দুটি ঘুমন্ত শিশু কি আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারবে

ফুটপাতের ওপর পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে দুটি শিশু, মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের পাশে
ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

শহরকে আমরা স্বপ্নের ঠিকানা বলি। এই শহরে প্রতিদিন লাখো মানুষ আসে নিজের ভাগ্য বদলাতে। কেউ চাকরির খোঁজে, কেউ ব্যবসার আশায়, কেউ শুধু দুমুঠো ভাতের নিশ্চয়তার জন্য। শহরের ব্যস্ততা কখনো থামে না। রাস্তায় মানুষের স্রোত, উঁচু দালান, মেট্রোরেলের ছুটে চলা, অসংখ্য যানবাহনের শব্দ—সব মিলিয়ে যেন এক অবিরাম গতির পৃথিবী। এই গতি আমাদের এতটাই গ্রাস করে ফেলে যে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই এই শহরের আরেকটি মুখ আছে। এমন এক মুখ, যেটি প্রতিদিন আমাদের চোখের সামনে থেকেও অদৃশ্য হয়ে থাকে।

সেদিনও দিনটা অন্য দিনের মতো শুরু হয়েছিল। বেলা তিনটার মধ্যে ব্যবসায়িক কাজে কারওয়ান বাজার পৌঁছাতে হবে। বাসা থেকে বের হতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। সময় বাঁচানোর জন্য মতিঝিল হয়ে মেট্রোরেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। মাথায় তখন কেবল সময়ের হিসাব, কাজের চিন্তা আর গন্তব্যে পৌঁছানোর তাড়া। কিন্তু জীবন মাঝেমধ্যে এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যেগুলো মানুষ কোনো পরিকল্পনা করে পায় না। সেই মুহূর্তগুলো হয়তো আমাদের মানুষ করে, আমাদের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা বিবেককে জাগিয়ে তোলে।

মতিঝিল মেট্রোস্টেশনের এস্কেলেটরে ওঠার ঠিক আগে হঠাৎ দৃষ্টি বাঁ দিকে চলে গেল। ফুটপাতের ওপর পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছে দুটি শিশু। বড় শিশুটির বয়স হয়তো পাঁচ-ছয় বছর। তার পাশেই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে মায়ের দুধের গন্ধ এখনো না ভোলা আরেকটি শিশু। তাদের মাথার পাশে একটি দুধের ফিডার। একটি ছোট বালিশ আছে, কয়েকটি পুরোনো কাপড়; কিন্তু নেই কোনো ঘর, নিরাপদ ছাদ, নেই নিশ্চিন্ত আগামী। চারপাশ দিয়ে হাজারো মানুষ হেঁটে যাচ্ছে, গাড়ির শব্দে বাতাস কাঁপছে, শহর নিজের গতিতে ছুটে চলেছে; কিন্তু এই দুই শিশুর পৃথিবী যেন সেই ফুটপাতের কয়েক হাত জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। থমকে গেলাম।

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

ক্যামেরা হাতে ছিল, কিন্তু শাটার চাপার আগেই মনে হলো এই দৃশ্য আসলে ক্যামেরায় নয়, হৃদয়ে ধরা পড়ছে। কয়েক মুহূর্ত শুধু তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে। তারপর একটি দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে এস্কেলেটরে উঠলাম। শরীর যত ওপরে উঠছিল, মন তত নিচে নেমে যাচ্ছিল। বারবার ফিরে তাকাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল, গন্তব্যের দিকে এগোচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমার একটি অংশ সেই ফুটপাতে পড়ে রইল।

আমরা সবাই জীবনে কিছু না কিছু চাই। আরও একটু অর্থ, আরও একটু স্বাচ্ছন্দ্য, আরও বড় একটি পরিচয়, আরও কিছু সাফল্য। চাওয়ার শেষ নেই। অথচ সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে মনে হলো এই দুই শিশুর চাওয়া হয়তো খুব বেশি নয়। হয়তো আজ শুধু একটু নিরাপদ ঘুম, একটু মায়ের স্নেহ, অথবা ক্ষুধা না নিয়ে একটি রাত পার করার সুযোগ। তখন নিজের সব চাওয়া–পাওয়া খুব ছোট, খুব তুচ্ছ মনে হতে লাগল।

হঠাৎ একটি প্রশ্ন ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিল—যদি আজ আমার নিজের সন্তানও এই ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকত? এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না। শুধু অনুভব করলাম, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ভয় হয়তো নিজের প্রিয় মানুষকে অন্যের কষ্টের জায়গায় কল্পনা করা। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, সহানুভূতি আসলে কোনো তত্ত্ব নয়, এটি এমন একটি অনুভূতি, যা মানুষকে নিজের ভেতরের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন

