বন্ধুসভা: আঁধারভেদী আলোর পথের যাত্রাসঙ্গী
লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
মাটির গন্ধে কেটে যায় ভয়, রক্তে মেশা সাহসের গান;
স্বাধীন মায়ের লাল সবুজে, উঠুক জেগে প্রতিটি প্রাণ।
কুর্নিশ তব রাজটিকায়, পদতলে থাক অশুভ সব;
বন্ধুত্বের জয়ধ্বনিতে, চারিদিকে হোক বাংলাদেশ রব।
তারুণ্যের কোনো বয়সসীমা নেই, নেই কোনো কাল। তারুণ্য এক অপার সম্ভাবনা আর আনন্দদায়ী সময়। যখন সময় আসলে থমকে যায়, স্থির হয়ে শুধু আলো ছড়ায়। তারুণ্যকে ধারণ করতে হয়, লালন করতে হয়, পালন করতে হয়। তারুণ্যে মন উদ্বেল হয়, চিত্ত থাকে কোমল, অন্যের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াতেই তখন অপার আনন্দ। তারুণ্য দীপ্তিময়, হিরণ্ময় এক জাজ্বল্য শক্তি। এই শক্তি ধারণ করেই তারুণ্য শত বাধা আর আঁধার ভেদ করে জীবনের জয়গান গায়, ব্যাকুল হয়ে ছুটে বেড়ায় ভালোর নেশায়, আলোর দিশায়। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সীমারেখা মুছে শুধু দেশ, সমাজ আর মানুষের জন্য নিজেকে নিবেদনই তারুণ্যের স্বভাব।
আর এই তারুণ্য ধারণ করেই, আলোর দিশা হয়ে বন্ধুসভা ২৭ বছরের যৌবনে তারুণ্যের বার্তা ছড়িয়ে চলেছে। আত্মোন্নয়ন আর সমাজ-রাষ্ট্রের সব ভালোতে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার শপথে বলীয়ান হয়ে পথ চলছে। বন্ধুসভার এই পথচলা কখনো বন্ধুর, আবার কখনো সুমধুর। সারা দেশে ১৪৬টি বন্ধুসভা আর লক্ষাধিক বন্ধু নিয়ে দীর্ঘ এই যাত্রায় কখনো যে ছন্দপতন হয়নি, তা তো নয়! কিন্তু ছন্দপতন হলেও কখনোই সুর কেটে যায়নি। এক সুরে এক লক্ষ্যে ২৭ বছর ধরে চলছে বন্ধুসভার আলোর পথে যাত্রা। এই যাত্রায় সঙ্গী হয়েছে লাখো তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী। বন্ধুসভার বন্ধুরা কখনোই তারুণ্য অতিক্রম করতে পারে না। বয়সের সংখ্যাটা তাদের লক্ষ্যভেদী যাত্রায় কখনো বাধা হয়ে ওঠে না। তাইতো বন্ধুসভা প্রথম আলোর পাঠক সংগঠনের পরিচয় ছাপিয়ে দেশের সর্ববৃহৎ স্বেচ্ছাসেবী ও সামাজিক সংগঠন।
বন্ধুসভার এই যে পথপরিক্রমা, সেই পথের বাঁকে বাঁকে নানা সময়ে স্বপ্ন বুনেছে নানাজন। কোনো প্রাপ্তির আশায় নয়, শুধু বিনিময়হীন প্রদানের নেশায় তারা কাজ করে গেছে। বন্ধুসভা গঠনের পর থেকে নানা সময়ে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও, বিগত ছয় বছরের যাত্রাটা ছিল একটু বেশিই ভিন্নধর্মী। বিশেষ করে বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের কাঠামোগত পরিবর্তন, দেশ ও দেশের বাইরের বন্ধুসভার কার্যক্রম পরিচালনাতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনে দেয়। প্রায় ১৫ বছরের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধির কাছ থেকে সভাপতির দায়িত্ব অর্পণ করা হয় প্রথম আলোর কর্মী নয় এমন স্বেচ্ছাসেবক বন্ধুদের কাছে। টানা তৃতীয়বারের মতো দুই বছর মেয়াদি জাতীয় পর্ষদের দায়িত্ব পালন করছে স্বেচ্ছাসেবী বন্ধুরা। তাদের নেতৃত্বেই চলছে সারা দেশের বন্ধুসভার কার্যক্রম। ছয় বছরে বন্ধুসভার আন্তযোগাযোগে খানিকটা