতে হলে আমাদের তাকাতে হয় দলিলের দিকে, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের দিকে, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের দিকে, চিঠিপত্র, ডায়েরি, সংবাদপত্র ও অসংখ্য বিচ্ছিন্ন স্মৃতির দিকে।

একটি কণ্ঠ হয়তো পক্ষপাতদুষ্ট। কিন্তু শত শত বিচ্ছিন্ন কণ্ঠ যখন একে অপরকে ছেদ করে, তখন অতীতের একটি তুলনামূলক স্পষ্ট ছবি ধীরে ধীরে সামনে আসে। ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তির লেখা গল্প নয়, এটি সত্যের দিকে মানুষের এক দীর্ঘ অনুসন্ধান। একটা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করি, রোম জয়ের ঘটনা নিয়ে। প্রাচীন রোমের ইতিহাস পড়লে আমরা রোমের সামরিক শক্তি, রাজনৈতিক কৌশল এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের অসংখ্য গল্প পাই। কিন্তু আদিবাসী রোমে যারা পরাজিত হয়েছিল? তাদের নিজেদের কণ্ঠ কতটা আমাদের কাছে পৌঁছেছে? যে জনগোষ্ঠীর শহর ধ্বংস হয়ে গেছে, যে সংস্কৃতির লিখিত দলিল সংরক্ষিত হয়নি, যে মানুষগুলো ইতিহাস লেখার মতো ক্ষমতা বা সুযোগ কোনোটিই পায়নি, তাদের গল্প পুনর্লিখন কতটা কঠিন? এখানে বিজয়ীর ক্ষমতা শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শেষ হয়নি, সে ক্ষমতা পৌঁছে গেছে ভবিষ্যতের স্মৃতিতেও।

আরেকটা উদাহরণ পর্যালোচনা করা যেতে পারে, ১৮৫৭ সালের যুদ্ধ ভারতীয় বয়ানে স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ; কিন্তু ইংরেজদের জন্য সিপাহি বিদ্রোহ। ঘটনা এক, পরিস্থিতি এক, শুধু দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। কিন্তু ১৮৫৭ সালের যুদ্ধ ছিল ইতিহাসের মারপ্যাঁচ। কারণ, ১৮৫৭ সালের আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রত্যিটি মানুষের উদ্দেশ্য এক ছিল না। কেউ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ছিল, কেউ স্থানীয় ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল, কেউ ধর্মীয় বা সামরিক অসন্তোষ থেকে বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিল।

সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয় তারা, ইতিহাসে যাদের জোরালো কণ্ঠ নেই। ইতিহাসের বই খুললে দেখা যায় রাজা-রানির কথা, সেনাবাহিনীর দলবলের কথা, কামান–গোলার কথা; কিন্তু কোথাও লেখা থাকে না অসহায় কৃষকের কথা, স্বামীহারা স্ত্রীর কথা, পিতাহারা পুত্রের কথা। সেই শিশুটির গল্প কোথায়, যে শরণার্থী হয়ে সীমান্ত পেরিয়েছিল? সেই শ্রমিকের জায়গা কোথায়, যে কোনো সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে নিজের ঘামের বিনিময়ে সচল রেখেছিল? তাদের জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই, তাদের কোনো ছবি নেই, ইতিহাসে কোথাও তাদের বন্দনা নেই।

তবে ইতিহাসের মোড় বদলায়, সময়ের পরিক্রমায় বাস্তবতা বদলায়। যে ঘটনাকে একসময় ‘বিদ্রোহ’ বলা হয়েছিল, পরবর্তী প্রজন্ম সেটিকে ‘প্রতিরোধ’ হিসেবে দেখতে পারে। অনেক সময় বিজয়ীরা ইতিহাসের প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী বয়ানটি লেখে। কিন্তু তারা সব সময় ইতিহাসের শেষ কথাটি লিখতে পারে না। ইতিহাসের শেষ অংশটি লেখা হয় শ্রমিকের ঘামে, যুদ্ধে আহত হওয়া সৈনিককের রক্তে অথবা সন্তানহারা পিতার চোখের জলে। মাঝেমধ্যে ইতিহাস হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করতে।

সহসভাপতি, সিলেট বন্ধুসভা

* মতামত লেখকের নিজস্ব