অস্থিরতার উত্তরাধীকার ও নতুন বছরের প্রত্যাশা

প্রতীকীছবি: রয়টার্স

সময় থেমে থাকে না। কখনো অপেক্ষা করে না। এর কোনো অনুশোচনা নেই। অনন্তযাত্রায় ছুটে চলাই সময়ের কাজ। এমনি করে চলে গেল ২০২৫ নামের বছরটিও। আর কোনো দিন ফিরবে না আনন্দ-বেদনা অথবা ভুল শোধরানোর সুযোগ নিয়ে। সময়ের এ নির্মম ও অনিবার্য সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শুরু হলো এক নতুন ভোরের।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই শুরু হয়েছিল অস্থিরতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ–অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখলেও সে আশা পূরণ হয়নি। দেশটা আবার অস্থিরতার দিকে চলে যায়। ২০২৫-এরই উত্তরাধিকার। এক, দুই করে ১২টি মাস কেটে গেলেও অনিশ্চয়তার অবসান হয়নি এতটুকু।

২০২৫ ছিল এক রূপান্তরের বছর; যেখানে আনন্দের খবর এসেছে ফিসফিস করে। অস্বস্তি আর অস্থিরতার খবর এসেছে প্রবলভাবে। একটি বছর চলে যায়। কিন্তু রেখে যায় দায়িত্ব। আমাদের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে হবে আমাদেরই।

জন্ম অনিশ্চিত। মৃত্যু অনিবার্য। এই সত্য জানি বলেই কি সব মৃত্যুকে মেনে নেওয়া যায়? ২০২৫ সালে এমন কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা দেশের মানুষের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে।

ওসমান হাদির মৃত্যু কোনো একজন মানুষের প্রস্থান নয়। এ যেন এক তরুণের হঠাৎ নিভে যাওয়া। তিনি কথা বলতেন ভবিষ্যতের ভাষায়। তাই তাঁর চলে যাওয়া বর্তমানকেই অন্ধকার করে দেয়। কিছু মানুষ মরে না। চিরকাল প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়।
নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত প্রমাণ দিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকায় এক সংখ্যালঘু পোশাকশ্রমিককে পিটিয়ে মেরে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
আবার না–ফেরার দেশে চলে গেলেন প্রবীর মিত্র, ফরিদা পারভীনের মতো আলোকিত মানুষেরা, যাঁদের মৃত্যু নীরব হলেও শূন্যতা গভীর।

এ দেশ তো মৃত্যু উপত্যকা নয়; তবু কেন প্রতিদিন সড়ক, কারখানায়, সহিংসতায় মরছে নিরপরাধ মানুষ। ২০২৬ সালের কাছে একটাই প্রার্থনা—মৃত্যু নয়, মানুষ হোক প্রতিদিনের খবর।

বছরের প্রায় বিদায় মুহূর্তে না–ফেরার দেশে চেলে গেলেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর এই না থাকায় আজ থমকে আছে দেশ। লাখ লাখ মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে কান্না। খালেদা জিয়ার বিদায় কেবল একজন মানুষের নয়, একটি রাজনৈতিক যুগের অবসান। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ক্ষমতা যেমন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন কারাগারের নিঃসঙ্গতা ও একাকিত্ব। বহু মানুষের বিশ্বাসের নাম খালেদা জিয়া। যাঁরা তাঁকে ভালোবেসেছেন, তাঁরা আজ অনুভব করছেন শূন্যতা। যাঁরা ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তাঁরা বুঝেছেন ইতিহাসের ওজন। ক্ষমতার উত্থান-পতন, নিঃসঙ্গতা, জীবনের দীর্ঘ লড়াই–সংগ্রাম সব পেছনে ফেলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাহসের প্রতীক। ইতিহাস তাঁকে বিচার করবে নানাভাবে। কিন্তু মানবিক সত্য হলো, একজন নারী শক্ত হাতে রাজনীতির কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন। তাঁর সংগ্রাম ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে প্রশ্ন করতে শেখাবে।

অনেক সময় আগুনের কাছে হার মানতে হয়। সবকিছু জ্বালিয়ে–পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। ২০২৫ সালও আগুনের নিষ্ঠুরতা থেকে রক্ষা পায়নি। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।

এটি শুধু পত্রিকার ওপর হামলা নয়, এটি ছিল সত্যের ওপর পরিকল্পিত আগুন। তারা জানে না কাগজ পোড়ানো যায়, কিন্তু শব্দ নয়। ভবন ভস্মীভূত করা যায়, কিন্তু বিবেক নয়। দুর্বৃত্তের এ আগুন কোনো দিন স্বাধীন চিন্তা, রাষ্ট্রের গণতন্ত্র ও সাংবাদিকতার আত্মাকে পোড়াতে পারবে না। যেখানে সংবাদপত্রে আগুন দেওয়া হয়, সেখানে অন্ধকার সংবাদ হয়ে ওঠে। এই নিষ্ঠুরতা মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা একবার পাওয়া যায়, কিন্তু রক্ষা করতে হয় প্রতিদিন। এরপর তারা আগুন দেয় ছায়ানট ও উদীচীতে।

