মেঘনার পাড়ে উৎসবের ভিড়ে খুঁজে পাওয়া বাঙালির শিকড়
ভোরের নিস্তব্ধতা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। ঘুমের গভীর অন্ধকারে ডুবেছিলাম। হঠাৎ ফোনের তীব্র রিংটোন, ওপাশে বন্ধু রামিম। রিংটোনের একটানা শব্দে ভেঙে গেল গভীর ঘুম। আধো ঘুম চোখে ফোনটা ধরতেই বুঝে গেলাম আজকের দিনটা অন্য রকম হতে চলেছে। তড়িঘড়ি প্রস্তুত হয়ে আবার যোগাযোগ করলাম রামিমের সঙ্গে। আগেই ঠিক করা পরিকল্পনা অনুযায়ী শুরু হলো আমাদের যাত্রা। গন্তব্য ভৈরবের মেঘনা নদীর পাড়ে বসা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈশাখী মেলা। এটির আয়োজন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ভৈরব।
নতুন বছরের প্রথম দিন। সূর্যের প্রথম আলো, আর সেই আলোকে সঙ্গী করেই আমরা ছুটে চললাম এক রঙিন উৎসবের দিকে; যেখানে অপেক্ষা করছিল বাঙালির ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর অজস্র গল্পের সমাহার। মেলার গেটের সামনে এসে রিকশা থেকে নামলাম। দূর থেকেই চোখে পড়ছিল উৎসবের আমেজ। কাছে যেতেই স্পষ্ট হয়ে উঠল মেলার প্রধান ফটক রঙিন নকশার ব্যানারে বড় করে লেখা ‘শুভ নববর্ষ ১৪৩৩’। সেই ফটক যেন আমাদের স্বাগত জানাচ্ছিল এক ভিন্ন জগতের দিকে।
বন্ধু রামিমের সঙ্গে প্রবেশ করলাম মেলার ভেতর। তখনো সকাল, ভিড় খুব একটা জমেনি। এই নিরিবিলি সময়টুকুই যেন আমাদের জন্য বাড়তি সৌভাগ্য—সবকিছু ধীরে, মন ভরে দেখার সুযোগ। সুযোগ কাজে লাগিয়ে রামিমও কিছু চমৎকার ছবি তুলে নিল। ভেতরে ঢুকতেই চোখ আটকে গেল রঙের এক অপূর্ব সমারোহে। লাল, নীল, বেগুনি, সবুজ বিভিন্ন রঙের কাচের চুড়ি ঝলমল করছিল সকালের আলোয়। পাশেই হাতে বানানো হাতপাখা যেন গ্রামীণ জীবনের সরলতা আর ঐতিহ্যের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিছু দোকানি তখনো ব্যস্ত দোকান গুছিয়ে নিতে। কেউ পণ্য সাজাচ্ছেন যত্ন করে, কেউবা ক্রেতাদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছেন। চারপাশে ধীরে জমতে থাকা এই ব্যস্ততা, মানুষের আগমনে মেলার পরিবেশটা একটু একটু করে উৎসবমুখর হয়ে উঠছিল।
ধীরে মেলার ভেতরের দিকে এগোতে লাগলাম। দুই পাশে সারি দোকান, আর মাঝখানে হকারদের বসার জন্য আলাদা জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। পুরো আয়োজনটাই ছিল বেশ গোছানো, পরিকল্পিত। মেলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ভৈরব-এর স্বেচ্ছাসেবকেরা ছড়িয়ে ছিলেন, ধীরে শুরু হচ্ছিল তাদের নজরদারি।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মেলার পরিবেশে এক নতুন উচ্ছ্বাস যোগ হলো। একটি জাঁকজমকপূর্ণ র্যালি প্রবেশ করছে মেলার ভেতর। নববর্ষের এই বিশেষ দিনকে ঘিরে, মেলার উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজন করা হয় এই বর্ণাঢ্য র্যালির। ঢাকঢোল, রঙিন ব্যানার আর উৎসবমুখর মানুষের অংশগ্রহণে র্যালিটি যেন পুরো মেলাকে মুহূর্তেই প্রাণবন্ত করে তুলল। র্যালিটি ধীরে মেলার একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে থামল, যেখানে তৈরি করা হয়েছে একটি চমৎকার মঞ্চ। মঞ্চে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, আর সামনে দর্শকদের জন্য খোলা জায়গা—সব মিলিয়ে যেন এক পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রস্তুতি।
ঘুরে দেখতে লাগলাম মেলার প্রতিটি কর্নার। কোথাও খেলনার দোকান, কোথাও আবার ছোট খেলার স্টল। বিশেষ করে শিশুদের ভিড় চোখে পড়ার মতো; তাদের হাসি, উচ্ছ্বাসে পুরো পরিবেশটা আরও জীবন্ত হয়ে উঠছিল। হকাররা নিজেদের মতো করে ক্রেতা টানার চেষ্টা করছে, কেউ ঢোল বাজাচ্ছে, কেউ বাঁশি, আবার কেউ মাইকে ডাক দিচ্ছে।