ঘাটতি হলেও, অন্তযোগাযোগে শক্তিশালী হয়েছে। বন্ধুসভা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে বহুমুখী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে। সারা দেশের বন্ধুরাও সানন্দে এই পরিবর্তনে সায় দিয়েছে। তারা নিজেদের উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজের মধ্যেই নিজেদের আত্মতৃপ্তি খুঁজে নিয়েছে। প্রতিটি বন্ধুসভা বছরের নির্ধারিত সময়ে তাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং দায়িত্ব হস্তান্তর করে নতুন নেতৃত্ব বিকাশে কাজ করছে। বিভিন্ন কর্মশালা, কর্মমুখী শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-মোটিভেশনের মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করছে। জাতীয় পর্ষদের দিকে চেয়ে না থেকে নিজেদের মতো করে স্থানীয় বন্ধুসভাগুলো পৃষ্ঠপোষক জোগাড় করে বড় বড় অনুষ্ঠান করছে, নিজেদের শক্তির জানান দিচ্ছে। বন্ধুরা এখন নিজেদের দায়িত্ব নিজেরাই নিতে শিখেছে।
বন্ধুরা বই পড়ে, ত্রাণ দেয়, গাছ রোপণ করে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়, মানুষের সেবা করে—এমন যা যা করার তার সবই করে। তবে তার সঙ্গে বিগত বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছে বছরব্যাপী নানা আত্মোয়ন্নয়নমূলক কর্মসূচি। বড় আয়োজনে ঘটা করে সফট স্কিল শেখার উৎসব। বন্ধুসভার বন্ধুরা এখন অনেক বেশি কাঠামোবদ্ধ, অনেক বেশি প্রাতিষ্ঠানিক, অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল, দায়িত্বশীল। নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে এমন কিছু করে ফেলে, যা স্বেচ্ছাসেবী যে কারও জন্য করাটা অনেক বেশি কঠিন।
এই তো মাত্র এক সপ্তাহ আগেই অন্ধকারের একদল যাত্রী বন্ধুসভার কক্ষ পুড়িয়ে দিয়েছে, সব লুট করেছে। হারিয়ে গেছে বন্ধুসভার ২৭ বছরের সব স্মৃতি, সব সম্পদ। তবু বন্ধুসভা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সারা দেশের বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় 'হবে কি হবে না' সংশয় পেরিয়ে মাত্র তিন দিনের মধ্যেই ষষ্ঠ জাতীয় সমাবেশ আয়োজন করছে। এই যে শক্তি, সাহস, এর নামই বন্ধুসভা।
বন্ধুসভা সারা দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সাহস জোগায়, মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভরসা হয় বাংলাদেশের। সর্বক্ষেত্রে দেখতে চায় ‘বাংলাদেশের জয়'। বন্ধুসভার এই অপার শক্তিই যেন বাংলাদেশের আরেক নাম। শত আঘাতেও মাথা নোয়াবার নয়। ২৭ বছরের পথচলায় সীমাহীন আনন্দ, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, দেশ গড়ার নিষ্ঠা, পরের তরে আত্মনিবেদন, আর তুমুল দেশপ্রেম নিয়ে বেড়ে ওঠা পূর্ব প্রজন্মের পথ বেয়েই গড়ে উঠছে নতুন আরেকটা অপরাজেয় প্রজন্ম। তাই সত্য সাহসে অপরাজেয় বন্ধুত্ব ধারণ করে, অন্ধকার পায়ে দলে, আলোর পথের যাত্রায় আমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে পারি— আমরা সবাই বাংলাদেশ।
সভাপতি, বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদ