বর্ষায় ঝরনাভ্রমণে এই ১০টি বিষয় অবশ্যই করণীয়
বর্ষা মানেই পাহাড়ি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের উন্মোচন। ঘন সবুজ বনাঞ্চল, নেমে আসা ধোঁয়াটে মেঘ, আর পাহাড়ি ঝরনার গর্জন এক অদ্ভুত মায়ার টানে ডেকে নেয় প্রকৃতিপ্রেমীদের। বর্ষা আসতেই পাহাড়ি ঝরনা নতুন প্রাণ ফিরে পায়। উঁচু পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া ফেনায়িত জলের শব্দ, ঝরনার জলে ভিজে যাওয়ার স্বপ্ন, প্রকৃতিতে মুক্ত নিঃশ্বাস—এই চাওয়া থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ বর্ষায় ছুটে যান বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি কিংবা সীতাকুণ্ডের নানা ঝরনামুখর গন্তব্যে।
তবে এ আনন্দ তখনই স্বার্থক হয়, যখন আমরা নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারি। প্রতিবারের মতো এবারও ভ্রমণের উন্মাদনার পাশাপাশি বাড়তি সচেতনতা জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক, পাহাড়ি ঝরনায় বর্ষাকালে যাওয়ার সময় যেসব বিষয় মাথায় রাখা উচিত।
আবহাওয়া দেখে পরিকল্পনা করুন
বর্ষাকালে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ধস বা আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ঝরনার আশপাশে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ে, যা আগে থেকে বোঝার উপায় নেই।
ভ্রমণের অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে আবহাওয়া পূর্বাভাস দেখে নিন। আবহাওয়া অনুকূল না থাকলে পরিকল্পনা পিছিয়ে দিন। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন বা ট্যুরিস্ট পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।
গন্তব্য ও পথ সম্পর্কে আগাম ধারণা নিন
আপনি যে ঝরনায় যেতে চান, সেই গন্তব্য সম্পর্কে আগে থেকে ভালোভাবে তথ্য সংগ্রহ করুন। ঝরনাটিতে যাওয়ার পথ কেমন, সময় লাগবে কতক্ষণ, পানি কত গভীর, কোথায় বসে বিশ্রাম নেওয়া যাবে—এসব জানতে চেষ্টা করুন।
যতটা সম্ভব পরিচিত ও জনপ্রিয় গন্তব্য বেছে নিন এবং স্থানীয় গাইডের সাহায্য নিন। অনেক দুর্গম ঝরনায় সিগন্যাল থাকে না, তাই দলবদ্ধভাবে যাওয়া এবং একজন অভিজ্ঞ গাইড রাখা জরুরি।
উপযুক্ত পোশাক ও জুতা নির্বাচন
ঝরনায় যেতে হলে শরীর যেন সহজে চলাচল করতে পারে, এমন হালকা ও আরামদায়ক কাপড় পরুন। শাড়ি, লম্বা কামিজ বা গা-চাপা পোশাক ঝরনার জলে বা পিচ্ছিল পথে বিপজ্জনক হতে পারে।
জুতার ব্যাপারে বিশেষ যত্ন নিন। পাথরের ওপর ভিজে স্যান্ডেল বা চপ্পল পিচ্ছিল হয়ে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই ট্রেকিং বা স্পোর্টস শু বেছে নিন, যেগুলো ভেজা অবস্থাতেও গ্রিপ ধরে রাখে।
ব্যাকপ্যাক ও সরঞ্জাম
হাত ফাঁকা রাখা জরুরি, তাই ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করুন। এর মধ্যে রাখুন পানিরোধী ব্যাগ বা পলিথিন (ভেতরের জিনিস ভিজে যাওয়া ঠেকাতে), টিস্যু, তোয়ালে, অতিরিক্ত শুকনা পোশাক, মোবাইল ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য ওয়াটারপ্রুফ কেস, সানগ্লাস ও হালকা রোদ–বৃষ্টির ছাতা, শুকনা খাবার (চিড়া, বিস্কুট, বাদাম), বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন ইত্যাদি।
চলাফেরায় সর্বোচ্চ সতর্কতা
ঝরনার আশপাশে পাথর ও মাটি সাধারণত ভীষণ পিচ্ছিল হয়। সেখান দিয়ে হাঁটার সময় ধীরে চলুন, ভারসাম্য বজায় রাখুন। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গেলে মাথা, কোমর বা হাড়ে গুরুতর আঘাত লাগতে পারে।
সাঁতার না জানলে ঝরনার জলের গভীরে না যাওয়াই ভালো। অনেক ঝরনার তলায় গভীর খাদ থাকে।
সেলফি তুলুন সচেতনভাবে, ঝুঁকি নিয়ে নয়
আমরা অনেক সময় ভালো ছবি তোলার লোভে বিপজ্জনক জায়গায় গিয়ে দাঁড়াই। ঢালে দাঁড়িয়ে বা ভেজা পাথরের ওপর পোজ দিতে গিয়ে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে। মনে রাখবেন, একটি ছবি বা রিলস কখনোই আপনার জীবনের চেয়ে মূল্যবান নয়।
প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রী সঙ্গে রাখুন
দলবদ্ধ ভ্রমণে একজনকে অন্তত একটি ফার্স্ট এইড কিট বহন করতে হবে। এতে রাখুন ব্যান্ডেজ, কটন, অ্যান্টিসেপটিক, ব্যথানাশক ট্যাবলেট বা ক্রিম, ডায়রিয়া বা পেটব্যাথার ওষুধ, ওরস্যালাইন ও গ্লুকোজ। বাইরে চিকিৎসার সুযোগ না থাকায় ছোট সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান জরুরি।
স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন
ঝরনার আশপাশে অনেক সময় আদিবাসী বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের বসবাস থাকে। তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখান। উচ্চ শব্দে গান, চিৎকার বা নাচানাচি পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এ ছাড়া প্লাস্টিক, চিপসের প্যাকেট বা বোতল ফেলে প্রকৃতি নোংরা করা থেকে বিরত থাকুন। আপনি যেমন ঝরনাকে সুন্দরভাবে পেয়েছেন, তেমনি রেখে আসাও আপনার দায়িত্ব।
দলে ভ্রমণ করুন এবং সবাইকে খেয়াল রাখুন
পাহাড়ি অঞ্চলে কখনোই একা চলাচল করবেন না। দলবদ্ধভাবে চলুন এবং কেউ পিছিয়ে পড়লে অপেক্ষা করুন। দলের প্রতিটি সদস্য যেন দৃশ্যমান থাকে, সেটা নিশ্চিত করতে একটি নির্ধারিত ‘গ্রুপ লিডার’ বা সংগঠক থাকা ভালো।
জরুরি যোগাযোগমাধ্যম ও তথ্য জানুন
ভ্রমণের আগে স্থানীয় থানা, ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও গাইডের নম্বর সংরক্ষণ করুন। মোবাইলের চার্জ নিশ্চিত করতে সঙ্গে পাওয়ার ব্যাংক নিন। অনেক স্থানে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় পূর্বপ্রস্তুতি আপনাকে নিরাপদ রাখবে।
সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভা