হাওরের বুকে ‘দাস পার্টি’ কীভাবে হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর আতঙ্ক

জগৎজ্যোতি দাস

হাওর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘দাস পার্টি’ একটি পরিচিত নাম। ছোটবেলা থেকেই এই গেরিলা দলের নাম শুনে আসা। ২০১৯ সালে হবিগঞ্জের একটি থিয়েটার দলের মঞ্চস্থ করা ‘জগৎজ্যোতি দাস’ নাটক দেখার পর এই অসাধারণ মুক্তিযোদ্ধাকে জানার আগ্রহ আরও গভীর হয়।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা, জার্নাল ও বই পড়ার সুযোগ হয়। বিশেষ করে হাসান মোরশেদের ‘দাস পার্টির খোঁজে’ বইটি জগৎজ্যোতি ও তাঁর গেরিলা দলের সংগ্রামকে নতুনভাবে জানতে সাহায্য করেছে।

পরিবার, বন্ধু ও ভালোবাসার মানুষদের ছেড়ে দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে নেমেছিলেন হাওর অঞ্চলের এই তরুণ। তাঁর দূরদর্শী পরিকল্পনা, সাহস, উদারতা ও অসাধারণ নেতৃত্ব পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বারবার বিপাকে ফেলেছিল। হাওরাঞ্চলে আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠা ‘দাস পার্টি’র নেতৃত্বে ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস।

১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্ম জগৎজ্যোতি দাসের। সুনামগঞ্জ কলেজে পড়ার সময় তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের কর্মী ছিলেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন। ২৮ মার্চ সুনামগঞ্জের অস্ত্রাগার ভেঙে রাইফেল সংগ্রহ করেন এবং প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধা টেকেরঘাট সাবসেক্টরে যুক্ত হন। এই গেরিলা দলের অধিনায়ক ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। পরে এই দলই হাওরাঞ্চলে ‘দাস পার্টি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। ভাটি অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত রাখার পাশাপাশি তাঁদের বিশেষ দায়িত্ব ছিল ভৈরব–আজমিরীগঞ্জ–শেরপুর নৌপথ পাকিস্তানি সেনাদের জন্য বিপজ্জনক করে তোলা।

সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের জয়কলস সেতু ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের পথ। এই পথ দিয়ে তারা অস্ত্র, গোলাবারুদ ও রসদ পরিবহন করত। সেতুটি পাহারা দিত রাজাকার বাহিনী।
জগৎজ্যোতি দাসকে জয়কলস সেতু ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়া হয়। জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি গেরিলা দল নিয়ে অভিযানে রওনা হন। পথে হঠাৎ একদল রাজাকারের মুখোমুখি হন তাঁরা। ওই এলাকায় রাজাকারদের অবস্থানের তথ্য আগে থেকে জানা ছিল না।

দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হলে জয়কলস সেতুতে অবস্থানরত রাজাকাররা সতর্ক হয়ে যায়। পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন জগৎজ্যোতি। জয়কলসের পরিবর্তে তিনি সদরপুর সেতু ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর গেরিলা দল কোনো গুলি খরচ না করেই সেতুর পাহারায় থাকা রাজাকারদের বন্দী করে। এরপর বিস্ফোরক ব্যবহার করে উড়িয়ে দেওয়া হয় সদরপুর সেতু।

জগৎজ্যোতি ও তাঁর দলের একের পর এক অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান সরবরাহ পথ ভৈরব–শেরপুর নৌপথ ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে ওঠে। নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া, সেতু ও কালভার্ট ধ্বংস এবং আকস্মিক গেরিলা হামলার কারণে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ব্যাহত হতে থাকে। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জীবিত বা মৃত জগৎজ্যোতিকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনটি আশুগঞ্জ থেকে শাহজীবাজার হয়ে বাহুবলের ওপর দিয়ে গিয়েছিল। নৌযান ডোবানো ও সেতু–কালভার্ট ধ্বংসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ লাইন নাশকতারও বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল জগৎজ্যোতির দলের।
সাবসেক্টর থেকে তাঁকে বাহুবল এলাকায় গিয়ে বিদ্যুৎ লাইন ধ্বংসের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ভোরে জগৎজ্যোতি ও তাঁর দল বাহুবলের উদ্দেশে রওনা হয়। পরিকল্পনা ছিল আজমিরীগঞ্জ হয়ে সেখানে পৌঁছানোর। আজমিরীগঞ্জে পৌঁছানোর আগেই বদলপুর এলাকায় একদল রাজাকারকে দেখতে পান জগৎজ্যোতি। তিনি ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে বদলপুরে রেখে ১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে রাজাকারদের ধাওয়া করেন।

কিন্তু সেটি ছিল শত্রুর পাতানো ফাঁদ। রাজাকাররা কিছুদূর গিয়ে জগৎজ্যোতির নিজ গ্রাম জলসুখার দিকে সরে যায়। আর জগৎজ্যোতি ও তাঁর সঙ্গীরা খৈয়াগোপির বিলে পাকিস্তানি বাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে পড়েন। সেই অসম যুদ্ধে ১৬ নভেম্বর শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস।
তাঁর সহযোদ্ধা ইলিয়াস জগৎজ্যোতির মরদেহ কচুরিপানা ও কাদার নিচে লুকিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারে শত্রুবেষ্টনী থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন সকালে রাজাকাররা তাঁর মরদেহ খুঁজে পায়।

রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা জগৎজ্যোতির মরদেহ নিয়ে তাঁর নিজ গ্রামের বাড়ির সামনে এসে উল্লাস করতে থাকে। তখন ঘটে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা।
জগৎজ্যোতির মা নিজের সন্তানের মরদেহ শনাক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। নিজের সন্তানকে না চেনার কোনো কারণ তাঁর ছিল না। তবে শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে একজন শহীদমাতা অসীম সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত নেন।
এরপর রাজাকাররা জগৎজ্যোতির মরদেহ ট্রলারে করে হাওরের বিভিন্ন হাটে ঘুরিয়ে প্রদর্শন করে। শেষ পর্যন্ত তারা হাওরাঞ্চলের বড় বাজারগুলোর একটি আজমিরীগঞ্জ বাজারে পৌঁছে একটি বিদ্যুতের খুঁটির সঙ্গে মরদেহ বেঁধে রাখে।

সেদিন ছিল ঈদের আগের দিন, চাঁদরাত। হাটে আসা হাজারো মানুষ সেই নির্মম দৃশ্য দেখেছিলেন।
পাকিস্তানি বাহিনী বাজারের এক ফটোগ্রাফারকে দিয়ে জগৎজ্যোতির শেষ ছবি তোলে। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই ফটোগ্রাফার ছবিটির একটি অতিরিক্ত কপি সংরক্ষণ করেন এবং হাওরাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সমন্বয়কারী সালেহ চৌধুরীর কাছে পাঠান।
পরে জগৎজ্যোতির মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়।

দাস পার্টির আতঙ্ক
মুক্তিযুদ্ধের সময় দাস পার্টি ছিল হাওরাঞ্চলের অন্যতম দুর্ধর্ষ গেরিলা দল। টেকেরঘাটের বড়ছড়া বাজার থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পর্যন্ত বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের অস্থির করে রেখেছিল এই গেরিলা দল।

মাত্র ৩৬ জনের একটি ছোট দল হয়েও তারা অসংখ্য দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করে। এই দলের শহীদ সিরাজসহ তিনজন মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম খেতাব অর্জন করেন।
জগৎজ্যোতির মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া রেডিও, আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁকে বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেটে তাঁর নাম বীর বিক্রম হিসেবে প্রকাশিত হয়।
সামরিক সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণীত বীরত্বসূচক খেতাবের তালিকায় বেসামরিক জনযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হননি।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় দাস পার্টির যুদ্ধপরিস্থিতি ছিল ভিন্ন ও জটিল। ভাটি অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর ছিল দুর্গম, প্রতিকূল ও বিপদসংকুল যুদ্ধক্ষেত্র। তবু বুকভরা সাহস, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও গভীর দেশপ্রেমকে পুঁজি করে জগৎজ্যোতি দাস ও তাঁর গেরিলা দল প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলকে প্রতিরোধযুদ্ধের শক্ত ঘাঁটিতে পরিণত করেছিলেন। মুহুর্মুহু গেরিলা হামলা ও পরিকল্পিত অভিযানে তাঁরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন।

জগৎজ্যোতি দাস শুধু একজন গেরিলা কমান্ডার নন; তিনি হাওরের মানুষের সাহস, প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক। তাঁর জীবন ও সংগ্রাম আজও মনে করিয়ে দেয় সংখ্যায় ছোট হলেও সাহস, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমের শক্তিতে একটি দল ইতিহাস বদলে দিতে পারে।

সভাপতি, সিলেট বন্ধুসভা