এই শহরে এমন দৃশ্য নতুন নয়। প্রতিদিনই দেখি। ফুটপাতে, উড়ালসড়কের নিচে, রেললাইনের পাশে, কোনো বাজারের দেয়াল ঘেঁষে অসংখ্য শিশু বড় হয়ে উঠছে। তারা ধুলায় খেলে, ধোঁয়ার মধ্যে শ্বাস নেয়, খোলা আকাশের নিচে ঘুমায়। তাদের কাছে ফুটপাতই বিছানা, আকাশই ছাদ, আর অনিশ্চয়তাই আগামী দিনের একমাত্র ঠিকানা। আমরা তাদের দেখি, আবার দেখি না। ধীরে ধীরে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অভ্যাস মানুষকে নিষ্ঠুর করে তোলে। যে দৃশ্য একসময় বুক কাঁপিয়ে দিত, একসময় সেটাই শহরের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে যায়।

জানি, এই শিশুদের নিয়ে অনেক আলোচনা আছে। বলা হয়, এদের দিয়ে ভিক্ষার ব্যবসা হয়। বলা হয়, একটি সংগঠিত চক্র তাদের ব্যবহার করে। এই কথাগুলো শুনেছি, জানি। হয়তো অনেক ক্ষেত্রে সত্যিও। কিন্তু সেদিন, সেই দুই শিশুর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কোনো যুক্তিই আমার ভেতরে জায়গা করে নিতে পারেনি। কিছু দৃশ্য আছে, যা মানুষের হৃদয়কে এমনভাবে স্পর্শ করে যে সব যুক্তি, সব বিশ্লেষণ, সব তর্ক নীরব হয়ে যায়। তখন আমরা আর কোনো সামাজিক কাঠামো দেখি না, কোনো অপরাধী চক্র দেখি না, শুধু একটি শিশুকে দেখি। একটা মানুষকে দেখি। আর সেই মানুষটিকে দেখার মধ্যেই আমাদের মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা লুকিয়ে থাকে।

ছবিটির দিকে যতবার তাকাই, ততবার একটি বিষয় নতুন করে ভাবায়। বড় শিশুটি যেন অজান্তেই ছোটটিকে আগলে রেখেছে। হয়তো সে জানেই না কীভাবে কাউকে রক্ষা করতে হয়, তবু তার শরীরের ভঙ্গিতে একধরনের দায়িত্ববোধ আছে। আর ছোট্ট শিশুটি এমন নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে, যেন পৃথিবী তাকে কোনো দিন কষ্ট দেবে না। অথচ আমরা জানি, তার ঘুম ভাঙবে হয়তো গাড়ির হর্নে, হয়তো ক্ষুধায়, হয়তো রোদের তাপে, অথবা অনিশ্চয়তার আরেকটি দিনের শুরুতে।

ছবি: মাহমুদুল হাসান খলিফা

এই ছবিতে আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে সেই দুধের ফিডারটি। পৃথিবীর প্রতিটি শিশুর প্রথম আশ্রয় হওয়ার কথা একটি ঘর, একটি নিরাপদ বিছানা, একটি মায়ের বুক। কিন্তু এখানে একটি ফিডার আর একটি ফুটপাত মিলেই যেন একটি শিশুর শৈশবের পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কত নির্মম হলে একটি সমাজ একটি শিশুর শৈশবকে এভাবে রাস্তায় রেখে দিতে পারে?

অনেকেই বলেন, একটি ছবি হাজার শব্দের সমান। কিন্তু আমার মনে হয়, কিছু ছবি হাজার শব্দেরও বেশি নীরব। এই ছবিটি তেমনই। এখানে কোনো কান্না নেই, কোনো আর্তনাদ নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। আছে শুধু গভীর নীরবতা। আর সেই নীরবতাই আমাদের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি করে—আমরা কি সত্যিই সভ্য হয়েছি, যদি একটি শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হয় ফুটপাত?

পৃথিবী, তুমি শান্তির হও। তুমি সুন্দর হও। মানুষকে শুধু সফল হতে শিখিও না, অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখাও। চাওয়া–পাওয়ার বাইরে মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখাও। এমন একটা পৃথিবী গড়তে শেখাও, যেখানে কোনো শিশুর শৈশব তার জন্মের ঠিকানার কাছে পরাজিত হবে না। জানি, আমার এই প্রার্থনা হয়তো এই নির্মম পৃথিবীর কাছে অপূর্ণই থেকে যাবে। হয়তো আগামীকালও কোনো ফুটপাতে আরেকটি শিশু ঘুমাবে, আর আমরা আবার তাড়াহুড়া করে পাশ কাটিয়ে চলে যাব। তবু আশা ছাড়তে চাই না।

পৃথিবী এক দিনে বদলায় না। একটি আইন, একটি বক্তৃতা কিংবা একটি ছবিও হয়তো পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে না। কিন্তু একটি ছবি একজন মানুষের ভেতরে একটি প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতে পারে। আর একটি জেগে ওঠা বিবেক থেকেই শুরু হয় পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ।

দয়াগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ঢাকা-১২০৪