এখানেই শেষ নয় ২০২৫-এর আগুনের খতিয়ান। আগুন লাগে গাজীপুরের এক পোশাক কারখানায়। এ আগুন কেবল ১৬টি প্রাণ কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বপ্ন, অনাগত দিনের নিশ্চয়তা। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগুনে পুড়ে গেছে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ। এ আগুন প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাকেই।
কড়াইল বস্তির আগুন দেখিয়ে দিয়েছে, দেশে দারিদ্র্য কতটা পুড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, লোভ আর নীরবতার জন্যই মানুষের ঘর, স্মৃতি, জীবন—সব পুড়ে যায়।

২০২৫ সালের প্রায় পুরো সময় ধরে আলোচনার শীর্ষে ছিল আদালত। বছরের শুরুতেই একের পর এক মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হতে থাকে। শেষ দিকে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম কোনো মামলার রায় হয়। ২০২৫ সালে এটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত রায়।

এ বছর আদালতের আরও একটি ঐতিহাসিক রায়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ আলাদা করা হয়। আবার ১৪ বছর পর সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে সংবিধানে ফিরে আসে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা।

এদিকে আরও একটি আলোচিত মামলার রায়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সব আসামি খালাস পেয়ে যান। এমন চাঞ্চল্যকর কিছু রায়ের জন্য ২০২৫ সালটি ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

দেশের শোবিজের খবরেও ছিল নানা উত্থান-পতন। শোবিজের জগৎ যেন এক চকচকে আয়না। যেখানে ঝলমলে হয়ে ওঠে খ্যাতির আলো, সেখানে লুকিয়ে থাকে গভীর অন্ধকার।

২০২৫ সালে দেশের বিনোদনজগতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা মনে করিয়ে দেয়, জীবন কোনো নাটক নয়। এখানে আনন্দের সঙ্গে দুঃখ, সাফল্যের সঙ্গে বিতর্ক এবং উত্থানের সঙ্গে পতন থাকে।

মাহফুজ আনাম জেমস বাবা হয়েছেন জুন মাসে। কিন্তু খবরটি শোনা যায় অক্টোবরে। একজন রকস্টারের হাতে একটা ছোট্ট শিশুর হাত। এ যেন রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতো, ‘আমার প্রাণের আলো জ্বালিয়ে দিলে তুমি।’
সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের গল্পটা সংস্কৃতি আর ক্ষমতার। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক নির্বাচিত হন। আসিফের এই অর্জন অনুভব করায় যে শিল্পীদের জীবন শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়, তাঁরা সমাজের নেতৃত্বও নিতে পারেন।

কিন্তু আলোর পাশে অন্ধকারও কম নয়। মে মাসে অভিনেত্রী নুসরাত ফারিয়া গ্রেপ্তার হন, এপ্রিলে পরিমনির বিরুদ্ধে গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ, আর নভেম্বরে হিরো আলমের গ্রেপ্তার—এসব ঘটনা থেকে মনে হয়, খ্যাতি একটি ফাঁদও? আব কবি জীবনানন্দ তো লিখেছেন, ‘আমি একা নই, আমার সঙ্গে আছে অন্ধকার।’

অস্থিরতার মধ্যেও আলো আছে। রাফিয়াত রশিদ মিথিলা অর্জন করেন ডক্টরেট ডিগ্রি। তাঁর জীবন যেন একটা উপন্যাস। অভিনয় থেকে শিক্ষায় যাত্রা। প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে গড়ার অঙ্গীকার।

দুয়ারে এখন ২০২৬। কেউ জানি না, কী নিয়ে আসবে নতুন বছর। এর অনেকটাই নির্ভর করে নাগরিকের ইচ্ছের ওপর। ঘৃণা ছড়ালে ঘৃণাই ফিরে আসবে। আর ভালোবাসা দিলে ফিরে আসবে ভালোবাসা। রাষ্ট্র যদি মানবিকতা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সত্য ও সহনশীলতা দেখাতে পারে, তাহলে ২০২৬ হবে আলোকিত।

নতুন বছরে শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের মানুষ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে শিক্ষা শুধু সনদ নয়, শিক্ষা হবে কর্মমুখী। রাজনীতি শুধু ক্ষমতা নয়, রাজনীতি হবে দায়িত্বের অঙ্গীকার। অর্থনীতি মানে কেবল প্রবৃদ্ধি নয়, অর্থনীতি মানে ন্যায্য বণ্টন। সবচেয়ে বেশি ভাবতে হবে মানুষ নিয়ে। রাষ্ট্রের দর্শন থেকে যদি মানুষ বাদ পড়ে, তাহলে কোনো অর্জন কাজে আসবে না।

২০২৬ সালের কাছে প্রার্থনা যেন সে নিয়ে আসে একটি ভালো নির্বাচন ও উদার, সহনশীল, মানবিক রাজনীতির প্রতিশ্রুতি। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা। দ্রব্যমূল্যের আতঙ্ক থেকে মুক্তি পাক নিম্ন আয়ের মানুষ। এই হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।

বছর নয়, ইতিহাস মনে রাখে কর্ম। নতুন বছর এসেছে। কিন্তু ২০২৫ রেখে গেল এক অনিবার্য প্রশ্ন, আমরা কি কেবল ঘটনা মনে রাখব, নাকি শিক্ষা নেব?

লেখক, কবি ও সাংবাদিক