পেয়ারামাখা থেকে বইয়ের গল্প

দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যাবেলার গল্পে অনেক মানুষ, নানা ঘটনা, সঙ্গে একটি বই ও বইঘরছবি: লেখক

সকাল সকাল খুব ছোট কি মাঝারি একটা কাজ নিয়ে ঘর থেকে তাড়াহুড়া করে বের হওয়া। বাসা থেকে সিএনজি নিয়ে আম্বরখানায় গেলাম। চৌহাট্টায় কাজ ছিল, ওইটুকু রাস্তা হেঁটেই গেলাম। আশপাশে প্রিন্টের দোকান খোঁজাখুঁজি করছি, তার মধ্যেই রাস্তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরিচিতের সঙ্গে দেখা। টুকটাক দেশের পরিস্থিতি নিয়ে কথাবার্তা। খুব অল্প কথায় তাকে বিদায় দিয়ে কাজটা সেরে নেব ভাবছি। গন্তব্যে গেলাম এবং সেখানে অনেকটা অসফল হয়ে কার্য সম্পাদন করতে না পারায় ব্যর্থ মনে শহীদ মিনারে গিয়ে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ।

মন ভালো করতে কিছু খাওয়া প্রয়োজন মনে করে বের হলাম আবার। দেখলাম পেয়ারামাখা বিক্রি করছে খুব অল্প বয়সী একটা ছেলে। তার ছোট্ট আউটলেটে অনেক ভিড়। টাকা দিলাম আর অমনি সিলেটের পুলিশি অভিযানের ভয়ে বিক্রেতা আউটলেট নিয়ে দিল দৌড়। আর সব হকারদের সতর্কবাণী—‘আইলো আইলো আইলো’।

সিলেট বাতিঘর
ছবি: লেখক

ওপেন রেডিও ও ব্রডকাস্টিংয়ের অভিজ্ঞতা আর পেয়ারামাখা নিয়ে আবার শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে। পুরোটা শেষ করে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা-প্লাস্টিক ফেলে কিছুক্ষণ শহীদ মিনারের সৌন্দর্য দেখছিলাম। চোখে পড়ল দুটি শিশু। সুশীল সমাজের ভাষায় পথশিশু। তাদের জীবনের সবচেয়ে সুখের সময়গুলো পার করছিল আনন্দ ও খেলাধুলায়। তার মধ্যে ফোন এল, কিছু কাজে জিন্দাবাজার থাকতে হবে সন্ধ্যায়। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছে, বেলা প্রায় সাড়ে তিনটা। আমার কাছে সময় আছে তিন ঘণ্টার বেশি। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে জিন্দাবাজারের উদ্দেশে রওনা দিলাম।

আল-হামরার পাশে আসতেই মনে হলো চা খেয়ে নিলে হয়তো মনটা চাঙা হয়ে যাবে। চা খেতে কোনো দ্বিধা হয় না। আল-হামরার পাশের গলিতে একটা জম্পেশ চায়ের চুমুকে সুখটান দিয়ে আবার শুরু হাঁটা গন্তব্যে—জিন্দাবাজার পয়েন্ট। এর মধ্যেই মনে হলো হাতে এখনো অনেক সময়। চায়ের স্বাদ নিতে নিতেই ঠিক করে নিই, এই লম্বা সময় পার করার জন্য সবচেয়ে উত্তম জায়গা বাতিঘর। জিন্দাবাজার থেকে একটু পূর্ব দিকে হাঁটলেই বাতিঘর।

রাতের সিলেট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ
ছবি: লেখক

ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আলাদা একটা শান্তি অনুভব হয়। এমন সময় মানুষজন একটু কমই থাকে। বাতিঘরের ইনচার্জ দাদা একজন প্রিয় মানুষ, খুবই আনন্দ লাগে ওনাকে বিরক্ত করতে। বাতিঘরে তখন আমি, দাদা আর একটা প্রেমিক জুটি। দেখেই মনে হচ্ছিল বেশি দিন হয়নি, নতুন ভালোবাসা। সঙ্গে ওনাদের আরও দুই শুভাকাঙ্ক্ষী। একটা লম্বা সময় তাঁদের ফটোসেশন চলল। শুধু ছবি না তুলে একটা বই কেনা যেত বা পড়া যেত! তাঁদের ওপর মনে মনে বিরক্তি নিয়ে কিছুক্ষণ পায়চারি করছিলাম। হেঁটে হেঁটে বই দেখছিলাম।

বাতিঘরের ধ্রুপদি সিরিজের ক্ল্যাসিক বইগুলো দেখে আফসোস হয়—কখন আমার অনেক টাকা হবে আর সব বই কিনে ফেলব। এমনটা যদিও সব পাঠকেরই মনে হয়, আমি একা নই। হঠাৎ একটা বই এমনিই হাতে নিলাম, ভূমিকা পড়ছিলাম। তখনই এক বাবা এলেন তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে। লোকটি বাচ্চাদের বই পড়াতে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন। বাতিঘরে থাকা আলী আমজাদের ঘড়ির অল্পস্বল্প ইতিহাস ইংরেজি ভাষায় কথা বলা তাঁর ছেলেমেয়েদের বললেন। সব অভিভাবকেরই উচিত সন্তানদের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

আমার হাতে থাকা বইটার নাম ‘যখন পুলিশ ছিলাম’—ধীরাজ ভট্টাচার্য
ছবি: লেখক

থাক ওসব কথা। আমার হাতে থাকা বইটার নাম ‘যখন পুলিশ ছিলাম’—ধীরাজ ভট্টাচার্য। দু–এক পাতা পড়তেই বেশ আগ্রহ জাগল, মনে হলো পড়া উচিত। বেশ খানিকটা পড়া হয়ে গিয়েছিল সেই আকর্ষণ থেকে। গল্পটা নিয়ে লিখছি না, বইটা কিনে পড়া শেষ করে তখন হয়তো কথা বলা যাবে। দুটো কাজের মধ্যে অনেকটা সময় খুব অল্প মনে হলো। কারণ, সঙ্গে বই ছিল।

সন্ধ্যার পরের গল্প না হয় একটু আড়ালই থাকুক। কিছু প্রিয়ভাজনের সঙ্গে বেশ ভালো সময় ছিল—চা-গল্প, আড্ডা। দিনের শুরু থেকে সন্ধ্যাবেলার গল্পে অনেক মানুষ, নানা ঘটনা, সঙ্গে একটি বই ও বইঘর। দিন শেষে ব্যর্থ দেহখানি নিয়ে ক্লান্তির বাড়ি ফেরা। তবু সুখ আর তৃপ্তির গল্প তো এভাবেই জমা থেকে যায় অল্প কথার ছলে।

সাধারণ সম্পাদক, সিলেট বন্ধুসভা