হঠাৎ দেখা হলো ভৈরব বন্ধুসভার পাঠাগার ও পাঠচক্র সম্পাদক মহিমা মেধা আপুর সঙ্গে। তিনি মেলায় আগত মানুষের মধ্যে নববর্ষের আনন্দ ছড়িয়ে দিতে ব্যস্ত—মানুষের গালে রঙিন নকশায় লিখে দিচ্ছিলেন ‘শুভ নববর্ষ’। তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগ যেন পুরো উৎসবটিকে আরও ব্যক্তিগত, আরও হৃদয়ছোঁয়া করে তোলে।
আরেকটু এগোতেই নাকে ভেসে এল মিষ্টি এক ঘ্রাণ, যা মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয় বৈশাখী মেলার চিরচেনা ঐতিহ্য। সারি সারি খাবারের দোকানে সাজানো মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা, কদমা, খাজা, জিলাপি, নিমকি আরও কত নাম না জানা সুস্বাদু খাবার! খাবারের এই রঙিন জগতের ঠিক বিপরীত পাশেই ছিল মাটির তৈরি তৈজসপত্রের দোকান। কুমোরদের নিপুণ হাতে গড়া মাটির ব্যাংক, গরু, হাতি, পুতুল, নৌকা। সবকিছুতেই একধরনের মাটির গন্ধমাখা সৌন্দর্য। পাশেই ছিল বাংলার আরেক ঐতিহ্য বেতের তৈরি ডালা, কুলা, চাঙারি, ঝুড়ি, ডোল, ডুলা, আউড়ি, চাঁচ, ধামা গ্রামীণ জীবনের অপরিহার্য সব উপকরণ।
সময় যত এগোচ্ছিল, ততই মেলার চেহারা বদলে যেতে থাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো মাঠে নেমে আসে মানুষের ঢল। চারপাশে কোলাহল, হাসি আর উচ্ছ্বাস। মনে হচ্ছিল, এই জনসমুদ্রই যেন বৈশাখের আসল রূপ! মেলাজুড়ে নানা রকমের দোকান—পুরো মাঠ যেন এক বিশাল রঙিন জগৎ। একেকটি দোকানে একেক রকমের জিনিস, একেকটি আলাদা আকর্ষণ। আর এই পুরো অভিজ্ঞতাকে ফ্রেমে বন্দী করতে ব্যস্ত বন্ধু রামিম, তাঁর ক্যামেরা যেন থামতেই চাইছিল না।
মেলার ভেতরে চোখে পড়ে নানা রকম মানুষের বিচিত্র সমাবেশ। কেউ গল্পে মেতে মশগুল, কেউ পছন্দের জিনিস কিনতে ব্যস্ত, কেউবা স্মৃতিকে ধরে রাখতে তুলছে ছবি। আবার কেউ ভিডিও করে ধারণ করছে পুরো মেলার আবহ, যেন এই মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে চায় অনেক দিনের জন্য। চারপাশের এই দৃশ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে মানুষের আন্তরিকতা। অপরিচিত মানুষও একে অপরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ে ব্যস্ত ‘শুভ নববর্ষ’ যেন হয়ে ওঠে এক সেতুবন্ধ, যা সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। আর মেলার এক পাশে চলছিল নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন। কোথাও পুতুলনাচ, কোথাও গ্রামবাংলার লোকগান, আবার কোথাও বৈশাখের গান আর কবিতা আবৃত্তি। প্রতিটি আয়োজনেই ছিল আলাদা আবেগ।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ির পথে ফিরতে শুরু করল। ব্যবসায়ীরাও তখন তাঁদের দোকান গুছাতে ব্যস্ত। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের মুখে সারা দিনের ক্লান্তির ছাপ থাকলেও, তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক তৃপ্তির হাসি। যদিও মেলা চলেছে রাত আটটা পর্যন্ত; তবু দিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্তির ছাপ ফুটে উঠছিল সবার মুখে। সারা দিনে তিন থেকে চার লাখ মানুষের সমাগম। এক বিশাল জনস্রোতের সাক্ষী এই মেলা।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈশাখী মেলায় কাটানো এই দিনটি ছিল এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য গল্প, অসংখ্য রং, আর সবকিছুই ক্যামেরায় বন্দী করছিল রামিম।
বাংলাদেশের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি যে কতটা সমৃদ্ধ, তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি যেন এই বৈশাখী মেলা। মেঘনার পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, এই উৎসব শুধু একটি দিন নয়, এটা বাঙালির ঐতিহ্য, শিকড়, আর ভালোবাসার আরেক নাম।
বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা